বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস

জীবন, জীবিকা ও তরুণ জনগোষ্ঠী

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২০     আপডেট: ১১ জুলাই ২০২০

ড. এ কে এম নুর-উন নবী

পৃথিবীতে এখন প্রায় সাড়ে সাতশ' কোটি মানুষের বসবাস। ক্রমেই এই সংখ্যা বাড়ছে। বিশ্বের কিছু দেশ ইতোমধ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে, কিছু দেশ মাঝপথে রয়েছে আর কিছু দেশ এখনও জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। স্বল্পোন্নত ও অনুন্নত দেশগুলোর অধিক জন্মহারই মূল জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য দায়ী। ওই দেশগুলোর অধিক জন্মহারের প্রভাব পড়ছে বিশ্বব্যাপী। শিল্পোন্নত দেশগুলোতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার মোট বৃদ্ধির ১ শতাংশ মাত্র। বাকি ৯৯ শতাংশই বৃদ্ধি হচ্ছে অনুন্নত ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে। এর মধ্যে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অনেক বেশি। মাঝারি ধরনের বৃদ্ধির দেশগুলোর মধ্যে ভারত-বাংলাদেশ অন্যতম। জনসংখ্যায় চীন বিশ্বে বৃহত্তম দেশ হলেও সেখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অনেক কমে গেছে। ভারতে যেভাবে জনসংখ্যা বাড়ছে তাতে অল্প কয়েক বছরের মধ্যে দেশটির জনসংখ্যা চীনের চেয়ে বেশি হতে পারে। আগে বলা হতো পৃথিবীর প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন চায়নিজ। সে সংখ্যাটি অতিক্রম করবে ভারত। এক্ষেত্রে অনেকাংশেই সফল বাংলাদেশ। বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৩৭ শতাংশ। বাংলাদেশে একদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমেছে, অন্যদিকে গড় আয়ু বেড়েছে। অনুন্নত দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের গড় আয়ু অনেক বেড়েছে। এর মধ্যে নারীদের গড় আয়ু আরও বেশি বেড়েছে। এই ফলাফল এসেছে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, চিন্তা-চেতনা ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের কারণে।

এ বছর মহামারি করোনার মধ্যে পালিত হচ্ছে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য 'মহামারি কভিড-১৯ প্রতিরোধ করি, নারী ও কিশোরীর সুস্বাস্থ্যের অধিকার নিশ্চিত করি'। আমরা জানি কভিড-১৯ এর সঙ্গে লড়ছে গোটা বিশ্ব। এই পরিস্থিতি নারীদের জন্য অধিক ঝুঁকি তৈরি করেছে। আমাদের দেশে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। এর মধ্য দিয়েও আগে যত সহজে নারীরা স্বাস্থ্যসেবা পেয়েছিলেন, বর্তমানে সেভাবে পাচ্ছেন না। কারণ স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রগুলো অনেক বেশি ব্যস্ত কভিড-১৯ নিয়ে। ফলে সাধারণ চিকিৎসা বা নারীদের চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে। কিছুদিন আগেও আমরা সংবাদমাধ্যমে দেখেছি গাইনি ওয়ার্ডগুলোতে চিকিৎসক বসছেন না। ফলে প্রসূতি নারীরা সমস্যায় পড়েছেন। অনেকেই পরিবার পরিকল্পনা বা জন্মনিয়ন্ত্রণের মতো নিয়মিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা অধিক জন্মহারের কারণ হতে পারে। ভারত-বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি বিশ্নেষণ করে দেখা যায় ভারতে করোনায় নারীদের মৃত্যুহার বেশি আর বাংলাদেশে পুরুষের মৃত্যুহার বেশি। এর কারণ ভারতের নারীরা বাংলাদেশের নারীদের মতো সুযোগ-সুবিধা পান না। করোনা পরিস্থিতি বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী নারী ও শিশুস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। কভিড-১৯ কতকাল স্থায়ী হবে তা অজানা। তবে পরিস্থিতি যাই হোক নারী ও শিশু স্বাস্থ্যের যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে তা মোকাবিলা করতে হবে।

জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে পরিণত করার বড় মাধ্যম হলো শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। করোনা পরিস্থিতির কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তরুণদের পড়ালেখা ব্যাহত হচ্ছে। ফলে মানবসম্পদ তৈরির প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এখন তরুণদের কোনো পড়াশোনা বা কাজ নেই, এতে তাদের মধ্যে বিভিন্ন দুশ্চিন্তা কাজ করতে পারে। এর ফলে বাড়তে পারে অপরাধপ্রবণতা। মাদক ও অন্যান্য সামাজিক অপরাধে জড়িত হতে পারে তারা। একশ্রেণির অসাধু মানুষ তরুণদের এই সময়টাকে সুযোগ হিসেবে নিতে চাইবে। তারা যুবসমাজকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখাবে তাদের সহযোগী হতে। আমাদের এসব বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। আমরা যদি তরুণদের সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হই, তাহলে তা জাতীয় জনসম্পদ বিনির্মাণের ক্ষেত্রে হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু করোনার কারণে খাদ্য নিরাপত্তায় ব্যাঘাত ঘটছে। আসন্ন কোরবানিকে সামনে রেখে অনেকেই পশু পালন করেছিলেন। এ বছর হয়তো তাদের লোকসানই হবে। কারণ করোনার কারণে ক্রেতা কমে গেছে বহুগুণ। এর ফলে দারিদ্র্য বাড়তে পারে। আমাদের দেশে দারিদ্রের হার কমেছিল, তবে সেটি আবার বাড়ছে। আমরা রপ্তানি খাতে নেতিবাচক প্রভাব দেখছি। একদিকে বৈদেশিক মুদ্রা আসছে না, অন্যদিকে দেশীয় উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। সম্প্রতি ইতালি থেকে কিছু মানুষকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। করোনার প্রথম দিকে তারা দেশে এসেছিলেন। জমানো টাকায় দীর্ঘদিন চলে আবার তারা ইতালি যান এবং অবস্থানের সুযোগ না পেয়েই ফিরে আসেন। এটা তাদের জন্য হতাশাজনক। এসব বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি ও দেশীয় উৎপাদন সচল রাখার দিকে বেশি মনোযোগী হওয়া দরকার।

দীর্ঘদিন ধরে করোনার ভ্যাকসিন আবিস্কারের চেষ্টা চললেও এখন পর্যন্ত আমরা কোনো সুখবর পাইনি। ভ্যাকসিন আবিস্কার হলেও তা কতদিনে সাধারণ মানুষের পর্যায়ে আসবে সেটি বলা কঠিন। ফলে নতুন এই বাস্তবতার মধ্যে আমাদের বাঁচতে শিখতে হবে। এ জন্য অনেক অভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে। নতুন অভ্যাস গড়ার মাধ্যমে এই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। করোনার বহুমাত্রিক প্রভাব পড়েছে জনসংখ্যার ওপর। আমরা যে গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম, তা থমকে গেছে। আমাদের পরিকল্পনা ছিল কিন্তু পরিবেশ ছিল না। প্রধানমন্ত্রীও সংসদে বলেছেন, কভিড পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বাজেট বাস্তবায়ন কষ্টকর হবে। আমরা যেহেতু চাইলেই কভিড থেকে বেরিয়ে আসতে পারব না, সে জন্য বাস্তবতাকে মেনেই যুদ্ধ করতে হবে। গত কয়েক দিনে করোনা সংক্রমণের রেশিও বিশ্নেষণ করলে দেখা যায়- ঢাকার বাইরে অন্য শহরগুলোতে এমনকি জেলা শহরগুলোতেও ক্রমেই আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। আমাদের গ্রামাঞ্চলে করোনা সংক্রমণ খুব বেশি হয়নি। তবে সতর্কতা না থাকলে যে কোনো সময় সংক্রমণের হার বাড়তে পারে।

করোনায় সতর্কতার কারণে আমরা মানুষকে ঘরে থাকতে উৎসাহিত করছি। কিন্তু যদি মানুষ বাইরে না যায়, তাহলে জীবিকার ওপরে প্রভাব পড়বে এবং অল্প সময়ের জন্য হলেও জীবনমানের অবনতি ঘটবে। আমরা দেখেছি ইতোমধ্যে অসংখ্য মানুষ কর্ম হারিয়ে ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে গেছেন। মানুষের আয় কমার কারণে বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক ও সামজিক জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। যদিও এই সমস্যাগুলো স্থায়ী নয়; কিন্তু বর্তমানে বড় ধরনের সংকট তৈরি করছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন করে কর্মসংস্থান হচ্ছে না, উপরন্তু অনেকেই চাকরি হারাচ্ছেন। প্রবাসীদের মধ্যে যারা ফিরে এসেছিলেন, তারাও যেতে পারছেন না। আয় কমে যাওয়ায় অনেক অফিসে কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে। ফলে সামাজিক-অর্থনৈতিক সংঘাত বাড়ছে। এই সংঘাতগুলো খুব সতর্কতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে এবং এদিকে প্রখর দৃষ্টি রাখতে হবে। শুধু জীবনের কথা ভাবলেই হবে না, জীবনের পাশাপাশি জীবিকা ও গতিশীলতাকেও যত্নের সঙ্গে লালন করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

সাবেক চেয়ারম্যান, পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়