চলতি বছর শারদীয় দুর্গোৎসব চলাকালে বিভিন্ন স্থানে পূজামণ্ডপে হামলার মতো চরম বর্বর ও অমানবিক ঘটনার নিন্দা জানানোর কোনো ভাষা জানা নেই। এর আগে রামু-নাসিরনগরেও ধর্মীয় উগ্রবাদীরা অনুরূপ বর্বর অমানবিক হিংসাত্মক কাণ্ড ঘটিয়েছিল। কিন্তু ওইসব বর্বর কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত হিংস্র জানোয়ার বা তাদের মদদদাতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছিল কিনা, তা জানা নেই। অবশ্য, রামুর ঘটনায় ধ্বংসপ্রাপ্ত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বিখ্যাত মন্দিরটি পরে সরকারি খরচে অধিকতর জাঁকজমকপূর্ণভাবে তৈরি করে দেওয়া হলেও বংশানুক্রমিকভাবে ওখানে বসবাস করে আসা সাধারণ বৌদ্ধদের হৃদয়ে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছিল, তা দূরীভূত হয়েছে- একথা বলা যাবে না।

এবারকার সহিংসতায় জড়িতরা বা তাদের মদদদাতারাও শেষ পর্যন্ত অতীতের মতোই পার পেয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা যায়। এর কারণ, বাংলাদেশের সুবিধাবাদী অপরাজনীতি। এদেশে রাজনীতি চলে রাষ্ট্রক্ষমতায় টিকে থাকা বা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য, সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য বা একটি প্রকৃত মানবতাবাদী গণতান্ত্রিক বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের জন্য নয়। এই অনৈতিক রাজনীতির স্বার্থে বর্তমান সরকারও তার পূর্বসূরিদের মতোই ধর্মীয় উগ্র মৌলবাদীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে চলেছে। এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ হলো, বর্তমান সরকার ১৯৭১-এ যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে হাতেগোনা কয়েকজন শীর্ষ জামায়াত নেতাকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলালেও জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি এ দেশে নিষিদ্ধ করেনি। অথচ মুক্তিযুদ্ধের ঠিক পর পর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার রচিত ১৯৭২ সালের সংবিধানে বাংলাদেশে 'ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ' করা হয়েছিল।

প্রায়ই আমাদের শোনানো হয় যে, এ সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের সরকার। তাই যদি হবে, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা- গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ গেল কোথায়? বাস্তবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাগুলোর অন্যতম ছিল ১৯৫২-এর ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন থেকে চলে আসা বাঙালি জাতীয়তাবাদ। আজকাল ক'জন লোক স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে নিজেদের বাঙালি বলে দাবি করে? আমার তো মনে হয়, বর্তমানে এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যে নিজেদের পরিচয় খোঁজে। এ ছাড়া, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে বাংলা, ইংরেজি, আরবি ইত্যাদি হরেক রকম মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোন প্রয়োজনে? অন্যদিকে, বিরোধী বিএনপি, জাতীয় পার্টি তাদের জন্মলগ্ন থেকেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী জামায়াত-শিবিরসহ অন্যান্য ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীকে নিয়ে একসঙ্গে রাজনীতি করছে।

যাই হোক, এটা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরও প্রকৃতপক্ষেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী লোকদের একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশে আজও গড়ে ওঠেনি। এটি এখন সময়ের দাবি যে, এ দেশে একটি প্রকৃত মানবতাবাদী গণতান্ত্রিক বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের জন্য মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আসলেই বিশ্বাসী ব্যক্তি-গোষ্ঠীর সমন্বয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করা হোক। শুধু বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী যাতে আগামীতে তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি নির্বিঘ্নে-নির্ভয়ে সম্পাদন করতে পারে সেজন্যই নয়। বাংলাদেশের সর্বস্তরে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, সমাজে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, নারী বা শিশু ধর্ষণ প্রতিরোধ, ব্যাপক লুটপাট ও বিদেশে টাকা পাচার বন্ধ করা এবং আদিবাসীসহ সকল সম্প্রদায়ের মানুষের গণতান্ত্রিক-মানবাধিকার নিশ্চিত করার জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান অত্যাবশ্যক।

সম্ভাব্য নতুন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান অবশ্যই ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধবিরোধী জামায়াত-শিবির বা অন্য কোনো ধর্মীয় উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে কোনো অবস্থায়ই আপস করবে না বা অনুরূপ দেশবিরোধী শক্তিকে প্রশ্রয় দেবে না এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত চার জাতীয় মূলনীতি বাস্তবায়নে আন্তরিক হবে।

অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন