সাম্প্রতিক গুম, নিখোঁজ ও বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান সুসংহত থাকলেও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে তা ব্যাহত হচ্ছে। দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী মানবাধিকার সুরক্ষা এখনও প্রত্যাশার কাছাকাছি নেই। বিশিষ্টজনের অভিমত, গুম ও নিখোঁজের ঘটনার দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারে না। মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নে জোর দেওয়ার আহ্বান জানান তারা। তবে সরকারের দাবি-  বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির আগের তুলনায় উন্নতি হয়েছে। বিনা বিচারে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা অনেক কমেছে। মানুষ স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছে। এমন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে আজ রোববার পালিত হচ্ছে বিশ্ব মানবাধিকার দিবস।

দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। বাংলাদেশের সংবিধানে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সব মানবাধিকার ও সুশাসনের নিশ্চয়তা বিধান করা হয়েছে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, বর্তমান সরকার মানবাধিকার রক্ষায় বদ্ধপরিকর। সর্বস্তরে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইতিমধ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন-২০০৯ প্রণয়ন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠন করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী এক বাণীতে বলেন, আমরা স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেছি। সংবিধান সংশোধন করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের পথ বন্ধ করেছি। সকল মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার করার মাধ্যমে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছি।

গত আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত ১৩ জন নিখোঁজ হয়েছেন। এর মধ্যে চারজনের খোঁজ পাওয়া গেলেও বাকিদের খোঁজ মেলেনি। এর মধ্যে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক এবং সাবেক রাষ্ট্রদূতও রয়েছেন।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তথ্যমতে, চলতি বছর ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত কমিশনের কাছে গুম ও বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন ঘটনায় মোট ৪৩৯টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ১৪৪টি। গত বছর অভিযোগ ছিল ৬৬৫টি। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৩৯২টি।

মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক সমকালকে বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি অনেক ভালো, অনেক উন্নত। তার কারণ হচ্ছে, মানুষের কথা বলার সুযোগ আছে। জনগণের অধিকার সংরক্ষণের জন্য বর্তমান সরকার অনেক কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি অনেক সুদৃঢ়। তিনি আরও বলেন, সংবিধান অনুযায়ী সব নাগরিকের মৌলিক অধিকারকে সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছে সরকার।

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, সার্বিকভাবে বলা যেতে পারে- বাংলাদেশের বর্তমান মানবাধিকার পরিস্থিতি ভালো নয়। বিশ্বের মানবাধিকার পরিস্থিতিও খারাপ। তিনি বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণেই মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এরপর রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও সাংবাদিক গুম-নিখোঁজের ঘটনায় আমরা যথেষ্ট উদ্বিগ্ন। ধরে নিয়ে মুক্তিপণ চেয়ে টাকা আদায়ও মানবাধিকার লঙ্ঘন।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, মানবাধিকারের কতগুলো শর্ত আছে, যেখানে একজন মানুষ সমাজে স্বাধীনভাবে বসবাস করবে। সে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবে, অন্যের মুখাপেক্ষী হতে হবে না। কিন্তু সমাজের সবাই এ সুবিধা পাচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, একের পর এক রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও সাংবাদিক নিখোঁজ হচ্ছে, তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তারা বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে- তাদের খুঁজে বের করার মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র এ দায় কিছুতেই এড়াতে পারে না।

সুলতানা কামাল আরও বলেন, নারী নির্যাতনের হার উদ্বেগজনক। সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাও ঘটছে অহরহ। আমরা শঙ্কার মধ্যে বেঁচে আছি। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে উন্নতি করছে, কিন্তু মানবাধিকার রক্ষায় সরকারকে আরও বেশি উন্নতি করতে হবে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, কোনো ব্যক্তি নিখোঁজ বা গুম হলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাকে খুঁজে বের করা। কিন্তু রাষ্ট্রের তৎপরতা সেভাবে দৃশ্যমান নয়। এখানেই আমাদের আশঙ্কা। তিনি বলেন, গুমের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের আদালতে সোপর্দ করে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, বর্তমান বিশ্বে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে অস্থিরতা চলছে। রোহিঙ্গাদের সমস্যায় আমরা জর্জরিত। আমাদের এই বিশাল বোঝা টানতে হচ্ছে। বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিয়ে বিশ্বের দরবারে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রাখছে।

দেশের বর্তমান মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, বেসামরিক লোক নিখোঁজ হচ্ছে, যা খুবই উদ্বেগজনক। একের পর এক লোকজনকে কে বা কারা তুলে নিয়ে যাচ্ছে, এটা রাষ্ট্রকে খুঁজে বের করতে হবে। একটি মানবাধিকারবান্ধব সমাজ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) সভাপতি অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, আগামী সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, দেশে ততই মানবাধিকার পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ চরম মানবাধিকার বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছে।

বিশ্ব মানবাধিকার দিবসের কর্মসূচি :'সমতা, ন্যায় বিচার ও মানবিক মর্যাদা'- এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আজ আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হচ্ছে ৬৯তম বিশ্ব মানবাধিকার দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে এ দিবসটি পালিত হবে। এ উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানবাধিকার সংগঠন দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে।

কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পক্ষ থেকে সকাল সাড়ে ৮টায় মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে শোভাযাত্রা বের হবে। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে দু'দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। আজ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। আগামীকাল সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। সেমিনারে সভাপতিত্ব করবেন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক।



মন্তব্য করুন