'বড় ভাই-ছোট ভাই' দ্বন্দ্বে বাড়ছে খুনোখুনি

ঢাকায় তিন মাসে নিহত পাঁচ কিশোর-তরুণ

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০১৭

ইন্দ্রজিৎ সরকার


বন্ধুদের মধ্যে সিনিয়র-জুনিয়র (কে বড়, কে ছোট) নির্ধারণের মতো তুচ্ছ বিষয় নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ প্রায়ই গড়াচ্ছে খুনোখুনিতে। গত তিন মাসে শুধু ঢাকাতেই খুন হয়েছে পাঁচ কিশোর-তরুণ। একই ধরনের দ্বন্দ্বে ছুরিকাঘাত বা পিটুনিতে আহত হয়েছে আরও কয়েকজন। সর্বশেষ গত শুক্রবার ফেসবুকে বাকবিতন্ডার জেরে কদমতলীর রায়েরবাগে খুন হয়েছে এক তরুণ। তদন্তসংশ্নিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, তাৎক্ষণিকভাবে ঘটে বলে আগে থেকে এসব ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো সুযোগই থাকে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম সমকালকে বলেন, ছোট-বড় নয়, সমস্যাটি আসলে নিজেকে 'বড় ভাই' হিসেবে জাহির করার প্রবণতা। এই সংস্কৃতি সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার। আধুনিক রাষ্ট্রেও এই সামন্ত মনমানসিকতা রয়ে গেছে এবং সব দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। এ রকম ঘটার মূল কারণ, কিশোর-তরুণদের এই সংস্কৃতি থেকে মুক্ত করার দিকে কারও মনোযোগ নেই। রাজনৈতিক দল, সরকারি প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনেরও তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। পড়ালেখার পাশাপাশি তরুণদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও গঠনমূলক কাজে যুক্ত করা গেলে এসব ঘটনা ঘটত না।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ শাখার উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান সমকালকে বলেন, এসব খুন বিভিম্ন
কারণে হতে পারে। তবে খুব কম ক্ষেত্রেই পুলিশ আগে থেকে সতর্ক হতে পারে। তাৎক্ষণিক বিরোধের জের ধরে কোনো খুন হলে তা আগে থেকে জানা সম্ভব নয়। তবে সব ঘটনাতেই জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়েছে পুলিশ।
সংশ্নিষ্টরা জানান, অনেক কিশোর-তরুণের মধ্যেই নিজেকে বড় ভাবার বা নায়কোচিত বা দলনেতাসুলভ প্রবণতা থাকে। নিজেদের বা আশপাশের বলয়ে তারা এই মানসিকতা থেকে বিভিম্ন সময় ভূমিকা রাখার চেষ্টা করে। এতে কেউ কেউ হয়তো বিরক্ত বা ক্ষুব্ধ হয়। যা থেকে তর্ক-বিতর্ক শেষ পর্যন্ত গড়ায় খুনাখুনিতে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে পরপর এমন কয়েকটি হত্যাকান্ড ঘটে। ৬ জানুয়ারি উত্তরায় খুন হয় নবম শ্রেণির ছাত্র আদনান কবির। এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই ১৫ জানুয়ারি রূপনগরে কিশোর কামাল হোসেন এবং ১৮ জানুয়ারি তেজগাঁওয়ের তেজকুনিপাড়ায় আবদুল আজিজ খুন হয়। সর্বশেষ গত ৬ অক্টোবর কদমতলীর রায়েরবাগের মুজাহিদনগর এলাকায় গ্রিল মিস্ত্রি রফিকুল ইসলাম শিপনকে (১৮) ছুরিকাঘাতে হত্যা করে তার বন্ধুরা।
কদমতলী থানার ওসি এম এ জলিল সমকালকে বলেন, বন্ধুদের মধ্যে বিরোধের জেরে শিপনকে খুন করা হয়। ঘটনার পর গ্রেফতার সজীব, বাবু, সাগর ও বাঁধন জিজ্ঞাসাবাদে এ কথা স্বীকার করেছে। খেলার মাঠে বিরোধের পর এ নিয়ে ফেসবুকের মেসেঞ্জারে তাদের বাকবিতন্ডা চলছিল।
এর আগে ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার উপকণ্ঠ আশুলিয়ার পলাশবাড়ী এলাকায় স্কুলছাত্র আল-আমিনকে (১৪) হত্যা করা হয় বুকে বড় পেরেক ঢুকিয়ে। আশুলিয়া থানার ওসি আবদুল আউয়াল সমকালকে জানান, এলাকায় কে বড় আর কে ছোট এ নিয়ে বিরোধে তাকে হত্যা করা হয়। মামলার পাঁচ আসামির মধ্যে চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দিও দিয়েছে।
মিরপুরের উত্তর পীরেরবাগ এলাকায় গত ২২ আগস্ট ভোরে কবির হোসেন (২১) নামে এক তরুণকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা মিরপুর থানার এসআই ওহিদুল ইসলাম সমকালকে বলেন, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধে এ হত্যাকান্ড ঘটে। এজাহারভুক্ত সাত আসামির কেউ ধরা না পড়লেও জড়িত সন্দেহে দু'জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে বিপ্লব ঘটনার আদ্যোপান্ত স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। তার দাবি, হত্যা নয়, শুধু পায়ের রগ কেটে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
গত ১৩ আগস্ট রাতে মোহাম্মদপুরের কাদেরিয়া তৈয়বিয়া আলিয়া কামিল মাদ্রাসার দশম শ্রেণির ছাত্র মোফাজ্জল হোসেনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। মোহাম্মদপুর থানার ওসি জামাল উদ্দিন মীর সমকালকে জানান, নামাজ পড়তে ডাকা নিয়ে সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বের জের ধরে তাকে হত্যা করে নবম শ্রেণির ছাত্ররা। অভিযুক্তদের মধ্যে হোস্টেল সুপার মিজানুর রহমান ও নবম শ্রেণির ছাত্র হিমেলকে গ্রেফতারের পর তারা আদালতে জবানবন্দি দেয়।
এ ঘটনার তিন মাস আগে ১ জুলাই আদাবরের শেখেরটেক এলাকায় সজল (১৫) নামে এক টেইলার্স কর্মীকে বেধড়ক পেটায় তার বন্ধুরা। পরদিন মারা যায় সে। আদাবর থানার ওসি শেখ শাহিনুর রহমান সমকালকে জানান, এজাহারভুক্ত চার আসামিকেই গ্রেফতার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, চা পান করতে গিয়ে ছোট-বড় নিয়ে দ্বন্দ্বে সজলকে পেটানো হয়।