কবি ও প্রাবন্ধিক ফরহাদ মজহার বলেছেন, 'কোনো নাটক করিনি। যা বলা হয়েছে, তাই করেছি। ডিবি অফিসে নিয়ে যা লিখে দেওয়া হয়েছে, তাই আদালতে দিয়েছি। এর আগে জিজ্ঞাসাবাদের নামে বলতে বাধ্য করা হয় যে, বিনোদনের জন্য বেরিয়েছি। সাদা পোশাকের

কিছু লোক র‌্যাবের কাছ থেকে আমাকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টাও করেছে। অপহরণকারীরা খুলনা-যশোরের দিক দিয়ে সীমান্তের ওপারে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল।' গতকাল শনিবার রাতে রাজধানীর শ্যামলীতে নিজ বাসায় এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

পুলিশের পক্ষ থেকে গত ৭ ডিসেম্বর অপহরণের অভিযোগ এনে মিথ্যা মামলা করার দায়ে ফরহাদ মজহার ও তার স্ত্রী মানবাধিকার কর্মী ফরিদা আখতারের বিরুদ্ধে মামলা করার আদেশ দেন আদালত। ফরিদা আখতারের করা অপহরণ মামলাটি তদন্তে ফরহাদ মজহার অপহূত হননি বলে ৩১ অক্টোবর ফাইনাল রিপোর্ট দিয়েছিল পুলিশ। সেই সঙ্গে মিথ্যা অপহরণের মামলা করে বিভ্রান্ত ও হয়রানি করার অভিযোগে দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় ফরহাদ মজহার ও ১০৯ ধারায় ফরিদা আখতারের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের অনুমতি চান তদন্ত কর্মকর্তা।

গতকাল সংবাদ সম্মেলনে ফরহাদ মজহার দাবি করেন, অপহরণ ঘটনার রাতে তাকে হত্যা করার জন্য বাস থেকে নামানো হচ্ছে ভেবে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। র‌্যাব তাকে খুলনায় নিয়ে চিকিৎসা ও বিশ্রামের পাশাপাশি ঘটনার তদন্ত করতে চাইলে কে বা কারা র‌্যাবের গাড়ির সামনে ট্রাক থামিয়ে পথ বন্ধ করে। তবে র‌্যাব ছোটখাটো যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে তাকে গাড়িতে ওঠায়। স্ত্রী ফরিদা আখতারের সঙ্গে কথা বলিয়ে তাকে আশ্বস্ত করা হয়। কিন্তু সাদা পোশাকের লোকগুলো জোর করে তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে আনার চেষ্টা করে।

ফরহাদ মজহার আরও বলেন, শারীরিক ও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত অবস্থায় তাকে ঢাকায় আদাবর থানায় নিয়ে আসা হয়। তাকে পরিবারের কাছে যেতে না দিয়ে ডিবি অফিসে নেওয়া হয়। সেখানে জিজ্ঞাসাবাদ করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেওয়ার জন্য একটি লিখিত কপি দিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠানো হয়।

তিনি তখন ট্রমায় ছিলেন বলে ডিবি অফিস তাকে দিয়ে যা লিখিয়ে নিয়েছে, তাই তিনি আদালতে দিয়েছেন বলে সাংবাদিকদের জানান।

গত ৩ জুলাই ভোরে তিনি অপহূত হন বলে সে সময় তার স্ত্রী যা জানিয়েছিলেন এবং এজাহার করেছিলেন অনুরূপ বিবরণ দিয়ে তিনি গতকাল সাংবাদিকদের কাছে অতিরিক্ত যা বলেন তা হলো তিনি মার্কেটে ঘুরে বেড়ানো, হানিফ পরিবহনের ঢাকাগামী গাড়িতে পেছনের সিটে বসা সবকিছু করেছেন বাঁচার জন্য। তাকে সব সময় অনুসরণ করা হয়েছে।

ওই ঘটনার পাঁচ মাস পরে গতকালই ফরহাদ মজহার প্রথম মিডিয়াকে কিছু বললেন। এতদিন এ সম্পর্কিত তথ্য কেবল ফরিদা আখতার ও পুলিশের কাছ থেকে জানা গেছে।

গতকালের সংবাদ সম্মেলনে সুনির্দিষ্ট অনেক প্রশ্ন এড়িয়ে যান এবং ঘুরিয়ে উত্তর দেন ফরহাদ মজহার। তিনি বলেন, বিষয়গুলো আদালতে নিষ্পত্তি হোক। গুমের মতো ইস্যুতে তিনি 'মিডিয়া ট্রায়াল' চান না। সাংবাদিকদের আদালতের মতো জেরা না করারও অনুরোধ জানান তিনি। একপর্যায়ে তিনি বলেন, 'আজ সব বলে পরিস্কার করতে পারব না।'

এতদিন কেন এসব কথা বলেননি? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, অপহূত হওয়ার পর যারা ফিরে এসেছেন, তারা কেউ কথা বলেননি। তিনি কথা বলে নিজেকে আরও বিপদে ফেলছেন। তবে যতই লাঞ্ছিত করা হোক, লড়াইটা তিনি চালিয়ে যাবেন। শুধু নিজের বিষয়ে কথা বলতে নয়, বরং বাংলাদেশে এ পর্যন্ত যারা গুম হয়েছেন, তাদের একজন হয়ে তিনি সাংবাদিকদের সামনে এসেছেন। তার বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় যা হবে তাই মেনে নেবেন।

অপহরণকারীরা কি কোনো বিশেষ বাহিনীর লোক- জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়ে বলেন, সেই অন্ধকার মধ্যরাতে যশোরের অভয়নগরে কী হয়েছিল, তা সাংবাদিকরাই খুঁজে বের করুক। অপহরণের পর পুরো সময় তার চোখ বাঁধা ছিল এবং তিনি কোনো নাটক করেননি।

বিচারাধীন বিষয়ে প্রশ্ন না করার অনুরোধ জানিয়ে ফরহাদ মজহার বলেন, তিনি চান, বিচার স্বাধীন গতিতে চলুক।

আপনি মামলা থেকে বাঁচতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছেন কি-না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, নিজের জন্য নয়। দেশে যারা গুম হয়েছে, তাদের জন্য তিনি ফিরে এসেছেন।

সংবাদ সম্মেলনে ফরিদা আখতার বলেন, সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার স্বার্থেই তারা এতদিন চুপ করে ছিলেন। কিন্তু ন্যায়বিচার পেতে এখন উচ্চ আদালতে যাবেন। কারণ গুম-অপহরণের শিকার হয়ে নাগরিক হিসেবে নিরাপত্তা পাওয়া অধিকার। সেই অধিকার পেতে পুলিশের সহায়তা নিতে গিয়ে এখন উল্টো মামলার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

ডিবির বক্তব্য :সংবাদ সম্মেলনে ফরহাদ মজহারের বক্তব্যের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে যোগাযোগ করা হলে ডিবির যুগ্ম কমিশনার আবদুল বাতেন রাতে সমকালকে বলেন, ফরহাদ মজহার আদালতে স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দিয়েছেন। ১৬৪ ধারায় কেন তার জবানবন্দি পুলিশ লিখে দেবে? এটা পুলিশের কাজ নয়। কোনো অভিযোগ থাকলে কেন তিনি আদালতে বলেননি? তার ঘটনায় সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত শেষ করেই আদালতে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। ভিডিও ফুটেজসহ সংশ্নিষ্ট অন্যান্য যে ফুটেজ রয়েছে তাও আদালতে জমা দেওয়া হয়। ফরহাদ মজহার যে অভিযোগ তুলছেন তা ভিত্তিহীন বলে মন্তব্য করেন আবদুল বাতেন।

মন্তব্য করুন