ওয়াক্‌ফ সম্পত্তি লুটপাট হচ্ছে

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০১৭

হকিকত জাহান হকি


যে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি পবিত্র ধর্মবোধ থেকে দান করা হয় জনকল্যাণের উদ্দেশ্যে, তা যে ব্যাপকভাবে বেদখল, আত্মসাৎ ও লুটপাটের কবলে পড়তে পারে- তা সহজে বিশ্বাস হওয়ার নয়। কিন্তু দেশে ওয়াক্‌ফ এস্টেটগুলোর ক্ষেত্রে তা-ই ঘটছে। সম্পত্তি দখল, বেহাত ও সম্পত্তির আয় ক্রমাগত আত্মসাৎ হয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর।
২০১৪ সালে ধর্ম মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটিতে ওয়াক্‌ফ প্রশাসকের কার্যালয়ে নিবন্ধিত থাকা সম্পত্তির মধ্যে ৮৫ হাজার ৫৭২ একর ভূমি বেহাত হওয়ার একটি হিসাব এক প্রতিবেদনে দাখিল করা হয়েছিল। কোনো জমি উদ্ধার হওয়ার খবর পরবর্তী সময়ে জানা যায়নি।

দেশে ওয়াক্‌ফ সম্পত্তির মোট পরিমাণ সম্পর্কেও সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। বিভিম্ন বেসরকারি হিসাবে যত সংখ্যক ওয়াক্‌ফ এস্টেট ও ভূ-সম্পত্তির কথা জানা যায়, তার আনুমানিক এক-তৃতীয়াংশের কম সরকারি ওয়াক্‌ফ প্রশাসকের অফিসে নিবন্ধিত আছে। হালনাগাদ তথ্য অনুসারে, বর্তমানে নিবন্ধিত এস্টেট সারাদেশে ২১ হাজার ৯৩৯টি। এগুলোর অধীনে জমি আছে চার লাখ ২৪ হাজার ৫৭১ দশমিক ৭৪ একর। অন্যান্য সূত্র মনে করে, দেশে নয় লাখ একরের মতো ওয়াক্‌ফ জমি আছে।
মধ্যযুগে উপমহাদেশে ইসলামের আগমন ও পরে রাজত্ব প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ দেশে নবাবরা এবং বহু বিত্তবান মুসলিম বহু সম্পত্তি ওয়াক্‌ফ করেছেন। যে কোনো মুসলিম নিজের সম্পত্তির স্বত্ব পরিত্যাগ করে দান করতে পারেন, যে সম্পত্তি থেকে আহূত আয় তার ইচ্ছামতো নির্দেশিত পথে দরিদ্র মানুষের কল্যাণে ব্যয় হতে পারে। ওই সম্পত্তি তিনি নিজে এবং তার ওয়ারিশানরাও ফিরিয়ে নিতে পারবেন না। ট্রাস্ট বা কমিটি দ্বারা পরিচালিত এস্টেটের আয় থেকে মাদ্রাসা, মসজিদ, এতিমখানা, হাসপাতাল প্রভৃতি পরিচালিত হয়। বেহাত হয় বলে এসব প্রতিষ্ঠানে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় স্থানীয় স্বার্থাল্প্বেষী গ্রুপগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত লেগেই আছে।
সূত্র জানায়, ওয়াক্‌ফ প্রশাসনের ভেতরে দুর্নীতির কারণে বিভিম্ন এস্টেটের মোতোয়ালিরা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে অর্থ আত্মসাৎ করেন। যুগ যুগ ধরে মুসলিম সমাজে বিশ্বাসের ভিত্তিতে ওয়াক্‌ফ কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে এসেছে। কেবল মুখে সম্পত্তি ওয়াক্‌ফ করে যাওয়ার পরও বংশধররা এবং স্থানীয় সমাজভিত্তিক কমিটি মসজিদ-মাদ্রাসা পরিচালিত করে আসছেন এমন নজির অনেক আছে। এ খাতের সম্পত্তি থেকে জনকল্যাণের কাজ সুনিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালনার জন্য ব্রিটিশ আমলে প্রথম ১৯৩৪ সালে বেঙ্গল ওয়াক্‌ফ অ্যাক্ট পাস হয়। পরে পাকিস্তান আমলে ১৯৬২ সালে এবং স্বাধীন বাংলাদেশে ২০১৩ সালে সংশোধিত আইন হয়। কিন্তু আইনের দুর্বলতা, সরকারি প্রশাসনের দুর্বলতা-দুর্নীতি, দৃঢ় ব্যবস্থাপনার অভাব প্রভৃতির সুযোগে মূল ওয়াকিফ্‌ বা দাতার মৃতু্যর পর তার ওয়ারিশান হিসেবে ভুয়া নামে অথবা ওয়ারিশানদের প্রভাবিত করে টাউট-বাটপাররা ওয়াক্‌ফ সম্পত্তি কেনাবেচা বা দখল করছে বলে সূত্রগুলো জানায়। নিয়মিত আয়ও আত্মসাৎ হয়।
সমকালের পক্ষ থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে সরেজমিন তথ্যানুসন্ধান করে দেখা গেছে, বিভিম্ন ওয়াক্‌ফ এস্টেটের অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র প্রায় একই রকমের।
ওয়াক্‌ফ প্রশাসক শহীদুল ইসলাম সমকালকে বলেন, এস্টেটগুলো থেকে অর্জিত অর্থ ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। অনিয়ম-দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে সেটি তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে মোতোয়ালিকে অপসারণ করে নতুন কমিটি গঠন করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা করতে নতুন কমিটিকে পরামর্শ দেওয়া হয়। জমি বেহাত-বেদখল হলে তা উদ্ধারের জন্য আদালতে মামলা করা হয়।
প্রশাসক আরও বলেন, জনবল কম থাকায় সারাদেশের ওয়াক্‌ফ এস্টেটগুলোতে তদারকি জোর করা সম্ভব হচ্ছে না।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের ওয়াক্‌ফ প্রশাসন কর্তৃক মনোনীত মোতোয়ালির নেতৃত্বাধীন কমিটি ওয়াক্‌ফ এস্টেটগুলোর কার্যক্রম পরিচালনা করে। এই প্রশাসন সূত্র জানায়, অর্জিত অর্থ এস্টেটগুলোর ব্যাংক হিসাবে জমা করার জন্য আলাদা সার্কুলার জারি করা হয়েছে। মোতোয়ালিরা ওই সার্কুলার মানছেন না। এখান থেকে অর্জিত অর্থে অনেক দুর্নীতিবাজ বাড়ি-গাড়িসহ বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন। ব্যাংক হিসাব রক্ষা, প্রশাসন থেকে নিরীক্ষা এবং এস্টেটের লাভ তথা ব্যয়ের চেয়ে আয় বেশি হলে একটি অংশ ওয়াক্‌ফ প্রশাসনের তহবিলে জমা হওয়া ইত্যাদি কোনো কিছুই সঠিকভাবে প্রতিপালন হয় না। নিরীক্ষা হলেও যোগসাজশে লাভ না দেখানো একরকম প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিতে পর্যবসিত হয়েছে বলে সূত্র ধারণা দেয়।
সরেজমিনে জানা গেছে, বিভিম্ন সময় স্থানীয় সরলমনা ধর্মপ্রাণ মানুষ মোতোয়ালিসহ পরিচালনা কমিটির অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালেও তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না।
ওয়াক্‌ফ প্রশাসনের উপপ্রশাসক দেওয়ান আবদুস সামাদ সমকালের কাছে স্বীকার করেন, এস্টেটগুলোর আয়ের অর্থ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করার সার্কুলার কমিটিগুলো মেনে চলছে না। তারা তাদের ইচ্ছামতো খরচ করছেন। এস্টেটগুলোর অর্থ শুধু আল্লাহর নামে বা ধর্মীয় কাজে ও সেবামূলক কাজে খরচ করা যাবে।
জানা গেছে, বর্তমানে ঢাকাসহ সারাদেশে ওয়াক্‌ফ প্রশাসনের মোট জনবল ১১১ জন। ৬৪ জেলার মধ্যে অফিস আছে ৩৮ জেলায়। জনবল সংকট নিরসনে এক হাজার ৪৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীর একটি প্রস্তাব বেশ আগে ধর্ম মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
আজমপুর জামে মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা :রাজধানীর উত্তরার আজমপুর জামে মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানার বরখাস্ত সাবেক মোতোয়ালি হাজি মো. নাসিরউদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে কমবেশি পাঁচ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এর দুই কোটি ৮৪ লাখ ১৭ টাকা লোপাটের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে। ১৯৯৭ সাল থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ২০ বছর এই মোতোয়ালির দায়িত্ব পালনকালে এস্টেটটি দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছিল। ওয়াক্‌ফ প্রশাসন হাজি নাসিরউদ্দিন সরকারকে অপসারিত করে নতুন মোতোয়ালি নিয়োগ ও কমিটি গঠন করেছে। (এই এস্টেটের বিস্তারতি তথ্য পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।)
জুমুর আলী ফকিরের মাজার শরিফ :রাজধানীর উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের জুমুর আলী ফকিরের মাজারের পাঁচ কাঠা জমির মধ্যে প্রায় তিন কাঠা অবৈধভাবে দখল করে দোকানপাট নির্মাণ করে ব্যবসা করছেন স্থানীয় কতিপয় ব্যক্তি। মাজারের পূর্ব ও দক্ষিণ পাশে নির্মাণ করা ১১টি দোকানের মধ্যে স্থানীয় শিপন মিয়ার দখলে ১০টি ও মো. সেলিমের দখলে একটি। দোকানগুলো থেকে মাসে ভাড়া আসে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা, যা শিপন ও সেলিমের পকেটে যায়।
জুমুর আলী ফকিরের বংশধর এস্টেটটির যুগ্ম মোতোয়ালি মো. শামীম সমকালকে বলেন, শিপন ও সেলিম প্রভাব খাটিয়ে দোকান নির্মাণ করেছেন।
শিপন মিয়া সমকালকে বলেন, শামীমসহ তার পরিবারের তিনজন তাকে ওই জমির আমমোক্তারনামা দিয়েছে। এরপর দোকান নির্মাণ করা হয়েছে।
যোগাযোগ করা হলে মো. শামীম বলেন, শিপন ভুয়া আমমোক্তারনামা তৈরি করেছে।
আজিমপুর ছাপড়া মসজিদ :রাজধানীর আজিমপুর জামে (ছাপড়া) মসজিদ ও মাদ্রাসা ভবনের পূর্ব ও দক্ষিণ পাশে নির্মাণ করা হয়েছে ১৬টি দোকান। প্রতি মাসে লক্ষাধিক টাকা ভাড়া আদায় হয়। ওই টাকা মসজিদ উম্নয়ন ও মুসল্লিদের সেবামূলক কাজে কতটুকু খরচ করা হয়, তা নিয়ে স্থানীয় জনমনে সন্দেহ আছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মসজিদের পাশের এক ব্যক্তি সমকালকে বলেন, মসজিদ পরিচালনার সঙ্গে জড়িতরা তাদের স্বার্থে ওই টাকা খরচ করে থাকেন। মসজিদ ভবনের পশ্চিম পাশে ওয়াক্‌ফকৃত প্রায় ১০ কাঠা জমি নিয়ে চলছে বিরোধ।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আবদুল মাম্নান সমকালকে বলেন, মসজিদের মোতোয়ালি মো. জুবায়ের মাস্টার্স বিল্ডার্সের সঙ্গে ওই জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণের চুক্তি করেছেন।
মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্য রিয়াজ উদ্দিন সমকালকে বলেন, মসজিদের স্বার্থে মসজিদ ভবনটি ঘেঁষে পশ্চিম পাশে লম্বালম্বিভাবে ছয় ফুট করে জায়গা ছেড়ে দেওয়ার জন্য দাবি জানানো হয়েছে।
বাবুস সালাম মসজিদ-মাদ্রাসা :হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনে পুলিশ বক্সসংলঘ্ন বাবুস সালাম মসজিদ-মাদ্রাসার পূর্ব ও উত্তর পাশের ১৭টি দোকান থেকে মাসে ভাড়া আদায় ১০ লাখের বেশি টাকা। মসজিদটির দখল নিয়ে স্থানীয় দুই গ্রুপে দ্বন্দ্ব চলছে এবং পরস্পরের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে।
স্থানীয় সৈয়দ মুস্তাক হোসেন রতন মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং তিনিই প্রথম মোতোয়ালি ছিলেন। বর্তমান কমিটির প্রধান স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি মফিজউদ্দিন বেপারী সমকালকে বলেন, অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে মসজিদের অর্থ আত্মসাতের দায়ে মুসল্লিরা মুস্তাক হোসেনকে বিতাড়িত করেছেন।
পক্ষান্তরে মুস্তাক হোসেন সমকালকে বলেন, মসজিদ ও মাদ্রাসা পরিচালনার ক্ষেত্রে মফিজ বেপারীর কোনো বৈধতা নেই। তিনি প্রভাব খাটিয়ে নিজের দখলে রেখেছেন প্রতিষ্ঠানটি।
মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মো. আনিসুর রহমান সাত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মুস্তাক হোসেন রতনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছেন। পরে এই প্রিন্সিপালের বিরুদ্ধে ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করেন মুস্তাক হোসেন রতন। দুটি মামলাই বিচারাধীন।