অন্যদৃষ্টি

করোনা ও ধান-চালের মূল্য

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২০     আপডেট: ১১ জুলাই ২০২০

আব্দুল হাই রঞ্জু

কৃষকের নিরন্তর প্রচেষ্টা এবং সরকারের খাদ্য উৎপাদনে নানামুখী সহায়ক পদক্ষেপের কারণে দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তাবলয় অনেকাংশেই নিশ্চিত সম্ভব করা হলেও সাম্প্রতিক সময়ের বৈশ্বিক মহামারি করোনার ছোবলে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টিতে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। সরকার জনস্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে প্রতিবছরই আমন ও বোরো মৌসুমে ধান ও চাল অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহ করে থাকে। সরকারের খাদ্য বিভাগ গত বোরো ও আমন মৌসুমে চাহিদার পুরো ধান ও চাল অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহ করতে শতভাগ সফল হয়েছিল। তবে এ বছর বোরো মৌসুমের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। চলতি মৌসুমে সরকার কৃষকদের কাছ থেকে এক হাজার ৪০ টাকা মণ দরে ১০ লাখ টন ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে ধান সংগ্রহ অব্যাহত রেখেছে। পাশাপাশি সরকার চালকল মালিকদের কাছ থেকে ৩৬ টাকা কেজি দরে সিদ্ধ চাল ও ৩৫ টাকা কেজি দরে আতপ চাল কেনারও বরাদ্দ প্রদান করে। যথারীতি চালকল মালিকরাও খাদ্য মন্ত্রণালয় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিয়ম অনুযায়ী চুক্তিবদ্ধ হন। এরই মধ্যে ধানের বাজারদর বেড়ে যাওয়ায় লোকসানের কারণে চালকল মালিকরা সরকারি খাদ্য গুদামে আশানুরূপ চাল জমা করতে পারছেন না।

যদিও করোনাকালীন এই মহাদুর্যোগে বাংলাদেশ ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা দুই কোটি চার লাখ ৩৬ হাজার টন নির্ধারণ করে। এ বছর বোরোতে লক্ষ্যমাত্রার পুরো ধানের উৎপাদন হয়েছে। অর্থনীতিতে কোনো পণ্যের সরবরাহ কমলে দাম বাড়বে আর দাম বাড়লে সরবরাহ কমবে, এটাই স্বাভাবিক। যেহেতু ধান কাটার শুরু থেকে এ বছর কাঁচা ধানের বাড়তি বাজার ছিল এবং এখনও বিদ্যমান রয়েছে, সেহেতু কৃষকদের আশা এ বছর ধানের দাম আরও বাড়বে। ফলে বিশেষ জরুরি ছাড়া এখন কৃষক ধান বিক্রি করা বন্ধই রেখেছেন। সঙ্গত কারণে বাজারে এখন ধানের সরবরাহ অনেক কমে গেছে। ফলে খাদ্য বিভাগের সঙ্গে চুক্তি করলেও চালকল মালিকরা সরকারকে চাল সরবরাহ করতে পারছেন না।

অন্যদিকে সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয় ঘোষিত ধান ও চালের দরে যথেষ্ট ফারাক রয়েছে। বিষয়টি একটু পরিস্কার করে বলা দরকার- খাদ্য বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী এক মণ ধান থেকে চাল পাওয়া যায় ২৬ কেজি। সরকার নির্ধারিত এক মণ ধানের মূল্য এক হাজার ৪০ টাকা হলে এক কেজি চালের মূল্য দাঁড়ায় ৪০ টাকা। আর ভাপা, সিদ্ধ, শুকানো, ছাঁটাই ও খাদ্য গুদাম পর্যন্ত পরিবহন বিল যোগ করলে এক কেজি চালের প্রকৃত মূল্য দাঁড়ায় ৪২ টাকা। সেখানে সরকার এক কেজি চালের দর নির্ধারণ করেছে ৩৬ টাকা। এই হিসাবে প্রতি কেজি চাল সরকার ছয় টাকা কম মূল্যে সংগ্রহ করছে। করোনার কারণে ধানের বাজারদর এমনিতেই ঊর্ধ্বমুখী। ফলে চালকল মালিকরা সরকারকে চাল সরবরাহ করতে হিমশিম খাচ্ছেন।

সরকার ভোক্তা ও উৎপাদকের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে যে কোনো পণ্যে শুল্ক্ক আরোপ কিংবা বিনা শুল্ক্কে আমদানি রপ্তানির সুযোগ দিয়ে থাকে। উল্লেখ্য, সরকার ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কৃষকদের স্বার্থে চাল আমদানির ওপর শুল্ক্ক আরোপ করেছিল। যা এখনও বিদ্যমান রয়েছে। করোনার বৈশ্বিক মহামারির কারণে গোটা বিশ্বেই চালের বাজারদর ঊর্ধ্বমুখী। এমতাবস্থায় দেশের সাধারণ ভোক্তাদের স্বার্থে চাল আমদানির ওপর থেকে আরোপিত শুল্ক্ক পুরোপুরি তুলে নিয়ে সরকারি এবং বেসরকারিভাবে চাল আমদানির উদ্যোগ নিলে এ মুহূর্তে দেশের বাজারে চালের মূল্য বৃদ্ধির যে অস্থিরতা শুরু হয়েছে, তা কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। শুল্ক্ক আরোপ এবং প্রত্যাহার এটি কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নয়, যা জনস্বার্থে প্রয়োগ এবং প্রত্যাহার হতে পারে। বিষয়টি সাধারণ ভোক্তার স্বার্থ ও খাদ্য নিরাপত্তার বৃহত্তর স্বার্থে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

সাবেক ছাত্রনেতা