ভূমির হাজার কোটি টাকা ডিসিদের তহবিলে

উন্নয়ন কাজে খরচ করা সম্ভব হচ্ছে না

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০১৯

হকিকত জাহান হকি

ভূমির হাজার কোটি টাকা ডিসিদের তহবিলে

ফাইল ছবি

খাসজমি অধিগ্রহণের টাকা দীর্ঘদিন ধরে অলসভাবে পড়ে আছে সারাদেশের জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) তহবিলে। ৬৪ জেলার ডিসিদের তহবিলে পড়ে থাকা ওই টাকা হাজার কোটি ছাড়িয়ে যাবে। নিয়ম অনুযায়ী ডিসির তহবিলে জমা হওয়ার পর তা ভূমি মন্ত্রণালয়ের তহবিলে স্থানান্তর করতে হয়। জেলা প্রশাসনের অবহেলার কারণে তা পাচ্ছে না ভূমি মন্ত্রণালয়। ফলে দেশের উন্নয়নমূলক কাজে খরচ করা সম্ভব হচ্ছে না ওই টাকাগুলো।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ হিসাব নিরীক্ষা সংস্থার প্রতিবেদনে বেরিয়ে এসেছে ডিসিদের তহবিলের টাকার হিসাব। তাদের প্রাথমিক হিসাব থেকে জানা গেছে, দেশের ৬৪ জেলার ডিসিদের তহবিলে জমা হওয়া ভূমি মন্ত্রণালয়ের টাকা হাজার কোটি ছাড়িয়ে যাবে।

ওই সংস্থার নিরীক্ষায় এরই মধ্যে ঢাকা ও কক্সবাজার জেলার ডিসির তহবিলে মোট ৩৬৫ কোটি ৬০ লাখ ৮৯ হাজার ৫০৭ টাকা পড়ে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ঢাকার ডিসির তহবিলে ১৫১ কোটি ২৪ লাখ ৭৯ হাজার ৩৫৩ টাকা ও কক্সবাজার জেলার ডিসির তহবিলে আছে ২১৪ কোটি ৩৬ লাখ ১০ হাজার ১৫৪ টাকা।

ভূমি সচিব মাকছুদুর রহমান পাটোয়ারী সমকালকে বলেন, 'ডিসিদের তহবিলে পড়ে থাকা ভূমি অধিগ্রহণের টাকা সরকারি কাজে যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে একটি খসড়া নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। খসড়া নীতিমালাটি এরই মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এ ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয় যে সিদ্ধান্ত দেয় সেভাবেই ওই অর্থ খরচ করা হবে।' তিনি বলেন, 'ভূমি অধিগ্রহণের টাকা দীর্ঘ সময় ধরে ডিসিদের তহবিলে অলসভাবে পড়ে থাকার কোনো মানে হয় না। ওই টাকার মালিক সরকার। সরকারের উন্নয়নমূলক নানা কাজসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজে ওই টাকার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা হলে দেশের সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে।'

সূত্র জানায়, ভূমি মন্ত্রণালয় ওই টাকার মালিক হলেও দীর্ঘদিনেও তা মন্ত্রণালয়ের তহবিলে জমা হয়নি। বাজেটে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক খাতেও ওই টাকা বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে। অথবা সরকার জনগুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজে ওই টাকা খরচ করতে পারে। খাসজমি ছাড়াও রেল, পূর্তসহ অন্যান্য মন্ত্রণালয়, দপ্তরের জমিও অধিগ্রহণ করা হয়। তাদের টাকাও ডিসিদের তহবিলে পড়ে থাকে। এর মধ্যে শুধু ভূমি মন্ত্রণালয়ের খাসজমি অধিগ্রহণের টাকা হাজার কোটির উপরে।

ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সরকারি-বেসরকারি সংস্থা কর্তৃক খাসজমি অধিগ্রহণের পর সংশ্নিষ্ট সংস্থা সালামি বা জমির মূল্য চালানের মাধ্যমে সংশ্নিষ্ট ডিসির তহবিল কোড ৮৪০১-এ জমা দেন। পরে নিয়ম অনুযায়ী ওই টাকা ডিসির তহবিল থেকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের তহবিল সংক্রান্ত ১-৪৬৩১-০০০০-৩৬০১ কোডে জমা দেওয়ার কথা। এ ক্ষেত্রে ব্যত্যয় ঘটছে। এর ফলে দেশের কাজে ওই টাকার যথাযথ ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না। ভূমির বাইরে অন্য মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের জমি অধিগ্রহণের টাকাও তাদের তহবিলে স্থানান্তরের নিয়ম রয়েছে। ওইসব মন্ত্রণালয়, দপ্তরের টাকাও পড়ে আছে ডিসিদের তহবিলে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের হিসাব নিয়ন্ত্রক (রাজস্ব) মো. মশিউর রহমান সমকালকে বলেন, 'সরকারি-বেসরকারি সংস্থার অনুকূলে যেসব ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি অধিগ্রহণ করা হয়, ওইসব জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণের টাকা যথাসময়ে পরিশোধ করা হয়। কিন্তু কোনো সংস্থার জন্য অধিগ্রহণকৃত খাসজমির মূল্য বা সেলামির টাকা যথাযথভাবে ডিসির তহবিল থেকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের তহবিলে জমা করা হয় না। এই টাকা ভূমির তহবিলে জমা হলে একদিকে রাজস্ব প্রাপ্তিতে মন্ত্রণালয়ের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হতো। অন্যদিকে এই টাকা রাজস্ব বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করে উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করা যেত।'

ভূমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, ঢাকা ও কক্সবাজার ডিসির পড়ে থাকা ৩৬৫ কোটি ৬০ লাখ ৮৯ হাজার ৫০৭ টাকা কবে ভূমি মন্ত্রণালয়ের তহবিলে জমা হবে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

জানা গেছে, ভূমি মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ হিসাব নিরীক্ষা সংস্থার প্রতিবেদনে গাজীপুর জেলার ডিসির তহবিলে জমি অধিগ্রহণের ৭ কোটি ৬৭ লাখ ৭৮ হাজার টাকা পড়ে থাকার তথ্য পাওয়া যায়। পরে এ ব্যাপারে সংস্থা থেকে ডিসির কাছে চিঠি লেখা হলে তিনি চালানের মাধ্যমে পুরো টাকা ভূমি মন্ত্রণালয়ের তহবিলে স্থানান্তর করেন।

সূত্র জানায়, সারাদেশের খাসজমির মালিক ভূমি মন্ত্রণালয়। সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন কাজে অধিগ্রহণ করা হয় এই খাসজমি। সংশ্নিষ্ট জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখার মাধ্যমে সংশ্নিষ্ট সংস্থার অনুকূলে খাসজমি অধিগ্রহণ করা হয়। যেসব সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের নামে অধিগ্রহণ করা হয়, তারা যথাসময়ে সরকারের জমির মূল্য বা সালামি বাবদ টাকা চালানের মাধ্যমে পরিশোধ করে। ওই টাকা জমা হয় সংশ্নিষ্ট ডিসির তহবিলে। পরে ওই টাকা ডিসির তহবিল থেকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের তহবিলে জমা করার কথা থাকলেও এ কাজটি করা হচ্ছে না।

ঢাকা জেলা :সূত্র জানায়, রাজধানীর ১৩টি প্রকল্পে সরকারি জমি অধিগ্রহণের (এলএ) ক্ষেত্রে জমির দাম ও প্রশাসনিক খরচের দেড়শ' কোটিরও বেশি টাকা গত ১৬ বছরেও জমা হয়নি ভূমি মন্ত্রণালয়ের তহবিলে। ওই ১৩টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ভূমি মন্ত্রণালয়, রেলওয়েসহ অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের জন্য অধিগ্রহণকৃত জমির মূল্য ও জমির মূল্যের ওপর সাড়ে ৭ শতাংশ হারে আনুষঙ্গিক ও প্রশাসনিক খরচ বাবদ সর্বমোট ১৫১ কোটি ২৪ লাখ ৭৯ হাজার ৩৫৩ টাকা জমা হয়েছে ঢাকার ডিসির তহবিলে। প্রকল্পগুলো থেকে যথাসময়েই টাকা জমা করা হয়।

জমি অধিগ্রহণের কাজ সম্পন্ন করতে সংশ্নিষ্ট প্রকল্পগুলো থেকে জমির মালিককে ক্ষতিপূরণ বাবদ জমির মোট মূল্যের ওপর সাড়ে ৭ শতাংশ হারে অর্থ প্রদান করা হয়েছে। অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে জমির মালিকের আনুষঙ্গিক ও প্রশাসনিক খরচের ক্ষেত্রে এই টাকাই দেওয়া হয়ে থাকে।

ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ১৯৯৯-২০০০ থেকে ২০১২-১৩ অর্থবছর পর্যন্ত ১৩ বছরে ১৩টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে যেসব বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তরের জমি অধিগ্রহণ করা হয়। জেলা প্রশাসনের এলএ শাখার ট্রেজারিতে জমি অধিগ্রহণের ওই দেড়শ' কোটিরও বেশি টাকা পড়ে থাকার তথ্য নেই সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় বা দপ্তরে।

ওই ১৩টি প্রকল্প বাস্তবায়নে যে পরিমাণ সরকারি জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে, তার মধ্যে সিংহভাগই ভূমি মন্ত্রণালয়ের খাসজমি। এই মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণকৃত খাসজমির টাকা ঢাকা জেলা প্রশাসনের এলএ ট্রেজারিতে জমা আছে, এই তথ্য জানা নেই তাদের। এদিকে ঢাকা জেলা প্রশাসনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, তারা চিঠি পাঠিয়ে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরকে তাদের জমি অধিগ্রহণের টাকা প্রাপ্তির খবর জানিয়েছেন। মন্ত্রণালয়, দপ্তরগুলো তাদের টাকার খবর না জেনে থাকলে পুনরায় চিঠি দিয়ে জানানো হবে।

১০ প্রকল্প থেকে জমা হয় ১৩১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা :রাজধানীর হাতিরঝিলসহ ১০টি উন্নয়ন প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রকল্পগুলো থেকে আনুষঙ্গিক ও প্রশাসনিক খরচ বাবদ মোট ১৩১ কোটি ৫৬ লাখ ১১ হাজার ২০৯ টাকা জমা হয় ডিসির তহবিলে।

প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে হাতিরঝিল, হাতিরঝিল ইউলুপ, গুলশান মাদানী এভিনিউ প্রগতি সরণি মহাসড়ক নির্মাণ প্রকল্প, কুড়িল ফ্লাইওভার সংশোধিত প্রকল্প, গ্রামীণ ব্যাংক থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্প, রায়েরবাজার জাতীয় স্মৃতিসৌধ-সংলগ্ন কবরস্থান উন্নয়ন প্রকল্প, মালিবাগ-মৌচাক ফ্লাইওভার প্রকল্প, খিলগাঁও ফ্লাইওভার লুপ নির্মাণ প্রকল্প, সাভার ট্যানারি শিল্প এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প ও বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্প।

আরও ৩ প্রকল্প থেকে জমা হয় ১৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকা :আরও ৩টি প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে ডিসির তহবিলে জমা হয় ১৯ কোটি ৬৮ লাখ ৬৮ হাজার ১৪৪ টাকা। প্রকল্পগুলো হলো, হাতিরঝিল দ্বিতীয় উন্নয়ন প্রকল্প, রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কাটাসুরে কবরস্থান উন্নয়ন প্রকল্প ও সুলতানগঞ্জের উন্নয়ন প্রকল্প।

কক্সবাজার জেলা :কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের ২০১৪-১৫ থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের নথি নিরীক্ষায় দেখা যায়, ১০টি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের ২১৪ কোটি ৩৬ লাখ ১০ হাজার ১৫৪ টাকা জমা হয় ডিসির তহবিলে। প্রকল্পগুলো হলো- টেকনাফের আরএমএইচ সড়কে কাইয়ুম খালের ব্রিজের অ্যাপ্রোচ রোড নির্মাণ প্রকল্প, দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার ও রামু থেকে মিয়ানমারের কাছে ঘুনধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন মিটার গেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্প, টেকনাফ-উখিয়া সড়ক সম্প্রসারণ প্রকল্প, বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ, নৌবাহিনীর সাবমেরিন নির্মাণ প্রকল্প, বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আওতায় ক্রীড়া স্কুল নির্মাণ প্রকল্প ও দ্বিতীয় পর্যায়ে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ সম্প্রসারণ প্রকল্প।