সব জেনেও নিশ্চুপ ছিল গভর্নিং বডি

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০১৯     আপডেট: ১৯ এপ্রিল ২০১৯

সাহাদাত হোসেন পরশ

সোনাগাজী ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার কুকর্মের দীর্ঘ তালিকা ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে। নুসরাত জাহান রাফির আগে ২০১৮ সালের ৩ ডিসেম্বর একই মাদ্রাসার আলিম দ্বিতীয় বর্ষের আরেক ছাত্রীকে নিপীড়ন করেন তিনি। উপবৃত্তির তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলে সেদিন ওই ছাত্রীকে মাদ্রাসার আয়া বেবী রানী দাসের মাধ্যমে তিন তলার কক্ষে ঢেকে নেন সিরাজ। এরপর তিন তলার নিজ কক্ষে ছাত্রীর সঙ্গে চরম অশালীন আচরণ শুরু করলে চিৎকার করেন ওই ছাত্রী। তার চিৎকার শুনে বাইরে থেকে জোর করে অধ্যক্ষের কক্ষে ঢোকেন আয়া বেবী রানী ও পিয়ন নুরুল আমিন। মেয়েটিকে তারা উদ্ধার করার পর কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। এরপর সহপাঠীরা তাকে বাসায় পাঠান। বাসায় গিয়ে লজ্জা ও অপমানে ওই ছাত্রী আত্মহত্যার চেষ্টা করেন।

ওই ছাত্রীর বাবা মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সভাপতির কাছে লিখিতভাবে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেন। ওই অভিযোগের অনুলিপি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা চেয়ারম্যান ও গভর্নিং বডির অন্য সদস্যদেরও দেওয়া হয়। তবে নিপীড়নের শিকার ছাত্রীর বাবা বিচার পাননি। ওই ছাত্রীর বাবা তার মেয়ের সঙ্গে নির্মম আচরণের কথা তুলে ধরে গভর্নিং বডিকে যে চিঠি দিয়েছিলেন তার অনুলিপি সমকালের হাতে এসেছে। শুধু ওই ঘটনা নয়, অধ্যক্ষ সিরাজের সব কুকর্ম জেনেও নির্দয়ভাবে নিশ্চুপ ছিলেন গভর্নিং বডি ও স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা। বারবার গুরুতর অভিযোগ উঠলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় নুসরাতের ওই পরিণতি হয়েছে।

দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র সমকালকে নিশ্চিত করেছে, অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্টভাবে নানা অভিযোগ জানিয়ে প্রতিকার চেয়েছেন মাদ্রাসাটির ১৬ শিক্ষক। ১২টি অভিযোগ তারা তুলে ধরেন। সেখানে বলা হয়, কোনো শিক্ষকের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ব্যাপারে মতানৈক্য হলেই সঙ্গে সঙ্গে ওই শিক্ষককে শোকজ, বেতন কর্তন, চাকরিচ্যুত করার হুমকি প্রদান করতেন সিরাজ। বিভিন্ন শ্রেণিতে ছাত্রছাত্রী ভর্তি, ফরম পূরণ, উপবৃত্তি-সংক্রান্ত মাদ্রাসার শিক্ষক পরিষদ কর্তৃক শিক্ষা কমিটি থাকলেও তাদের উপেক্ষা করে নিজের মতামত চাপিয়ে দেন অধ্যক্ষ। মাদ্রাসার অধ্যক্ষের ব্যাপারে বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হলে তিনি সকল শিক্ষককে এ ঘটনায় সন্দেহ করেন। তিনি পাঁচ শিক্ষকের চাকরি অবৈধ বলে পত্রিকায় পাল্টা বিজ্ঞাপন দেন। অভিযোগ আছে, উৎকোচ নিয়ে হুরের জাহান নামে একজনকে সিরাজ জাল সার্টিফিকেট দেন। তিনি ওই মাদ্রাসার শিক্ষিকা না হলেও তাকে ওই মাদ্রাসার শিক্ষিকা দেখানো হয়।

জানা গেছে, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে সিরাজ কয়েকজনকে খন্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ দেন। তারা হলেন- কাজী নুরুল হক, খালেদ সাইফুল্লাহ, বাহার উল্লাহ, নুরুল আবসার, খালেদ হাসান, ডা. হোসাইন আহমেদ, মো. ওয়াহাব, আবদুল কাদের ও নিজাম উদ্দিন। ২০০৫ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অডিটের সময় নিজের অপরাধ ধামাচাপা দিতে শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছে ১ লাখ টাকা করে ঘুষ নেন তিনি। তাদের জানান, এই ঘুষ অডিট সদস্যদের দেওয়া হবে। যাদের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়া হয়েছিল তারা হলেন- মাওলানা মনির আহম্মদ, মোহাম্মদ হোসেন, আবু ইউসুফ, জসিম উদ্দিন, হেদায়াতুল ইসলাম, খাজা নাজিম উদ্দিন, শহিদ উল্যা, আমির হোসেন, মোতাহার হোসেন ও খুজিস্তা খানম।

বিপুল অর্থ ব্যয় করে মাদ্রাসায় বায়োগ্যাস প্রকল্প করার সময় কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করা হয়নি। মাদ্রাসা ভবনের ওপর টাওয়ার নির্মাণে নিয়ম মানা হয়নি; সেখান থেকে পাওয়া অর্থ মাদ্রাসা তহবিলে জমা পড়েনি। আবাসিক ছাত্রদের আয়-ব্যয়ের হিসাব মাদ্রাসার জেনারেল ফান্ডে জমা না দিয়ে নিজের ইচ্ছেমতো খরচ করতেন সিরাজ। ছাত্রদের কোচিংয়ের অর্থের বড় অংশ ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে যেত। মাদ্রাসার মানতের ও লিল্লাহ বিভাগের ছাগল বাজারে চুরি করে বিক্রি করে দিতেন সিরাজ। হোস্টেলের ভালো মানের চাল নিজের বাসায় নিয়ে যেতেন তিনি। মাদ্রাসার জায়গা, পুকুর, ফল ও ফসলের আয়-ব্যয়ের হিসাব দিতেন না সিরাজ।

দীর্ঘদিন ধরে অধ্যক্ষ সিরাজ মাদ্রাসার গোরাবা ফান্ড, আবাসিক ও ডাইনিংয়ের হিসাব, পঞ্চম, দশম, আলিম ও ফাজিল পরীক্ষার ফরম পূরণের আয়-ব্যয়ের হিসাব সিরাজ দেননি। অধ্যক্ষ সিরাজ ও তার অফিস সহকারী সিরাজুল হকের যোগসাজশে মাদ্রাসার অর্থ হরিলুট হলেও নিশ্চুপ ছিল গভর্নিং বডি। মাদ্রাসা অধ্যক্ষের বিচার ও অর্থ তছরুপের প্রতিকার চেয়ে গভর্নিং বডির সভাপতি ফেনীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পি কে এম এনামুল করিমের কাছে লিখিতভাবে আবেদন করা হলেও সিরাজ স্বপদে বহাল ছিলেন। অধ্যক্ষের অনৈতিকতা, অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য তুলে করে প্রতিকার চেয়ে গভর্নিং বডির কাছে লিখিত আবেদন করেছিলেন মাদ্রাসার অভিভাবক সদস্য আবদুস সালাম, আবুল কাসেম, সাহাদাত হোসেন মামুন ও বিদ্যোৎসাহী সদস্য শেখ আবদুল হালিম।

এদিকে নুসরাত হত্যার ঘটনায় দীর্ঘ হচ্ছে জড়িতদের তালিকা। ঘটনার পরিকল্পনা, হত্যা মিশন বাস্তবায়ন, খুনের মিশনে অর্থ ব্যয়সহ নানাভাবে এখন পর্যন্ত পাওয়া গেছে অন্তত ২৫ জনের সংশ্নিষ্টতা। এ তালিকা বাড়তে পারে আরও। শিগগিরই চাঞ্চল্যকর এ মামলার চার্জশিট দাখিল করবে তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

এদিকে, নুসরাত হত্যায় জড়িত তার সহপাঠী শামীমকে পাঁচ দিনের রিমান্ড দিয়েছেন আদালত। বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ফেনীর সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সারাফ উদ্দিনের আদালতে শামীমকে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন। আদালত মঞ্জুর করেন পাঁচ দিন। এ ছাড়া গতকাল এ হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হাফেজ আবদুল কাদের ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

পিবিআইর প্রধান বনজ কুমার মজুমদার বলেন, 'নুসরাত হত্যা মামলার তদন্ত এগিয়ে চলছে। যাদের এরই মধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে তারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে।'

এদিকে, নুসরাত হত্যার ঘটনায় জড়িতদের অর্থ-সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখবে সিআইডি। এ ব্যাপারে সংস্থাটির বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, 'নুসরাতের ঘটনায় জড়িতদের অবৈধ সম্পদের তথ্যানুসন্ধানের ব্যাপারে তদন্ত করার চিন্তা-ভাবনা চলছে।'

দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, অধ্যক্ষের পরামর্শ মতো ৪ এপ্রিল সকালে 'অধ্যক্ষ সাহেব মুক্তি পরিষদের' সভা করা হয় মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের শিক্ষক আবদুল কাদেরের শয়নকক্ষে। একই দিন রাত ১০টার দিকে দ্বিতীয় দফায় কাদেরের কক্ষে সভায় হত্যার ছক চূড়ান্ত হয়। এছাড়া সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেমের দায়িত্বে অবহেলার প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ সদর দপ্তরের তদন্ত কমিটি।

তদন্ত দল ফেনীতে : ফেনী থেকে সমকালের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, গতকাল দ্বিতীয় দিনের মতো পুলিশ সদর দপ্তরের একটি তদন্ত দল সোনাগাজীতে নুসরাত হত্যার বিষয়ে পুলিশের গাফিলতি ছিল কি-না তদন্ত করেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি রুহুল আমিনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, শিক্ষক ও স্থানীয়দের লিখিত মতামত গ্রহণ করেছেন।

বিকেলে ডিআইজি এসএম রুহুল আমিন সাংবাদিকদের জানান, অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার চারিত্রিক বিভিন্ন বিষয় তদন্তে উঠে এসেছে। আগেও এ রকম কিছু সমস্যা ছিল। তখন যদি গভর্নিং কমিটি ব্যবস্থা নিত, তাহলে এ ঘটনা ঘটত না। তিনি বলেন, গভর্নিং কমিটির সবাই নয়, কিছু সদস্য নুসরাত হত্যায় জড়িত ছিল। তবে যে-ই জড়িত থাকুক, সে যত শক্তিশালী হোক না কেন, গ্রেফতার করা হবে তাকে। তদন্ত কমিটি শুক্রবার সংশ্নিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের বক্তব্য গ্রহণ করবে। নুসরাতের ঘটনায় স্থানীয় রাজনীতিও জড়িত বলে জানান তিনি।

রুহুল আমিন আরও বলেন, ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। তারা অনেকের সঙ্গে কথা বলেছেন। নুসরাতের ঘটনায় মোয়াজ্জেমের কোনও গাফিলতি বা দায়িত্বে অবহেলা থাকলে, অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে। তদন্ত শেষ হতে ৩/৪ দিন সময় লাগবে। নথিপত্র যাচাই হচ্ছে।

পিবিআই চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রধান এসপি মোহাম্মদ ইকবাল জানান, নুসরাত হত্যা মামলায় মোট ২৪-২৫ জনের নাম ১৬৪ ধারায় তিনজন আসামির জবানবন্দিতে এসেছে। এখন তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সংশ্নিষ্ট সব আসামিকে গ্রেফতার করা হবে। এ পর্যন্ত ১৮ জন গ্রেফতার হয়েছে।

ঢাকা থেকে গ্রেফতার এ হত্যা মামলার অন্যতম আসামি হাফেজ আবদুল কাদেরকে ফেনী আদালতে সোপর্দ করেছে পিবিআই। বৃহস্পতিবার দুপুরে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি দেওয়ার কথা পিবিআইকে জানালে ফেনী কোর্টে হাজির করা হয় তাকে। এই গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে নুসরাত হত্যার এজাহারভুক্ত সব আসামিকে আটক করা হয়।

পিবিআই সূত্রে জানা যায়, সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের শিক্ষক আবদুল কাদের তদন্তকারী কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর শাহ আলমকে স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। পিবিআইকে হত্যার পরিকল্পনাসহ সব তথ্য সরবরাহ করেন তিনি। আবদুল কাদের পুলিশকে জানিয়েছেন, অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার মুক্তির জন্য আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কারাগারে অধ্যক্ষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সম্ভাব্য করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইর পরিদর্শক শাহ আলম জানান, মামলার এজহারভুক্ত আসামি নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম ও আবদুর রহীম শরীফের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে শামীমের সম্পৃক্ততার বিষয়টি উঠে আসে।

আসামিদের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে- আবদুল কাদের মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার পক্ষে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন, কারাগারে সাক্ষাৎ করা এবং হত্যাকাে র দু'দিন আগে গোপন সভায় উপস্থিত ছিলেন। ১২ জনের উপস্থিতিতে নুসরাত হত্যার রূপরেখা নির্ধারণে তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। তার পরামর্শে হত্যাকাে কে কোথায় থাকবে, তা নির্ধারণ করা হয়। ।