শ্রদ্ধাঞ্জলি

আপাদমস্তক একজন সাংবাদিক

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২০     আপডেট: ১১ জুলাই ২০২০

এস আই শরীফ

আপাদমস্তক একজন সাংবাদিক

এ কে এম রাশীদ উন নবী বাবু (১৯৫৬-২০২০)

আপাদমস্তক সাংবাদিক এ কে এম রাশীদ উন নবী বাবু চলে গেলেন। খবরটি শোনার জন্য মন প্রস্তুতই ছিল। বেশ কিছুদিন ধরেই তিনি ক্যান্সারের সঙ্গে লড়ছিলেন। তার সঙ্গে টুকরো টুকরো কত স্মৃতি! দিনের পর দিন কাজ করেছি। লেট নাইট করে একই গাড়িতে বাসায় ফিরেছি। সেই আমার দেশ থেকে শুরু। এরপর ইত্তেফাক আর সকালের খবর। নিউজ টেবিলে অদম্য বাবু ভাই স্বপ্ন দেখতেন একটি আধুনিক মানের দৈনিক পত্রিকারও। এ জন্য 'দৈনিক স্বাধীনতা' নামে একটি কাগজের ডিক্লারেশনও নিয়ে রেখেছিলেন। তার সেই স্বপ্ন পূরণ হলো না! ডান-বাম, সরকারি-বেসরকারি সব ধারার কাগজেই কাজ করেছেন তিনি পেশাদারিত্বের সঙ্গে। তিনি কাজ করেছেন ইনকিলাবে, আমার দেশে। আবার কাজ করেছেন বাংলার বাণী, দৈনিক বাংলা, ইত্তেফাক, সমকালেও। সর্বশেষ যখন সমকালের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন, তখন কাছে থেকেই দেখেছি তৎকালীন সম্পাদক গোলাম সারওয়ারের কত আস্থাভাজন ছিলেন।

আজ থেকে ১৪ বছর আগেও বাবু ভাই ছিলেন প্রযুক্তি সচেতন। ওই সময়ের সবচেয়ে আধুনিক মোবাইল ফোনটি থাকত তার হাতে। ফোনের সূত্র ধরেই সবচেয়ে কনিষ্ঠ কর্মী হয়েও তার কাছাকাছি আসা। ফোনের যে কোনো সমস্যা সমাধানে তিনি প্রথমেই ডেকে পাঠাতেন আমাকে। দিন দিন সেই সম্পর্ক আরও গভীর হয়। হয়ে ওঠেন প্রিয় শিক্ষক-অভিভাবক। সাংবাদিকতা শুরুর দিনগুলোয় যা কিছু শেখা তার কাছ থেকেই। সৎ থেকেও কীভাবে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা করা যায়- তিনি ছিলেন তার উজ্জ্বল উদাহরণ। দৈনিক আমার দেশের নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন তিনি। পত্রিকাটি একটি দলের পরিচয় বহন করলেও নিউজ রুমে কখনও বাবু ভাইকে সেই দলটির বিষয়ে উদার হতে দেখিনি। ক্ষমতার খুব কাছে থেকেও তার নূ্যনতম অপব্যবহার করেননি। মনে পড়ে ফরিদপুরের একটি হামলার ঘটনার কথা। ওই সময় বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায়। হামলায় জড়িত ছিলেন স্থানীয় বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা। প্রতিনিধি ওই নেতার নাম উল্লেখসহ ঘটনার বর্ণনা দিয়ে নিউজ পাঠিয়েছেন। বাবু ভাইয়ের কাছে জানতে চাওয়া হলো- নিউজটি কীভাবে করতে হবে। তিনি এক কথায় জানিয়ে দিলেন, 'ঘটনা সত্য হলে নিউজ যাবে। নেতার নাম বাদ দিলে তো আর নিউজ থাকে না! তবে অভিযুক্তের বক্তব্য থাকা বাধ্যতামূলক।' আমার দেশের প্রকাশক বিএনপির তৎকালীন সংসদ সদস্য মোসাদ্দেক আলী ফালু হওয়ায় দলটির অনেক নেতাকর্মীই পত্রিকাটিকে নিজেদের বলেই মনে করতেন। কিন্তু বাবু ভাইয়ের নিরপেক্ষ অবস্থানের কারণে নিউজ রুমে বসে আমাদের প্রায়ই বিএনপি নেতাদের কটুকথা শুনতে হতো। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে তারা ফোনে বলতেন- 'আমাদের পত্রিকায় আমাদের নিয়েই উল্টাপাল্টা লেখেন! দাঁড়ান, আপনাদের মালিককে বলছি।'

খবরের সঙ্গে থাকতেই বাবু ভাই বেশি পছন্দ করতেন। কথায় কথায় একদিন জানিয়েছিলেন চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে তার শখের কথাও। এ জন্য বিস্তর পড়াশোনাও করেছিলেন। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। একদিন প্রশ্ন করেছিলাম- 'আপনি সারাদিন নিউজের সঙ্গে থাকেন, নিউজ নিয়ে ভাবেন, দিন শেষে পত্রিকার মেকআপ করেন। শেষ রাতে ছাপা কাগজ হাতে নিয়ে ঘরে ফেরেন। প্রতিদিন একই রুটিন। বিরক্ত লাগে না!' গুরুগম্ভীর ভঙ্গিতে বলেছিলেন, 'জীবনে আর কিছুই তো ভালোমতো শিখিনি। তাই এই কাজটিই ভালোমতো করার চেষ্টা করে যাচ্ছি।' এ প্রসঙ্গে উদাহরণ টেনে আরও বললেন, 'একজন মা তার সন্তান প্রসবের জন্য পুরো নয় মাস সময় পায়। আমার কাছে প্রতিদিনের পত্রিকাও সন্তানতুল্য। কিন্তু সেই পত্রিকা বাজারে আনতে আমরা সময় পাই মাত্র কয়েক ঘণ্টা! তাই তো এই কাজটি নিখুঁতভাবে করা চাই।'

ভারতের টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সময়েও বাবু ভাইয়ের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে কথা বলেছি। সে সময়ও তিনি বারবার একই কথা বলেছেন- 'প্রতিদিন মুম্বাইয়ের পত্রিকাগুলো দেখছি। আর ভিন্ন আঙ্গিকে পত্রিকার মেকআপের চিন্তা করছি।'

সংবাদকর্মীদের বিষয়ে বাবু ভাই বরাবরই ছিলেন উদার। কখন কখনও আবার গম্ভীর রসিকতাও করতেন। মনে পড়ে- আমার দেশের কম্পিউটার বিভাগের এক কর্মী কাউকে না বলে একদিন অফিসে আসেননি। পরের দিন অফিসে আসার পরই বাবু ভাই তাকে ডেকে পাঠালেন। না আসার কারণ জানতে চাইলে ওই কর্মী জানান, জ্বর ছিল তাই আসেননি। বাবু ভাই পাল্টা প্রশ্ন করলেন, জ্বর এক দিনেই ভালো হয়ে গেল! ওষুধ খাওয়ার কারণে জ্বর ভালো হয়েছে বলে জানালেন সেই কর্মী। বাবু ভাই আর কিছু না বলে তার দিকে সাদা কাগজ এগিয়ে দিয়ে বললেন- 'বাবা, তোমার ওষুধটা একটু লিখে দিবা। আমারও মাঝে মাঝে জ্বর হয়। দেখি, তোমার ওষুধটা খেয়ে আমার ত্বরিত কাজ হয় কিনা!' এমন রসিকতায় ওই সহকর্মীর জান যায় যায় অবস্থা।

বাবু ভাইয়ের সম্পাদনায় সকালের খবর বাজারে আসার আগে থেকেই সেখানে পুরোনো অনেক কর্মী চাকরি করছিলেন। বাবু ভাই সম্পাদক হওয়ার পরই নতুন কর্মী নিয়োগ শুরু করেন। পুরোনোদের চাকরি থেকে ছাঁটাই করার জন্য তাকে একাধিকবার বলা হয়েছিল। তবে তিনি ছিলেন এককথায় অনড়। বারবার বলে আসছিলেন- 'আমি থাকতে কারও চাকরি যাবে না।' তার দৃঢ় অবস্থানের কারণে পুরোনো ও নতুন কর্মীরা মিলেই সকালের খবর বের হয়।

মুম্বাইয়ের টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালে কেমো নেওয়ার একপর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। টানা ২৭ দিন লাইফ সাপোর্টেও ছিলেন। জীবনীশক্তির জোরে তিনি ফিরে আসেন। এরপর ফেব্রুয়ারির শুরুতে ঢাকায় ফেরেন। বাসায় গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করি। সেটিই ছিল শেষ দেখা। করোনার কারণে আর যাওয়ার সুযোগ মেলেনি। ২৪ জুন রাত সাড়ে ৩টার দিকে হঠাৎ বাবু ভাইয়ের মেয়ে ফারাহ আনিকা অনন্যার ফোন থেকে ভিডিও কল পেয়েছিলাম। ফোন ধরতেই স্ট্ক্রিনে ভেসে উঠেছিল বাবু ভাইয়ের মুখ। সেই মুখ ছিল অনেক অচেনা! মুখে অক্সিজেন মাস্ক, নাকে নল। খুব কষ্ট করে অস্পষ্ট গলায় বললেন- 'শরীফ, তুমি আসবা না।' এমন কথা শুনে মনটা মুহূর্তেই ভেঙে গেল। কোনো রকমে বললাম, ভাই করোনার কারণে আমি অফিসে 'বন্দি'। বের হওয়ার সুযোগ নেই। অফিস থেকে বের হলেই আসব। আর যাওয়া হয়নি, কথাও হয়নি। কারণ শেষ ক'দিন তিনি ছিলেন অচেতন। মনে পড়ছে ফেব্রুয়ারিতে শেষ দেখা হওয়ার পর বিদায়ের সময় সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি ভাইয়ের হাত ধরে বাবু ভাই বলেছিলেন- 'চলেই গিয়েছিলাম। কোনো রকমে ফিরে এসেছি। আবার হয়তো চলে যাব। আপনারা ভালো থাকেন।'

বাবু ভাই আপনিও ভালো থাকবেন। আপাদমস্তক সাংবাদিক হিসেবেই দেশের আধুনিক সংবাদপত্রের পাতায় লেখা থাকবে আপনার নাম। সংবাদকর্মীদের হৃদয়ে আপনার অবস্থান কখনও মুছবে না। এ পেশায় থাকা আপনার হাজারো ছাত্রছাত্রীর মাঝেই আপনি বেঁচে থাকবেন- প্রিয় বাবু ভাই।

সাংবাদিক
sisharifkk@gmail.com