বিজ্ঞান বড় সত্য কথা বলে। সত্যে যাদের অনাগ্রহ বিজ্ঞানে তাদের মন থাকার কথা নয়। এর অর্থ এই নয় যে, বিজ্ঞানে যাদের আগ্রহ নেই, সত্যকে আঁকড়ে থাকার তাদের উপায় নেই। 'সত্যের মতো বদমাশ'কে নিয়েও যে কথা হয়, হতে পারে সাহিত্যিকদের সে রকম রচনাও কিন্তু বিরল নয়। সাহিত্যের বড় বিষয় কিন্তু ভাবজগতের বিষয়কে অবলম্বন করেই। তাদের মতে, 'বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ'। ভাববাদী মানুষের কাছ থেকেই বিজ্ঞানের এ রকম নিরেট ও নিরাসক্ত সংজ্ঞার উৎপত্তি বোঝা যায়। এ যেন অনেকটা বিজ্ঞানের মধ্য থেকেই বিজ্ঞানকে অস্বীকার করার মতো অবস্থা। ভাব ও ভাবনাকে ফুটিয়ে তোলার জন্য কতভাবেই না বিজ্ঞানেরই দ্বারস্থ হতে হচ্ছে আমাদের। শিল্প, সাহিত্য আর সংস্কৃতি- সর্বত্রই বিজ্ঞান তার হাত প্রসারিত করে দিয়েছে উদারভাবে।

বিজ্ঞান আবেগকে কেড়ে নেয় এটি কোনো কোনো ক্ষেত্রে যে অতিসত্য, তা বলাই বাহুল্য। কোনো বস্তুর ভেতরকার সত্যকে জানতে হলে আবেগের আশ্রয় না নেওয়াই উত্তম। এর অন্তর্নিহিত সত্যকে উদ্ঘাটনই সেখানে জরুরি। তবে বিজ্ঞান মানুষের আবেগকে একদিকে যেমন সম্প্রসারিত করতে পারে, তেমনি তা একজন থেকে শত সহস্রজনের মধ্যে ছড়িয়েও দিয়েছে। কবি ও লেখকদের জন্য বিজ্ঞান কতটা উদার তার প্রমাণ তাদের ভাবনার কথা শত সহস্র কপি গ্রন্থবদ্ধ হয়ে সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার আধুনিক কৌশলের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে। আধুনিক প্রিন্টিং প্রেস রঙে-রূপে কত সুদৃশ্যভাবেই না পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে কবি-সাহিত্যিকের ভাবনাকে। বিজ্ঞান নিয়ে এরকম কত যে উদাহরণ দেখা যাবে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। বিজ্ঞানের মধ্যেই আমরা বেঁচে আছি, এর কল্যাণেই জীবন এত সহজ ও সুন্দর হয়ে উঠেছে।

বিজ্ঞান যে বেগ দেয় তা আনন্দের সঙ্গেই আমরা উপভোগ করি। দৈহিক শক্তিচালিত যানের চেয়ে যন্ত্রচালিত যান মানুষের পরম আকাঙ্ক্ষার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে কবেই। নতুন মডেলের সব গাড়ি, দ্রুতগামী ট্রেন, আধুনিক লিফট কিংবা বিমান তো গতিরই প্রতীক। বিমানের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। আমাদের 'গ্লোবাল ভিলেজ' ধারণা তো এটাকে অবলম্বন করেই গড়ে উঠেছে। কোনো কিছু আর আজ দূরে নয়। পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই পৌঁছে যাওয়া যাচ্ছে অনায়াসেই। বিজ্ঞানের ব্যবহারিক কল্যাণে এসব সম্ভব হয়েছে। বিজ্ঞানের এসব আসলে ব্যবহারিক রূপ। বিজ্ঞানের সত্যকে জেনে তবেই গড়ে উঠেছে এসব ব্যবহারিক নানা বিষয়। কেবল গতি নয়, শ্রুতির কথাটাও ভেবে দেখুন। কোনো কথাই আর হারিয়ে যেতে না দেওয়ার বিজ্ঞানও আমাদের রয়েছে। বিজ্ঞান আমাদের স্বাচ্ছন্দ্য, আনন্দ আর সুখের জন্য কত রকম পসরা নিয়ে হাজির হয়েছে। জীবনের এমন কোনো দিক নেই, যেখানে বিজ্ঞানের হাত পড়েনি। এমনকি অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, বিজ্ঞানের সার্থক প্রয়োগের ফলে মানুষের কাজ করে দিচ্ছে যন্ত্র সুনিপুণভাবে।

জীবন সহজ ও সুন্দর করতে কতভাবেই না বিজ্ঞানের দ্বারস্থ হচ্ছি আমরা। অথচ সে বিজ্ঞানের নিয়মিত চর্চা করা এবং অনুপুঙ্খ বিজ্ঞানের সৌর্ন্দযকে স্পর্শ করা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছি। একদিকে বিজ্ঞানের ব্যবহার উপযোগী পণ্য দিয়ে জীবনে গতি আনার জন্যই একে ব্যবহার করছি, অন্যদিকে আবেগহীনতার তকমা দিয়ে বিজ্ঞানকে অবজ্ঞা দেখানোর কাজটিও করে চলেছি। বিজ্ঞান সে কারণে আমাদের কাছে অনেকটা অধরাই থেকে যাচ্ছে। আমরা এর বাইরের কঠিন আবরণটি কেবল দেখছি। ব্যবচ্ছেদ করার জ্ঞান না থাকায় এর ভেতরে যে বিস্ময়ের ও আনন্দের ফল্কগ্দুধারা বহমান, তা প্রায়ই আমাদের উপলব্ধির বাইরে থেকে যাচ্ছে।

বিজ্ঞানের এক আশ্চর্যময় নান্দনিক রূপ রয়েছে। সেটি বিজ্ঞানের নিগূঢ় সত্যানুসন্ধানের সঙ্গে সম্পর্কিত। সে সত্য আপনা থেকেই ধরা দেয় না। এর জন্য প্রয়োজন হয় গভীর অভিনিবেশ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার ধৈর্য। প্রয়োজন হয় অনুসন্ধিৎসু মনের। নিরন্তর জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজতে খুঁজতে তবে সে আলোর সন্ধান মেলে। এভাবেই বিজ্ঞাননিষ্ঠ মানুষ বিজ্ঞানের অনিন্দ্য সৌন্দর্যের সন্ধান লাভ করে এবং আনন্দের সঙ্গে বিজ্ঞানচর্চা ও গবেষণায় অন্বিষ্ট হয়। সবারই অমরত্ব লাভের সুযোগ নেই বটে, তবে সৌন্দর্য অবলোকনের পথে যাত্রা করতে হলে অমরত্ব লাভই একমাত্র লক্ষ্য- তাও কিন্তু নয়। বিজ্ঞান যাচাই করে নেওয়ার বিষয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে সে যাচাই কর্ম সম্পাদন করতে হয়। সে কারণে মনকে প্রস্তুত করা জরুরি। আর সে মন ও মনন গড়ে ওঠার প্রাথমিক অনুষঙ্গ হলো উপযুক্ত শিক্ষক। বিজ্ঞানের প্রতি শিক্ষার্থীদের এবং গবেষকদের মধ্যে প্রবল আগ্রহ সৃষ্টির কাজটি শিক্ষককেই করতে হয়। শিক্ষক যে সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন তা নয়, তবে তিনি সেসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পথ বাতলে দিতে পারেন। পথ যে খুবই সরল তাও কিন্তু নয়। চলতে চলতে পথ সৃষ্টি হয়। খুঁজতে খুঁজতে বিজ্ঞানের রহস্যের জাল খুলে যায়। বিজ্ঞানের রহস্যের মধ্যেই যত আনন্দের উৎস। সে উৎসের সন্ধান পেতে

চালাতে হয় অবিরত অনুসন্ধান আর অধ্যবসায়। একেকটা শিল্প বিপ্লব বিজ্ঞানকে আরও মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে নিয়ে যাচ্ছে। আনন্দের যোগ না ঘটলে এত বড় সব বিপ্লব কী করে সফল করে মানুষ?

কোনো শিল্প বিপ্লবের সঙ্গেই থাকার সুযোগ আমাদের আগে ঘটেনি। কারণ আমরা তখন পরাধীন জাতি হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে লিপ্ত ছিলাম। জ্ঞান-বিজ্ঞানের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধার কোনো সুযোগই আমাদের ছিল না। সাধারণভাবে শিক্ষার সুযোগবঞ্চিত মানুষ বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ লাভ করতে পারবে, তা কল্পনারও অধিক ছিল। ফলে বিজ্ঞান শিক্ষা, বিজ্ঞানচর্চা এবং প্রযুক্তি উদ্ভাবনবিষয়ক গবেষণা পরিচালনা এসব আমাদের সিংহভাগ মানুষের চিন্তার মধ্যেই ছিল না; যা চিন্তার মধ্যে নেই তার নান্দনিক রূপের সন্ধান লাভ অলৌকিক কল্পনা কেবল। বিজ্ঞান বাস্তবে তাই আমাদের নাগালের বাইরেই থেকেছে। দেশ এখন স্বাধীন। শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টিতে এখনও আমরা পিছিয়ে রয়েছি। আশার কথা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অতিসম্প্রতি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। এটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সরকারের বাড়তি মনোযোগ দেওয়ারই ইঙ্গিত দেয়। ফলে আমরা বিজ্ঞানচর্চা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও প্রসারের জন্য আরও বেশি পৃষ্ঠপোষকতা পাব এমনটি আশা করি। ধারাবাহিক ও নিরন্তর বিজ্ঞানচর্চা আমাদের বিজ্ঞানের গভীরতর এবং অনিন্দ্য রূপের সন্ধানে ব্রতী করে তুলবে- সেটাই প্রত্যাশা।

উপাচার্য, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন