চউকের মেগা প্রকল্প

পদ ছাড়ার পরও কর্তৃত্ব চান ছালাম

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০১৯     আপডেট: ১৯ এপ্রিল ২০১৯

স্বপন কুমার মল্লিক,চট্টগ্রাম

আগামী ২৩ এপ্রিল চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) চেয়ারম্যানের পদ থেকে বিদায় নিচ্ছেন আবদুচ ছালাম। রাজনৈতিক বিবেচনায় ছয় দফায় ১০ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। কিন্তু সরকার চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি জহিরুল আলম দোভাষকে এই পদে নিয়োগ দেওয়ায় শেষ পর্যন্ত বিদায় নিতে হচ্ছে ছালামকে। তবে চেয়ারম্যান পদে না থাকলেও অন্যভাবে চউকের সঙ্গে থাকতে চান তিনি। তদারকির দায়িত্ব পালন করতে চান চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পে। এরই মধ্যে এ ব্যাপারে আগ্রহও প্রকাশ করেছেন তিনি। এদিকে বিদায়ের শেষ মুহূর্তে গতকাল বৃহস্পতিবার একসঙ্গে ৮০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পদোন্নতি দিয়েছেন ছালাম। এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

গত ১০ এপ্রিল চউকের বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বোর্ডের সদস্য ও সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর গিয়াস উদ্দিন বোর্ড সদস্যরা যাতে প্রকল্প তদারকি করতে পারেন সে জন্য ক্ষমতা চান। তার এই বক্তব্যের রেশ ধরে আবদুচ ছালামও তার অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে মেগা প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। মূলত এর পর থেকে বিষয়টি আলোচনায় আসে। যদিও চউকের একটি পক্ষ বলছে, আইন অনুযায়ী এমনটি করা যাবে না। অবশ্য আরেকটি পক্ষ বলছে, বিদ্যমান আইনের মধ্যেই এভাবে দায়িত্বে থাকা সম্ভব।

এ প্রসঙ্গে চউক চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম সমকালকে বলেন, নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান মেগা প্রজেক্ট চট্টগ্রামবাসীর স্বপ্নের প্রকল্প। চট্টগ্রাম নগরবাসীর দীর্ঘদিনের দুর্বিষহ দুর্ভোগ লাঘবে সিডিএর সেরা অর্জন এই মেগা প্রজেক্ট, আর এটির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন আমার দায়িত্ব। তা ছাড়া বৃহৎ এই প্রজেক্টের খুঁটিনাটি সব বিষয়ে সঙ্গত কারণে আমার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। তাই প্রজেক্টটি সুষ্ঠু ও সুচারুভাবে সমাপ্ত করতে সেটির তদারকির দায়িত্বে থাকার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছি। বিগত বোর্ড সভায়ও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিদ্যমান আইন মেনে এবং যাবতীয় নিয়ম অনুসরণ করে এ কাজটি করতে চাই।

বিদায় নেওয়ার আগে গত মঙ্গলবার নবনিযুক্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে তার বাসভবনে দেখা করতে যান ছালাম। এ সময় তিনি একই মনোভাব পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামের উন্নয়নের দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেওয়ার যে অঙ্গীকার ২০০৮ সালে লালদীঘির জনসভায় করেছিলেন, তা বাস্তবায়নেই জনসম্পৃক্ত রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে আমাকে সিডিএর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আমি বিগত ছয় দফায় ১০ বছর ক্ষমতায় থেকে সিডিএকে উন্নয়নের একটি রোল মডেল হিসেবে দাঁড় করিয়েছি। যার অধিকাংশ কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। কিছু কাজ চলমান রয়েছে। এসব প্রকল্প শেষ করার ব্যাপারে নতুন চেয়ারম্যানকে সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছি।

একই বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান এম জহিরুল আলম দোভাষ বলেন, চেয়ারম্যানের পদাধিকার বলে চেয়ারম্যানের হাতেই প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃত্ব থাকার কথা। সিডিএর একটি প্রকল্প বাইরের একজন ব্যক্তি কীভাবে তদারকি করবেন, তা আমার বোধগম্য নয়। দায়িত্ব গ্রহণ না করায় এখন এ ব্যাপারে আর বিস্তারিত কিছু বলতে পারছি না।

প্রসঙ্গত, জলাবদ্ধতা চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর অন্যতম। তাই এ যাবতকালের বড় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করে দিয়েছে একনেক। এ কারণে কয়েক মাস আগে পরিকল্পিতভাবে কাজও শুরু হয় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে। তারা প্রথমে নগরীর পানি নিস্কাশনের অন্যতম মাধ্যম কর্ণফুলীর সঙ্গে সংযোগ খাল ও নালা-নর্দমাগুলো পরিস্কারের কাজে হাত দেয়।

শেষ বেলায় ৮০ জনের বিতর্কিত পদোন্নতি :এদিকে চউক চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামের মেয়াদের শেষ বেলায় ৮০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে তড়িঘড়ি করে 'বিতর্কিত' পদোন্নতি দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গতকাল দুপুরে সংস্থার ৪৩৫তম জরুরি সভায় এ পদোন্নতি দেওয়া হয়। এটিই ছিল তার মেয়াদের শেষ বোর্ড সভা। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পদোন্নতি না দেওয়ায় এ নিয়ে ক্ষুব্ধ চউকের শ্রমিক লীগ ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। দুই কর্মকর্তা আইনি নোটিশও দিয়েছেন এরই মধ্যে।

সূত্র জানায়, চউকে সর্বশেষ পদোন্নতি দেওয়া হয় ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে। তৎকালীন চেয়ারম্যান শাহ মুহম্মদ আখতার উদ্দিনের সময় অন্তত ১৫ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ওই সময় পদোন্নতি দেওয়া হয়। এরপর থেকে পদোন্নতি বন্ধ ছিল সংস্থাটিতে।

মামলা জটিলতার কারণে এ সময়ের মধ্যে পদোন্নতি দেওয়া যায়নি বলে দাবি করেছেন চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম। তিনি বলেন, বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী যোগ্যদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।

সিডিএর বোর্ড সদস্য ও বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির সদস্য মো. গিয়াস উদ্দিন বলেন, মামলাজনিত জটিলতার কারণে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে সিডিএতে পদোন্নতি ও নিয়োগ বন্ধ ছিল। সম্প্রতি মামলা জটিলতার অবসান হয়েছে। এরপর বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটি ছয় মাস ধরে যাচাই-বাছাই করে এবং সরকারি বিধি-বিধান অনুসরণ করে যোগ্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তালিকা করেছে। ওই তালিকা থেকে প্রায় ৮০ জনকে বোর্ড সভায় পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী সিডিএতে জনবল থাকার কথা ৫১৯ জন; কিন্তু বর্তমানে আছেন ৩২৯ জন। বর্তমানে পদ শূন্য রয়েছে ১৯০টি।

চেয়ারম্যানের শেষ মুহূর্তে পদোন্নতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি না পাওয়ায় অসন্তুষ্ট অনেকে। ক্ষুব্ধ দু'জন আইনি নোটিশও দিয়েছেন।

সিডিএ কর্মচারী লীগের সহসভাপতি মো. মহিউদ্দিন বলেন, গোপনভাবে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। কাকে কোন পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে তা প্রকাশ করা হচ্ছে না। তবে অনেকেই পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েছেন বলে শোনা যাচ্ছে। অফিস আদেশ হাতে পাওয়ার পর আন্দোলনের ব্যাপারে কর্মপন্থা নির্ধারণ করবেন তারা।

সিডিএকে আইনি নোটিশ দেওয়া নির্বাহী প্রকৌশলী ফজলুল করিম বলেন, পদোন্নতি পাওয়ার জন্য তার সব ধরনের যোগ্যতা রয়েছে। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই তার নাম পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করা হয়নি। এ জন্য তিনি আইনি নোটিশ দিয়েছেন।

গতকাল সকাল ১১টা থেকে জরুরি বোর্ড সভা শুরু হলে সম্মেলন কক্ষের সামনে অবস্থান করা কর্মচারীরা আবদুচ সালামকে ঘিরে ধরেন। তাদের পদোন্নতি ও প্লট বরাদ্দের বিষয়ে কথা বলতে চান। প্রতিউত্তরে চেয়ারম্যান জানান, 'অনেক কথা হয়েছে।' এরপর পুলিশ পাহারায় তিনি সিডিএ কার্যালয় থেকে বের হয়ে যান।