প্রতিবন্ধীবান্ধব পথে এ কেমন বাধা!

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০১৯

নাহিদ তন্ময়

প্রতিবন্ধীবান্ধব পথে এ কেমন বাধা!

সিটি করপোরেশন রাজধানীতে প্রতিবন্ধীবান্ধব ফুটপাত তৈরি করলেও ব্যারিকেডের কারণে তা ব্যবহার করতে পারছেন না প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা। মিরপুর রোডের ছবি - প্রতিবেদক

প্রতিবন্ধীবান্ধব করে নির্মাণ করা হয়েছে রাজধানীর মিরপুর সড়কের ফুটপাতটি। যদিও সেটি ব্যবহার করতে পারছেন না প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা। কারণ ফুটপাতের শুরুতেই দেওয়া হয়েছে লোহার ব্যারিকেড। মোটরসাইকেলের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে এটা করেছে ট্রাফিক পুলিশ। শুধু মিরপুর সড়কে নয়, রাজধানীর অধিকাংশ ফুটপাতেই লোহার ব্যারিকেড দিয়ে এ রকম প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে। এই ব্যারিকেড পেরিয়ে আধুনিক প্রতিবন্ধীবান্ধব ফুটপাতে প্রবেশ করা অসম্ভব।

যদিও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) জানে না কে বা কারা এভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। ডিএনসিসির প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জুবায়ের সালেহীন জানিয়েছেন, এ ব্যাপারে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই বিভিন্ন এলাকার ফুটপাতে খুঁটি বসানো হয়েছে। হতে পারে মোটরসাইকেলের চলাচল ঠেকাতে এটা করা হয়েছে, যা আদৌ ঠিক হয়নি। চলার পথে বিভিন্ন ফুটপাতে এসব প্রতিবন্ধকতা দেখার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, 'সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এ খুঁটি সরিয়ে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।'

তবে ফুটপাতে এ ধরনের ব্যারিকেড দেওয়াকে একটি ভালো উদ্যোগ বলে দাবি করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মীর রেজাউল আলম। সমকালকে তিনি বলেন, পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থাকে প্রতিবন্ধীবান্ধব করা হলে বিষয়টা আলাদা ছিল। শুধু ফুটপাতের কিছু অংশে কিছু ব্যবস্থা রাখলেই কি তা প্রতিবন্ধীবান্ধব হয়ে যায়? তারপরও তাদের সুবিধার কথা চিন্তা করে যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটা  সাধুবাদ পেতে পারে। তবে রাজধানীর বাস্তবতা ভিন্ন।

মীর রেজাউল আলম বলেন, রাজধানীতে সাধারণ মানুষ ফুটপাত ব্যবহার করতে পারেন না। ফুটপাতে মোটরসাইকেলের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা যায় না। তাই সার্বিকভাবে বললে ব্যারিকেড দিয়ে ফুটপাতে মোটরসাইকেলের দৌরাত্ম্য বন্ধের এ প্রচেষ্টা অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। ফুটপাতে মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধে লোহার খুঁটির বিকল্প কোনো ব্যবস্থা করা যায় কি-না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে কোনো বুদ্ধি-পরামর্শ থাকলে জানাতে পারেন।

হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের চলাচলের সুবিধার জন্য রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ফুটপাতে বসানো হয়েছে লাল-হলুদ টাইলস। এসব ব্যবস্থা করেছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। প্রতিবন্ধীবান্ধব বিশেষ ধরনের এসব ফুটপাতের দু'পাশে লাল এবং মাঝখানে হলুদ টাইলস বিছানো। হলুদরঙা টাইলসের মধ্যে কোনোটাতে রয়েছে লম্বা উঁচু দাগ, আবার কোনোটাতে গোল গোল উঁচু দাগ। টাইলসে লম্বা আকৃতির নকশা থাকায় শারীরিক প্রতিবন্ধীরা সহজেই হুইলচেয়ার ব্যবহার করতে পারেন। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরাও লাঠির সাহায্যে সহজে চলাফেরা করতে পারেন। তা ছাড়া গোলাকৃতি নকশার টাইলসে পা রেখেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা বুঝতে পারেন যে, এখানে নামতে হবে। হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্যও ঢালু রাখা হয়েছে ফুটপাতের একটি অংশ।

কিন্তু এসব সুবিধার কোনোটিই শেষ পর্যন্ত কাজে আসছে না প্রতিবন্ধীদের। ফুটপাতে মোটরসাইকেলের চলাচল ঠেকাতে কিছুদূর পরপর পুলিশের বসানো লোহার খুঁটির ব্যারিকেডের কারণে ফুটপাত একদমই ব্যবহার করতে পারছেন না প্রতিবন্ধীরা। কোথাও কোথাও বসানো হয়েছে সিমেন্ট এবং বাঁশের খুঁটিও। এ নিয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা বিভিন্ন সভা-সেমিনার-সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিনিয়ত নিজেদের ক্ষোভের কথা জানালেও বিষয়টি আমলে নেন না কেউই।

লেখক ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ সমকালকে বলেন, নগরবাসীর নাগরিক অধিকার হরণ হচ্ছে বিভিন্নভাবে। সিটি করপোরেশন ও পুলিশের দায়িত্ব নাগরিকদের নির্বিঘ্নে ও শান্তিতে চলাচলের ব্যবস্থা করে দেওয়া; কিন্তু করা হচ্ছে তার উল্টোটা। সার্বিক অবস্থা দেখলে মনে হয়, শারীরিক প্রতিবন্ধীরা যে মানুষ তা মনে করাই হয় না। ফুটপাতে যেভাবে বিঘ্ন সৃষ্টি করা হয় তা নাগরিক অধিকার হরণের নামান্তর। পুলিশ বা সিটি করপোরেশন এ কাজ করতে পারে না।

রাজধানীর সূত্রাপুর কলতাবাজার খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী। বাসা তেজগাঁও সরকারি কোয়ার্টারে। কর্মস্থল এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজনে প্রতিদিনই তাকে রাস্তায় নামতে হয়। কিন্তু কখনও ফুটপাত ব্যবহার করতে পারেন না। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ব্যস্ত সড়কের পাশ দিয়ে হুইলচেয়ারে যাতায়াত করেন তিনি।

ক্ষুব্ধ নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, সরকার রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অর্থ ব্যয় করে প্রতিবন্ধীবান্ধব ফুটপাত নির্মাণ করলেও তারাই তা ব্যবহার করতে পারছেন না। পুলিশ এ ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাফেরার রাস্তা অবরুদ্ধ করে রেখেছে। তিনি বলেন, প্রতিবন্ধীবান্ধব সমাজ বিনির্মাণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যে অনুশাসন আছে, তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়েছে।

ওমেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিস ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শিরিন আখতার সমকালকে বলেন, প্রতিবন্ধীদের চলাচলের সুবিধার জন্য আন্তর্জাতিক ধারণাকে গুরুত্ব দিয়ে সরকার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ফুটপাত প্রতিবন্ধীবান্ধব করে তোলার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু যাদের টার্গেট করে সরকার বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে, তারা কি আদৌ এসব ফুটপাত ব্যবহার করতে পারছেন? তিনি বলেন, ফুটপাতে মোটরসাইকেলের চলাচল বন্ধ করতে পুলিশ আইন প্রয়োগ করবে, শাস্তি নিশ্চিত করবে, জরিমানা করবে। এ ব্যাপারে আদালতের নির্দেশনাও রয়েছে। কিন্তু খুঁটি বসিয়ে প্রতিবন্ধকতা কেন তৈরি করা হবে? এসব বিষয়ে সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে বারবার কথা বলেও কোনো সমাধান হয়নি বলে তিনি জানান।

নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব সমকালকে বলেন, রাজধানীর ফুটপাতগুলোকে আধুনিকায়ন করে প্রতিবন্ধীদের চলাচল উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়েছে। ফুটপাতে মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ করতে পুলিশ খুঁটির ব্যবহার করছে। এটা অনেকটা মাথাব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলার মতো অবস্থা। সারা বিশ্ব প্রতিবন্ধীদের নানা রকম সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তাদের জীবন স্বাভাবিক করে তুলছে। অথচ এ দেশে তাদের চলার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, মোটরসাইকেল ফুটপাতে চলাচল একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ অপরাধ বন্ধে অবশ্যই পুলিশকে আইন প্রয়োগ করতে হবে। এসব অপরাধের জন্য আর্থিক জরিমানা, জেল অথবা লাইসেন্স বাতিলের মতো পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু খুঁটি ব্যবহার করে ফুটপাত বন্ধ করা কোনো সমাধান হতে পারে না। এটা চূড়ান্তভাবে নাগরিকের অধিকার হরণ।

মানবাধিকার কর্মী আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজ সমকালকে বলেন, কোনো বিবেচনাতেই ফুটপাতে খুঁটির মতো প্রতিবন্ধকতা মেনে নেওয়া যায় না। এ ধরনের প্রতিবন্ধকতা শুধু যে প্রতিবন্ধীদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে তা নয়, বৃদ্ধসহ নানা বয়সী মানুষ প্রতিনিয়ত অসাবধানতাবশত ফুটপাতে গেঁথে রাখা খুঁটির কারণে আক্রান্ত হচ্ছেন। এটা কোনো দেশের ট্রাফিক সিস্টেম হতে পারে না। কোনো অবস্থাতেই কোনো সংস্থা কারও চলাচল বন্ধ করতে পারে না। তিনি বলেন, পুলিশ মোটরসাইকেলের মতো বাহন ফুটপাতে চলাচল বন্ধ করতে খুঁটির ব্যবহার করছে। এটা কোনো সমাধান নয়। সড়কে অনিয়ম বন্ধে আইন প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োজনে কঠোর শাস্তির বিধান করতে হবে। লাইসেন্স বাতিলের মতো শাস্তি দিতে হবে।