অসুস্থতাজনিত কারণে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা হঠাৎ এক মাসের ছুটিতে যাওয়ার সংবাদে গতকাল মঙ্গলবার দিনভর আলোচনা হয়েছে বিচারাঙ্গনে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশবাসীর নজরও এখন উচ্চ আদালতের দিকে। এরই মধ্যে গতকাল সকালে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন সদ্য নিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা।
এদিকে বিএনপি সমর্থক সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ও আইনজীবীরা দাবি করছেন, চাপের মুখে প্রধান বিচারপতি ছুটিতে যেতে বাধ্য হয়েছেন। সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ মিছিলের পাশাপাশি সাধারণ সভা করে প্রধান বিচারপতিকে বিচার কাজে ফেরাতে পাঁচ দফা দাবিও ঘোষণা করেছেন তারা। অন্যদিকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আবারও বলেছেন, প্রধান বিচারপতি স্বেচ্ছায় ছুটিতে গেছেন। তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত। ছুটিতে যাওয়ার জন্য তাকে কোনো চাপ প্রয়োগ করা হয়নি। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের সঙ্গেও এর কোনো সম্পর্ক নেই। আইনমন্ত্রীর মতে, যারা প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে গণতন্ত্রের ধারা ব্যাহত করার ষড়যন্ত্রের জাল বুনছিলেন, তাদের অপচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় তারা এখন কাম্নাকাটি করছেন।
গত সোমবার প্রধান বিচারপতি এক মাসের ছুটিতে যাওয়ার পর রাতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। প্রজ্ঞাপন অনুয়ায়ী ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা দায়িত্ব নেওয়ায় তার নেতৃত্বে গতকাল সকালে আপিল বিভাগে সংক্ষিপ্ত বিচার কাজ পরিচালিত হয়। এর পর বেলা ২টার দিকে আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের সব বিচারপতিকে নিয়ে ডাকা আকস্ট্মিক 'ফুল কোর্ট' সভায় মিলিত হন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি। তবে হাইকোর্টের কোনো বেঞ্চে গতকাল বিচার কাজ হয়নি। ফুল কোর্ট সভায় বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি অক্ষুণম্ন রাখতে বিচারপতিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি।
৪৮টি বেঞ্চ পুনর্গঠন :এদিকে ছুটিতে যাওয়ার আগের দিন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা হাইকোর্ট বিভাগে যে ৪৮টি বেঞ্চ পুনর্গঠন করেছিলেন, তার কার্যকারিতা বাতিল করেছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি। গতকাল সন্ধ্যায় সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে নতুন করে ৪৮টি বেঞ্চ পুনর্গঠনের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি বেঞ্চ পুনর্গঠনের এ আদেশ জারি করেন। আজ বুধবার থেকে নবগঠিত বেঞ্চগুলোতে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
আপিল বিভাগে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি :গতকাল সকালে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব নেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিয়া। পরে তার নেতৃত্বে পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ সকাল ৯টা ৬ মিনিট থেকে ৫৪ মিনিট আপিল বিভাগে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন। বেঞ্চের অন্য বিচারপতিরা হলেন- বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি ইমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার। প্রথম দিনের শুনানিতে ২০টি আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়। এর পর প্রথা অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে বিচারপতি ও আইনজীবীদের মধ্যে 'সৌজন্য সাক্ষাৎ' অনুষ্ঠানে যোগ দেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি।
সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে নেই প্রধান বিচারপতি :আয়োজন করলেও ছুটিতে যাওয়ায় প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা গতকাল বিচারপতি ও আইনজীবীদের সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে ছিলেন না। প্রথা অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের (আপিল ও হাইকোর্ট) বিচারপতিরা অবকাশকালীন ছুটির পর সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন। সুপ্রিম কোর্টের মূল ভবন সংলঘ্ন বাগানে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে বিচারপতিদের পাশাপাশি অ্যাটর্নি জেনারেল, আইনজীবী সমিতির বর্তমান ও সাবেক নেতারাসহ সাধারণ আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।
ফুল কোর্ট সভা :দায়িত্ব নেওয়ার পর গতকাল দুপুরে আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের সব বিচারপতির সমল্প্বয়ে ফুল কোর্ট সভা আহ্বান করেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি। পরে উভয় বিভাগের বিচারপতিদের উপস্থিতিতে বেলা ২টায় সুপ্রিম কোর্টের জাজেস লাউঞ্জে এ সভার কার্যক্রম শুরু হয়। সোয়া ২টার দিকে জাজেস লাউঞ্জে আসেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি।
পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে সভায় উপস্থিত একাধিক বিচারপতি জানান, ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি রক্ষায় বিচারপতিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি দায়িত্ব পালনে সবার আন্তরিক সহযোগিতাও প্রত্যাশা করেন। এ ছাড়া বিচারপতিদের নিয়ম অনুযায়ী এজলাসে বসা ও দ্রুত রায় দিয়ে বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি। পরে বেলা পৌনে ৩টার দিকে এ সভার কার্যক্রম সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়।
প্রধান বিচারপতি ক্যান্সারসহ নানা রোগে আক্রান্ত :আইনমন্ত্রী
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ক্যান্সারসহ নানা রোগে আক্রান্ত। তার বিশ্রাম প্রয়োজন। এ কারণে তিনি স্বেচ্ছায় এক মাসের ছুটিতে গেছেন। গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
আনিসুল হক বলেন, প্রধান বিচারপতি যেভাবে চেয়েছেন, আইন অনুযায়ী সেভাবেই রাষ্ট্রপতি তার ছুটি মঞ্জুর করেছেন। সংবিধানে যে প্রভিশন আছে, সেভাবেই চলতে হবে। এখন একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি বলেন, এখানে নিয়মটা হচ্ছে- বিচার বিভাগ স্বাধীন হওয়ার পর প্রধান বিচারপতি নিজের ছুটি নিজেই নেন। এ জন্য কারও কাছ থেকে অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না। যেহেতু তিনি ছুটিতে যাবেন, ওই সময় আরেকজন প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করবেন। এ কারণে তিনি রাষ্ট্রপতিকে তার ছুটির ব্যাপারে অবহিত করবেন। রাষ্ট্রপতির কাছে দেওয়া এ সংক্রান্ত পত্র আইন মন্ত্রণালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর হয়ে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে যায়। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিষয়টি আমরাও অবহিত হয়েছি।
প্রধান বিচারপতি চাপের মুখে ছুটিতে যেতে বাধ্য হয়েছেন- বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, এটা তারা অনুমান করে বলছেন। এ ধারণা অমূলক। বরং তারা একটা ষড়যন্ত্র করার চেষ্টা করছিলেন। তিনি বলেন, যারা প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে গণতন্ত্রের ধারা ব্যাহত করার ষড়যন্ত্রের জাল বুনছিলেন, তাদের অপচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় তারা এখন কাম্নাকাটি করছেন।
প্রধান বিচারপতির অবস্থান জানা নেই :অ্যাটর্নি জেনারেল
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, প্রধান বিচারপতি ক্যান্সারের রোগী। আগেও তার ক্যান্সারের চিকিৎসা হয়েছে। কাজেই ছুটি নেওয়া তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের অভিযোগ প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এসব বক্তব্য দিয়ে একটি রাজনেতিক দল নানা ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করছে। এসব বক্তব্যের কোনো সারবত্তা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। এগুলোকে গোচরে আনারই প্রয়োজন পড়ে না। গতকাল তার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বিভিম্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
'প্রধান বিচারপতিকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে'- বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের এমন অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা আখ্যায়িত করে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, প্রধান বিচারপতি কোথায় আছেন, তা জানা নেই। জানার কথাও নয়। তা ছাড়া অসুস্থ হলে কেউ যদি অনুমতি না দেন, তাহলে তো জোর করে তার সঙ্গে দেখাও করা যায় না।
সাধারণ আইনজীবীদের ব্যানারে পাঁচ দফা দাবি :এদিকে ছুটিতে যাওয়া প্রধান বিচারপতিকে বিচার কাজে ফেরাতে সাধারণ আইনজীবীদের ব্যানারে পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে এ নিয়ে একটি বিক্ষোভ মিছিলও বের করেন তারা।
আইনজীবী রফিকুল ইসলাম মেহেদীর সভাপতিত্বে এ মিছিল শেষে সমাবেশে ছিলেন অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ্‌ মিয়া, ড. ইউনুছ আলী আকন্দ, আবদুর রকিব, আশফাকুজ্জামান রিপন, মোস্তফা কামাল, মনির হোসেন, শরীফ ইউ আহমেদ প্রমুখ। সমাবেশে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো- জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের মাধ্যমে প্রধান বিচারপতির অবস্থান জানাতে হবে, জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের সাক্ষাৎ করতে দিতে হবে, তার ছুটির কারণ জানতে একটি কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করতে হবে ইত্যাদি।
সুপ্রিম কোর্ট বারের জরুরি সভা :চাপের মুখে প্রধান বিচারপতিকে ছুটিতে যেতে বাধ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন। গতকাল সকালে ও বিকেলে দুই দফায় সভা করার পর সমিতির সভাপতি সাংবাদিকদের কাছে এ অভিযোগ করেন। সকালে প্রথম দফায় বারের কার্যকরী কমিটির সদস্যদের নিয়ে জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পরে বিকেলে বারের সাবেক সভাপতি ও সম্পাদকসহ কয়েকজন ৩৫ জন সিনিয়র আইনজীবীর সঙ্গে বৈঠক করেন। তবে বৈঠক দুটিতে কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়ায় আজ বুধবার ফের বৈঠকের দিন ধার্য করা হয়েছে।
জরুরি সাধারণ সভার বরাত দিয়ে জয়নুল আবেদীন বলেন, সমগ্র জাতি জানে- একটি রায়ের পরে তাকে একটি রাজনৈতিক দল ও সরকার বিভিম্নভাবে চাপ প্রয়োগ করছিল। ওই চাপের অংশ হিসেবেই সোমবার তাকে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। তিনি ছুটিতে যেতে চাননি। তাকে বাধ্য করা হয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের মানুষের আশা-ভরসার শেষ আশ্রয়স্থল হচ্ছে সুপ্রিম কোর্ট। এই উচ্চ আদালত যদি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে না পারেন, এখানেও যদি সরকারের হস্তক্ষেপ হয়, তাহলে সেটি জাতির জন্য দুঃখজনক। আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে এবং সিনিয়র আইনজীবীদের সঙ্গে সভা করে পরবর্তী পদক্ষেপ জানানো হবে।
সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, সাবেক বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরী, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, মওদুদ আহমদ, গিয়াস উদ্দিন আহমেদ, সাবেক বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী, সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এমকে রহমান, সুব্রত চৌধুরী প্রমুখ।
মিশ্র প্রতিক্রিয়া :এ প্রসঙ্গে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ মনে করেন, ব্যক্তিগত কারণে প্রধান বিচারপতির ছুটিতে যাওয়া নিয়ে রাজনীতি করা সমীচীন নয়। অবশ্য বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল বাসেত মজুমদার মনে করছেন, নানা সমালোচনার মুখে পড়ে নিজে থেকেই অসুস্থতার ছুটি নিয়েছেন তিনি। যদিও তাদের সঙ্গে ভিম্নমত পোষণ করেছেন ড. শাহদীন মালিক। তার মতে, যে সময়ে এবং যে প্রক্রিয়ায় তিনি ছুটিতে গেলেন, তাতে মানুষের মনে সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, প্রধান বিচারপতির ছুটি চাওয়ার বিষয়টি স্বাভাবিক নয়। এর পেছনে কোনো কারণ থাকতে পারে। প্রধান বিচারপতি এখন কী অবস্থায় আছেন, তা জানা নেই বলেও জানান তিনি।


মন্তব্য করুন