লিও টলস্টয়ের একটি মন্তব্য, খুব সম্ভবত, সময়ের জন্যে প্রযোজ্য। বিশ্বখ্যাত এই সাহিত্যিক বহু বছর আগে বলেছিলেন, একটি দেশকে ধ্বংস করতে হলে সে দেশের মানুষের মধ্যে ধর্মের নামে লড়াই লাগিয়ে দিলেই চলবে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও বহুবার এবং বহুভাবে ধর্মের বাড়াবাড়ি নিয়ে বাঙালিকে সতর্ক করেছেন। একবার বলেছেন- 'ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে/অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে।'

সাম্প্রতিক দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতার সময় যেভাবে ধর্মকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত উন্মাদনা এমনকি সহিংসতা ছড়ানো হয়েছে, তাতে টলস্টয় ও রবীন্দ্রনাথের উদ্ৃব্দতি দুটি মনে পড়ার মতো। অথচ এই বাংলাদেশে সব ধর্মের, সব বর্ণ ও গোত্রের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী। সম্প্রীতির এই ঐতিহ্য প্রকৃতিগতভাবে লালিত। বাঙালির ইতিহাসে যা কিছু মহৎ, যা কিছু বৃহৎ, তার সবটাই সম্প্রীতির অর্জন; এবং এই শক্তি বাঙালির সভ্যতা নির্মাণ করেছে, বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছে। একে যখনই দুর্বল করা হয়েছে তখনই অকল্যাণ এসেছে। অকল্যাণের এই অমানিশা যারা এনেছে তারা বিভেদের ও বিজাতীয় মানুষ, অকল্যাণের মানুষ।

আশার কথা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ এই বিভেদকামী ও হিংসাশ্রয়ী মানুষের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। সমাজ প্রগতির প্রবক্তারা সম্প্রীতি রক্ষায় মাঠে নেমেছেন। কারণ, এই তাণ্ডব চালাতে দিলে দেশের ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে শুধু বিভাজন বাড়বে না, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অস্থিরতাও তৈরি হবে, যে অস্থিরতার অনিবার্য পরিণতি হবে দুঃখজনক।

সাধারণ মানুষ কখনোই ধর্ম-সংঘাত তৈরি করে না, কোনো দেশেই করেনি, করে স্বার্থান্বেষীরা। তারা কখনও রাজনীতি করে, কখনও ব্যবসা করে, কখনও অন্যের হয়ে ভাড়া খাটে কিংবা অন্ধতায় ভোগে। এই মাটিতে একবার নয়, আগেও বহুবার স্বার্থান্বেষী কিছু মহল সম্প্রীতির সহজাত বাঁধনে ফাটল ধরাতে চেয়েছে; সফলও হয়েছে তারা কখনও; ফলে মানুষে মানুষে দূরত্ব বেড়েছে। সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপারটা ঘটেছে রাষ্ট্রশক্তির হাতে, পরিকল্পিতভাবে। কিন্তু যে সম্প্রীতি বাংলার মাটিতে সহজাত, সে কি হার মেনেছে? মানেনি। বাঙালি নতুন করে সংঘবদ্ধ হয়েছে, প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে বিভাজনের শক্তির বিরুদ্ধে।

একটি কথা ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিনির্মাণ হয়েছে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্তার শক্তিতে; যা আমাদের জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি। কিন্তু সেই ভিত্তিতে ফাটল ধরানোর চেষ্টা চলেছে বারংবার। যারা এ কাজটি করার চেষ্টা করেছে তারা সন্দেহাতীত চরম সাম্প্রদায়িক, কিংবা ধর্মের পরিচয়ে বকধার্মিকও। অতএব তাদের মোকাবিলা করা সভ্যতার দাবি।

১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ শেষে ভারতের শরণার্থী শিবির থেকে প্রায় এক কোটি দেশত্যাগী মানুষ, মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান নির্বিশেষে, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসে। ধ্বংস ও রক্তপাতের মধ্য থেকে অসাম্প্রদায়িক নতুন বাংলাদেশ জেগে ওঠে। সে জেগে ওঠা স্থায়ী হয় না। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তি। দুটি সামরিক শাসন, সংবিধানে পঞ্চম ও অষ্টম সংশোধনী ইত্যাদি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে নতুন করে আতঙ্কে নিপতিত করে। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা অতিক্ষুদ্র আদিবাসীসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিপন্ন করতে শুরু করে। একাত্তর পাল্টে দিয়ে সাতচল্লিশের সাম্প্রদায়িক চেতনা নতুন করে গ্রাস করতে থাকে। যে সাম্প্রদায়িকতাকে আমরা মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে কবর দিয়েছিলাম বলে আত্মতুষ্টি লাভ করেছি, সেই সাম্প্রদায়িকতা নতুন করে পাখা বিস্তার করে। লাখো রক্তের মূল্যে কেনা বাংলাদেশ আরেক পূর্ব পাকিস্তানে পরিণত হয়। ভূলুণ্ঠিত হয় শুভবুদ্ধি, উগ্র ধর্মবাদ জেঁকে বসে।

এখন আমরা এমন এক সমাজে বাস করি যেখানে সবলই সব! শুধু সংখ্যালঘু নয়, সংখ্যাগুরুদের বেলাতেও এটি প্রযোজ্য। এর মধ্যে আবার যুক্ত হয় ভয়ংকর সব ভিনদেশি জঙ্গিতত্ত্বের বিষ, জিহাদি তত্ত্ব, যা আরেক সংকটের সৃষ্টি করে। ফলে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতা বেড়ে চলে। সম্পত্তি দখল, ভয়-হুমকি-ধমকি, ঘরবাড়ি ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা চলতে থাকে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে অনেকে মাটি কামড়ে পড়ে থাকেন, অনেকেই দেশান্তরিত হওয়ার মতো চরম কষ্টকর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।

মুক্তিযুদ্ধের হূতগৌরব পুনরুদ্ধারে শেখ হাসিনার শাসনামল বহুবিধ সাহসী অবদান রাখা সত্ত্বেও সমাজ পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ হয়েছে- এমনটা বলা যাবে না। অতএব প্রয়োজন সংস্কৃতির আন্দোলন, যা জরুরি কাজ। স্বাধীনতার পর সকলেরই আশা ছিল বাংলাদেশ হবে আধুনিক, গণতান্ত্রিক। কিন্তু ১৯৭৫-এর পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ অনেকটাই 'পাকিস্তানি লিগেসির' কাছে ফিরে যায়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে সমাজ প্রগতি ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে হত্যা করা হয়। জাতির পিতা চেয়েছিলেন বাংলাদেশ হবে গণতান্ত্রিক, সমাজতন্ত্রী, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। সে স্বপ্টম্ন বাস্তবায়িত হয়নি। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতা কাটেনি। কোথায় যাবে আমাদের এই 'মাইনরিটি'? কেনই বা যাবে? বাংলাদেশের স্বাধীনতা, এ দেশের মানুষের ঐতিহ্য কি তাদের দেশান্তরী হওয়ার পথ রুদ্ধ করেনি? যে রাষ্ট্রের পত্তনে বাঙালি, অর্থাৎ মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান একযোগে রক্ত দিয়েছে, সে রাষ্ট্রে কেন আত্মত্যাগের মূল্য থাকবে না? আমার বিশ্বাস, এ সত্যটি যত দ্রুত প্রতিষ্ঠিত হয় যে, বাংলাদেশের হিন্দুরা ভারতের কেউ নন, তারা এ দেশের ভূমিপুত্র, তাতেই এ রাষ্ট্রের মঙ্গল।

স্বাধীনতার ৫০ বছর পর এবং মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক শক্তির টানা ১৩ বছর রাষ্ট্রশাসনের পরও সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়েছে বলা যাবে না। বাংলাদেশকে আজও ধর্মীয় মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়তে হচ্ছে। কারণ স্বাধীনতার প্রতিপক্ষ সম্মিলিত উদ্যোগে আগ্রাসন চালাচ্ছে। এ আগ্রাসন রুখতে সকল মানুষের সম্মিলিত প্রয়াস চাই; চাই সম্প্রীতির, মনুষ্যত্বের পুনরাভিযান। তাই প্রয়োজন মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানের অটুট সম্প্রীতি, আত্মিক বন্ধন। বাংলাদেশ এমন এক রাষ্ট্র হোক যেখানে বড়দের হাতে ছোটরা বিপন্ন হবে না; সব মানুষ, সব ধর্মবর্ণের মানুষ তাদের ন্যায্য অধিকার লাভ করবে। এই বাংলাদেশে আমরা সাতচল্লিশ, পঞ্চাশ বা একাত্তরের অমানবিক ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি চাই না। মনে রাখা উচিত, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মর্যাদা রক্ষণ সংখ্যাগুরুদের সম্মানীত করে, লাভবানও করে, মর্যাদাহীন করে না কখনোই।

অতএব মুক্তিযুদ্ধের প্রধান চেতনায় ফিরতে হবে, সাংবিধানিকভাবেই নয় কেবল, বাস্তবেও; এর কোনো বিকল্প নেই; অশুভ শক্তিকে প্রতিহত করা তাই মনুষত্বের ইমানি দায়িত্ব।

উগ্র সাম্প্রদায়িকতা শুভ প্রবণতা নয়, কখনোই। এতে সামাজিক সহনশীলতা বিনষ্ট হয়, একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সংখ্যাগুরুর ধর্মীয় পবিত্রতা। অতএব দুষ্ট প্রবণতা থেকে সমাজকে মুক্তি দিতে হবে। এই মুক্তি সরকার একা দিতে পারে না, দিতে হবে সকল সচেতন মানুষকে; দলমত, ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে। যে মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় অহংকার, সেই মুক্তিযুদ্ধের শক্তিকে সবল করতে হবে। এর ব্যত্যয় ঘটলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হবে; লুটেরা, লুম্পেন সত্য ও সুন্দরকে গ্রাস করবে, বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে। বাংলাদেশ এমন এক রাষ্ট্র যার ভিত্তি সব ধর্ম, সব বর্ণ, সব গোত্রের সম্প্রীতি। মনে রাখতে হবে, এই ভিত্তিকে যারা দুর্বল করতে চায় তারা কেবল এই রাষ্ট্রেরই প্রতিপক্ষ নয়, তারা সভ্যতা ও মনুষ্যত্বের প্রতিপক্ষ।

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম একবার সেদিনের হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্বে অস্থির হয়ে বলেছিলেন, "ভূতে পাওয়ার মতো ইহাদের মন্দিরে পাইয়াছে, ইহাদের মসজিদে পাইয়াছে। ইহাদের বহু দুঃখ ভোগ করিতে হইবে। যে দশ লক্ষ মানুষ প্রতি বৎসর মরিতেছে শুধু বাংলায়, তাহারা শুধু হিন্দু নয়, তাহারা শুধু মুসলমান নয়, তাহারা মানুষ- স্রষ্টার প্রিয় সৃষ্টি"।

অতএব কে মন্দিরে যায়; কে মসজিদে যায়, কে প্যাগোডা বা চার্চে যায়- তা না দেখে আমরা যেন মানুষ হই, আমরা যেন সভ্য হই, আমরা যেন বাঙালি হই। আমরা যেন সংকীর্ণ না হই, আমরা যেন উদার হই, সভ্য হই, আত্মঘাতী না হই। একজন খাঁটি মুসলমান এবং খাঁটি বাঙালি সর্বশ্রদ্ধেয় ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর একটি স্মরণীয় উক্তি দিয়ে লেখাটির শেষ করি- "আমরা হিন্দু ও মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি।"

মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও গবেষক
hh1971@gmail.com

মন্তব্য করুন