ডেঙ্গু

প্রতিরোধে চাই সামাজিক আন্দোলনও

আক্রান্ত ১০ হাজার ৫২৮

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০১৯

রাজবংশী রায়

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ভ্রাম্যমাণ আদালত গত বুধবার রাজধানীর কয়েকটি নির্মাণাধীন ভবন পরিদর্শন করে ডেঙ্গুবাহিত এডিস মশার লার্ভা দেখতে পান। ২৫ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করেন তারা। অভিযানের সময় সঙ্গে থাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা জানান, অভিযানকালে তারা যে ক'টি ভবন পরিদর্শন করেছেন, সেগুলোর মধ্যে ১২টিতে এডিস মশার লার্ভা পেয়েছেন। এ ছাড়া আরও ১০টি ভবনে এডিস মশার বংশবিস্তারের মতো জমে থাকা পানি পাওয়া যায়।

সংশ্নিষ্টরা বলেছেন, নির্মাণাধীন ভবনের বাইরে বাসাবাড়ির চারপাশে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, জমে থাকা পানি, টবের চৌবাচ্চা, ফুলের টব, ড্রেন বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার ঘটছে। রাজধানী ঢাকায় এ অবস্থা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। এ কারণে ঢাকায় ডেঙ্গু রোগী বেশি। তবে ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। প্রথমে রাজধানীর আশপাশের জেলা ও সিটি করপোরেশনে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়লেও কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এই জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার খবর আসছে। ঢাকা থেকে গ্রামে  যাওয়া মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হচ্ছে- শুরুতে স্থানীয় সিভিল সার্জন ও চিকিৎসকরা এমন ধারণাও পোষণ করেন। তবে কয়েকটি জেলায় নতুন করে ডেঙ্গু রোগী পাওয়ার পর তাদের সেই ধারণা পাল্টে গেছে। চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে সাড়ে ১০ হাজার। মৃত্যু হয়েছে ৩৬ জনের। আগামী আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে এডিস মশার প্রজনন মাসে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। এতে করে দেশব্যাপী উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় সম্মিলিতভাবে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে ডেঙ্গু প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন বিশিষ্টজন। তাদের অভিমত, ডেঙ্গু প্রকোপ যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে মশকনিধনের ওষুধ ছিটিয়ে এবং চিকিৎসাসেবা নিয়ে এ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা যাবে না। এ জন্য সবাইকে নিয়ে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। তবেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।

সরকারের পক্ষ থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে। গত শুক্রবার রাজধানীর ধানমণ্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ডেঙ্গু নিয়ে রাজনীতি কিংবা আতঙ্ক না ছড়িয়ে আসুন, সবাই মিলে সামাজিকভাবে লড়াই গড়ে তুলি। এই বিপজ্জনক মশার কামড়ে মানুষের মৃত্যুও হতে পারে। তাই বিষয়টি সহজভাবে দেখার সুযোগ নেই।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে দেশে না থাকলেও ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ে তিনিও উদ্বিগ্ন- এ কথা জানিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, আমাদের দলকে আমরা অন্তর্ভুক্ত করেছি। সচেতনতামূলক ও সতর্কতামূলক সভা-সমাবেশ করলে আমাদের দলও এ ব্যাপারে অংশ নেবে।

সামাজিক সচেতনতা প্রয়োজন :নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, 'ডেঙ্গুর প্রকোপ যেভাবে বেড়ে চলছে, তাতে বিষয়টি এখন মহামারি বলা যায়। এর পেছনে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থার পাশাপাশি বাসাবাড়ির অপরিচ্ছন্নতা দায়ী। একই সঙ্গে সঠিক নগর পরিকল্পনার চরম অভাব রয়েছে। কারণ, একটি ভবন থেকে আরেকটি ভবন কতটুকু দূরত্বে থাকবে, ভবন নির্মাণের সময় সেটির ড্রেনেজ, স্যুয়ারেজ ও পানির লাইন কীভাবে হলে পানি জমে থাকবে না- সে বিষয়ে কোনো পরিকল্পনা নেই। অপরিকল্পিতভাবে ভবন তৈরি করা হচ্ছে, যা অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ সৃষ্টির জন্য দায়ী। শুধু ডেঙ্গু নয়, পুরান ঢাকাসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কোথাও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে তা নিয়ন্ত্রণে আনাও কষ্টকর হয়ে পড়ে। বৃষ্টি হলেই পানি জমে যায়। এসব অব্যবস্থাপনা আগে দূর করতে হবে। তাহলে যে কোনো পরিস্থিতিই নিয়ন্ত্রণের আওতায় থাকবে।'

ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও মেয়রের বক্তব্যের সমালোচনা করে এই নগরবিদ বলেন, 'জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে এ ধরনের বক্তব্য কেউ আশা করে না। জনপ্রতিনিধিদের বুঝতে হবে, জনগণ ভোটের মাধ্যমে তাদের নেতা নির্বাচিত করেছে। অতএব, জনগণের দায়িত্ব তাদের। তাদের ডাকে মানুষ সাড়া দিয়ে দেশের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়বে। কিন্তু তাদের কথাবার্তায় যদি আস্থাহীনতার জন্ম দেয়, তাহলে সে দায় ওই জনপ্রতিনিধিদেরই নিতে হবে। এখন সবার দায়িত্ব হবে নিজের আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে জনগণকে সচেতন করা। এ জন্য সম্মিলিত সামাজিক ঐক্য জরুরি।'

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ব্রিগেডিয়ার (অব.) আবদুল মালিক বলেন, 'কলেরা, ম্যালেরিয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধে বাংলাদেশ আগেও সাফল্য দেখিয়েছে। গত বছর চিকুনগুনিয়া আতঙ্ক ছড়িয়েছিল। এবার ডেঙ্গু ছড়াচ্ছে। বিষয়টি এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। মশকনিধন ও হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়েই এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটবে না। চারপাশের পরিবেশ ও বাসাবাড়ি পরিচ্ছন্ন করার দায়িত্ব কেবল সিটি করপোরেশনের ওপর ছেড়ে না দিয়ে নিজ উদ্যোগে এ কাজ করতে হবে। নিজ নিজ জায়গা থেকে সবাইকে সচেতন হতে হবে। সাধারণ মানুষ যাতে নিজ দায়িত্বে এই কাজ করে, সে জন্য তাদের সচেতন করে তুলতে হবে।'

জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা ও স্থানীয় সরকার বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, 'ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে আমরা একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যার মধ্যে রয়েছি, এটি স্বীকার করে নিতে হবে। এটিকে অস্বীকার করাই একটি হাস্যকর বিষয়। ডেঙ্গু নিয়ে সরকারের একটি সংস্থা আরেকটিকে ব্লেইম করছে। এ ধরনের ব্লেইম গেম যেমন সঠিক নয়, তেমনি প্যানিক সৃষ্টি করাও উচিত নয়। ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য আগামী বছরের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এটি সরকারের সংশ্নিস্ট সংস্থাগুলো ঠিক করবে। ডেঙ্গুর প্রকোপ মোকাবেলায় সমন্বিত কাজের প্রয়োজন। সচেতনতা সৃষ্টির বিষয়টি লোক দেখানো হলে সেটি কাজে আসবে না। সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে যে ধরনের বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, সেটি বিভ্রান্তি তৈরি করছে। এ ধরনের আস্থার সংকট তৈরি না করে এককভাবে কাউকে নেতৃত্ব নিয়ে সবাইকে যুক্ত করে কাজটি করা প্রয়োজন।'

চিকিৎসকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব বলেন, 'ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে যেভাবে ব্লেইম গেম চলছে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এটি যে চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে তা কেউ অস্বীকার করবে না। এখন দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে সরকারকে। লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে এজন্য। জনগণকে সম্পৃক্ত করে আগামী তিন দিনের মধ্যে রাজধানীর সব বাসাবাড়ির পরিবেশ পরিচ্ছন্ন করা হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি অপসারণ করে পরিস্কার করতে হবে। একই সঙ্গে মশক নিধন, ওষুধ ছিটানো ও স্বাস্থ্যসেবার বিষয়ে আরও ভালো উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় আগামী দুই মাস ভরা মৌসুমে পরিস্থিতি নাজুক হয়ে পড়বে।'

রেকর্ডসংখ্যক আক্রান্ত :রেকর্ডসংখ্যক মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে এবার। গত ১৯ বছরের মধ্যে এবারই সর্বোচ্চসংখ্যক ১০ হাজার ৫২৮ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। গত বছর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১০ হাজার ১৪৮ জন আক্রান্ত হয়েছিল। সামনে ভরা মৌসুমে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে বলে আশঙ্কা করেছেন সংশ্নিষ্টরা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এ পর্যন্ত ১০ হাজার ৫২৮ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে। গতকাল শনিবার নতুন করে আরও ৬৮৩ জন আক্রান্ত হয়েছে।

ঢাকার বাইরে গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, ফেনী, কুমিল্লা, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, কুষ্টিয়া, খুলনা, যশোর, ঝিনাইদহ, বগুড়া ও বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন উপজেলায় গতকাল নতুন করে ৩৭৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্তের খবর মিলেছে। তবে পিরোজপুর, জয়পুরহাট, সিরাজগঞ্জ, নওগাঁ ও পাবনা জেলায় আরও ৫১ জন আক্রান্ত হলেও তাদের নাম স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তালিকায় নেই।

চলতি বছর এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এখন পর্যন্ত আটজনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে। অধিদপ্তরের জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা জানান, ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করতে তারা কয়েকটি ধাপে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। এজন্য একটি সেল কাজ করছে। ডেঙ্গু ছাড়াও বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় মৃত্যু হতে পারে। তাই সবকিছু যাচাই-বাছাই করেই মৃত্যুর তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উদ্যোগ :ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবেলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে গতকাল অধিদপ্তরের সভাকক্ষে সংশ্নিষ্ট সব পর্যায়ের কর্মকর্তারা সভা করেছেন। ওই সভায় বেশকিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এসবের মধ্যে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক, সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক, বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ও সিভিল সার্জনের মাধ্যমে জেলা প্রশাসক, জনপ্রতিনিধি ও সুশীল সমাজকে সম্পৃক্ত করে ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ওয়ান স্টপ হেল্প ডেস্ক স্থাপন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গঠিত ১০টি মেডিকেল টিম বিভিন্ন হাসপাতাল পরিদর্শন করে ডেঙ্গুবিষয়ক কার্যক্রম তদারকি করবে, জরুরি প্রয়োজনে মুমূর্ষু রোগীতে অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস প্রদান, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে আসন্ন ঈদুল আজহার ছুটিতে সার্বক্ষণিক সেবা প্রদান করা, জেলা, উপজেলা ও টারশিয়ারি পর্যায়ের সব হাসপাতালে চিকিৎসকদের ন্যাশনাল ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা গাইডলাইন অনুসরণ করে চিকিৎসা প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রয়োজনে ডেঙ্গু রোগীদের সেবা প্রদানের জন্য অস্থায়ীভাবে শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট ও শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে সেবা প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়েছে।