জজ মিয়া নাটক

লঘু দণ্ডে পার পেয়েছে কুশীলবরা

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০১৯

ওয়াকিল আহমেদ হিরন ও আতাউর রহমান

বড় অপরাধ করেও প্রচলিত আইনে দণ্ড কম থাকায় সাজা অল্প হয়েছে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় জজ মিয়া নাটকের কুশীলবদের। হামলায় সরাসরি জড়িত জঙ্গিদের বাঁচানোর চেষ্টা ও পরিকল্পিতভাবে মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট করার সঙ্গে জড়িতদেরও উল্লেখযোগ্য শাস্তি হয়নি। এসব আসামি দীর্ঘদিন কারাগারে থাকায় তাদের সাজা ভোগের মেয়াদও দ্রুত শেষ হয়ে যাবে।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিম্ন আদালতে দণ্ড কম হয়েছে- এমন আসামিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করে তা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে পারত। তবে রাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, সাজা বাড়ানোর জন্য রাষ্ট্রপক্ষ কোনো আপিল করেনি। অর্থাৎ রাষ্ট্রপক্ষ তাদের সাজা বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

এ বিষয়ে মামলাটির রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমান সমকালকে জানান, যে ধারায় এসব আসামিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, তা তারা প্রমাণ করতে পেরেছেন। সে অনুযায়ী শাস্তিও হয়েছে। এসব আসামির বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল ষড়যন্ত্রে যুক্ত হওয়ার সাক্ষ্য-প্রমাণ মেলেনি। তারা অপরাধ সংঘটনের পর ঘটনায় জড়িয়েছে। এ জন্য প্রচলিত আইনে তাদের সাজা কম হয়েছে।

এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম আইনজীবী ছিলেন মোশাররফ হোসেন কাজল। তিনি বলেন, এসব আসামির বিরুদ্ধে ৩০২ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা উচিত ছিল। তাদের বিরুদ্ধে যে ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়েছিল, তাতেই তাদের শাস্তি কমে গেছে। এরপরও তিনি তাদের বিরুদ্ধে আদালতে ৩০২ ও ৩৪ ধারায় যুক্তিতর্ক তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু আদালত তা আমলে নেননি। তবে ওই আসামিদের বড় সাজার জন্য তারা উচ্চ আদালতে আইনি লড়াই চালাবেন।

মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, দণ্ডবিধির এসব ধারায় সর্বোচ্চ পাঁচ থেকে সাত বছরের দণ্ড রয়েছে। কিন্তু এই কুশীলবদের সেই সাজাও হয়নি। উচ্চ আদালতে যুক্তিতর্ক শুরু হলে বিষয়টি আদালতের নজরে আনা হবে।

গত বছরের ১০ অক্টোবর ঢাকার বিশেষ ট্রাইব্যুনালে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ঘোষিত হয়। ঘোষিত রায়ে জজ মিয়া নাটক সাজানোর সঙ্গে জড়িত মামলার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা, সাবেক তিন আইজিপিসহ তৎকালীন পুলিশের আট কর্মকর্তার কারাদণ্ড হয়েছে মাত্র দুই থেকে তিন বছর পর্যন্ত। আদালতের রায়ে সাবেক আইজিপি খোদাবক্স চৌধুরী, এসপি রুহুল আমিন, এএসপি মুন্সী আতিকুর রহমান ও এএসপি আবদুর রশিদকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া সাবেক আইজিপি শহুদুল হক, সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা, ডিআইজি খান সাইদ হাসান ও পুলিশ সুপার ওবায়দুর রহমানকে দুই বছর করে কারাদণ্ড দেন আদালত।

ঘটনায় জড়িতদের রক্ষা করতে ভুল তদন্ত, ভুল নথি তৈরি, ভয় দেখিয়ে মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায়, অপরাধীদের আশ্রয় দেওয়া, হামলার আলামত ও সাক্ষ্য-প্রমাণ নষ্টের দায়ে দণ্ডবিধির ২০১, ২১২, ২১৭, ২১৮ ও ৩৩০ ধারায় আদালত আসামিদের এ শাস্তি দেন।

মূল আসামিকে বিদেশে পালানোর সুযোগ করে দেওয়ায় সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন, লে. কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক ও লে. কর্নেল (বরখাস্ত) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দারেরও দুই বছর করে কারাদণ্ড দেন আদালত।

রায় ঘোষণার পর এ বিষয়ে সমকালের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শ. ম. রেজাউল করিমের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল। তিনি এখন গণপূর্তমন্ত্রী। ওই সময় শ. ম. রেজাউল করিম সমকালকে বলেছিলেন, এসব আসামি অপরাধ ঘটনার ষড়যন্ত্রকারী ও হত্যায় সরাসরি জড়িতদের থেকে কোনো অংশেই কম নয়। তাদের অপরাধের কারণে এত বড় একটা নৃশংস ঘটনার বিচারই তো শেষ হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে যে ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়েছে, তাতে সাজার পরিমাণে অপ্রতুলতা থাকায় তাদের পর্যাপ্ত সাজা হয়নি।

জজ মিয়া নাটকের সেই জজ মিয়াও হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি সমকালকে বলেছেন, যারা তার জীবনটা নষ্ট করে দিল, তাদের বড় শাস্তিই হলো না। মিথ্যা ঘটনায় তাকে অমানুষিক নির্যাতন সইতে হয়েছে। বিনা দোষে তাকে পাঁচ বছর জেলে থাকতে হয়েছে। অথচ এর জন্য দায়ীরা মাত্র দুই থেকে তিন বছরের সাজা পেয়েছেন।

চাঞ্চল্যকর এ মামলার সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল কাহার আকন্দ বলেন, সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সংশ্নিষ্ট ধারায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছিল। অথচ যে ধারায় আসামিদের অভিযুক্ত করা হয়েছিল, সে ধারাতেও তাদের কারও সর্বোচ্চ শাস্তি হয়নি!