অন্যদৃষ্টি

এখনও 'সেরা' শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান!

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২০     আপডেট: ০৭ জুন ২০২০

মুজাহিদুল ইসলাম

কয়েক বছর আগেও আমরা দেখেছি, কোনো পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলে ফলের ভিত্তিতে সেরা ২০ বা সেরা ১০ প্রতিষ্ঠান শিক্ষা বোর্ডই নির্ধারণ করত। ফলে কিছু প্রতিষ্ঠান ছিল যারা টপ ২০ বা টপ ১০-এর তালিকায় থাকার জন্য অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করত। আরও কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতার পরে সরকার ২০১৬ সাল থেকে এই সেরার তকমা দেওয়া বন্ধ করে। কিন্তু কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনও সেসব কাগুজে তকমাকে নিজেদের বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে। আবার কিছু অভিভাবক না বুঝে তাদের সন্তানদের শিক্ষাকে চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছেন।

পরীক্ষা দিয়ে মূলত শিক্ষার লক্ষ্য কতটা অর্জিত হয়েছে তাই যাচাই করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু শিক্ষার লক্ষ্য অনেক ব্যাপক। তার লক্ষ্যের বিশাল অংশকেই গতানুগতিক পরীক্ষা দ্বারা যাচাই করা সম্ভব হয় না। যেমন ইতিহাসকে পাঠ্য করার কারণ ইতিহাস মুখস্থ করানো নয় বরং সুনাগরিক তৈরি। কিন্তু পরীক্ষা দ্বারা এই লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে কিনা তা পুরোপুরি যাচাই করা হয় না।

শিক্ষার লক্ষ্যকে সামনে রেখেই সাজানো হয় বিদ্যালয়ের পাঠ পরিকল্পনা। সেখানেই মূলত শিক্ষক ছাত্রদের মধ্যে সুনাগরিকতা বোধ জাগানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ছাত্রদের ফলের ভিত্তিতে যখন প্রতিষ্ঠানের র‌্যাংকিং করা শুরু হলো, তখন শিক্ষকরা সবাই নিজ প্রতিষ্ঠানকে সেরা বানানোর প্রতিযোগিতায় নেমে পড়লেন। তারা ছাত্রদের সুনাগরিক বানানোর পরিবর্তে শুধু ইতিহাস মুখস্থ করানোতেই সবটুকু সময় ব্যয় করা শুরু করলেন।

বিজ্ঞানে পরিবেশকে পাঠ করার উদ্দেশ্য পরিবেশ সুরক্ষায় দীপ্ত ছাত্র তৈরি। কিন্তু ফলাফলমুখী এ প্রতিযোগিতায় ছাত্রদের কাছে পরিবেশ দূষণের তিনটি কারণ পড়ার উদ্দেশ্য পরিবেশকে উন্নত করার পরিবর্তে হয়ে দাঁড়াল তিনটি নম্বর।

শিক্ষাক্রমে বলা আছে- বাংলা বিষয়টির উদ্দেশ্য হলো ভাষার অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য সম্পর্কে অবহিত হওয়া, কল্পনা শক্তির বিকাশ, পাঠাভ্যাসে আগ্রহী করা ইত্যাদি। এ লক্ষ্যগুলো অর্জনে শিক্ষকের উচিত ছিল শিক্ষার্থীদের বেশি বেশি বাইরের বই পড়তে উৎসাহিত করা। পাঠ্যপুস্তকে যে কয়টি গল্প দেওয়া থাকে তার উদ্দেশ্য হলো, এই গল্পের রস পেয়ে যেন আরও গল্প পড়তে উৎসাহিত হয়। কিন্তু নম্বরই যখন মূল লক্ষ্য, তখন অন্য গল্প বাদ দিয়ে শিক্ষক বইয়ের গল্পটিকেই ব্যবচ্ছেদ করে শিক্ষার্থীদের গেলাতে ব্যস্ত থাকেন। এমনকি যে সময়টি শিক্ষার্থীর অন্য বই পড়ার সময়, সেই বিকেলে শিক্ষার্থীদের আবার কোচিংয়ে এনে বন্দি করা হয়। সেরা ২০-এ স্থান পাওয়ার জন্য অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই দুপুরে ছুটি হয়ে যাওয়ার পর আবার বিকেলে কোচিংয়ের ব্যবস্থা করেছিল। বিকেলে আবার পাঠ্যপুস্তকই। অথচ পাঠ্যপুস্তকই জ্ঞানের একমাত্র উৎস নয়। জ্ঞানের উৎস প্রকৃতি, জ্ঞানের উৎস সমাজ। শিক্ষাবিজ্ঞানীদের মতে, শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে- সমাজ-সংস্কৃতির ধারাকে আয়ত্ত করা। এই আয়ত্ত করার কাজ যত না শ্রেণিকক্ষে করা যায়, তার চেয়ে বেশি করা যায় সমাজে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন- 'মাটি, জল, বাতাস, আলোর সঙ্গে সম্পূর্ণ যোগ না থাকলে শরীরের শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় না। শীত-গ্রীষ্ফ্মে কোনো কালে আমাদের মুখ ঢাকা থাকে না; তাই আমাদের মুখের চামড়া দেহের চামড়ার চেয়ে বেশি শিক্ষিত।' শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বাধ্যতামূলক কোচিংয়ের নামে শিক্ষার্থীদের বিকেলবেলার আনন্দ কেড়ে নিয়েছে। অথচ শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল ভবিষ্যতের আয়োজন নয় বরং সম্পূর্ণ জীবনই শিক্ষার উদ্দেশ্য (জন ডিউই)। একুশ শতকে শিক্ষাব্যবস্থায় এখন পর্যন্ত যেসব দেশ সেরা হিসেবে বিবেচিত, তাদের অন্যতম ফিনল্যান্ড। সেখানে শিক্ষাজীবনের প্রথম দশ বছরে শিক্ষার্থীদের একটিমাত্র পরীক্ষা দিতে হয়। দিনে তিন-চারটির বেশি ক্লাস হয় না। ১০ মিনিটের বেশি সময় লাগবে এমন কোনো হোমওয়ার্কও দেওয়া হয় না। কেন এর চেয়ে বেশি হোমওয়ার্ক দেওয়া হয় না- এমন প্রশ্নের জবাবে তাদের শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এই সময়টা তাদের শৈশবের জন্য।

বিদ্যালয়-বহির্ভূত কোচিং থাকলেও সেগুলো বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হওয়ার জন্য বিদ্যালয়ে যে কোচিং চালু করা হয়, তা বাধ্যতামূলক করা হয়। বিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং করার সিস্টেম বাতিল হলেও অনেক বিদ্যালয়েই চালু হওয়া বাধ্যতামূলক ওই কোচিং এখনও বন্ধ হয়নি। শুধু ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে টিকে আছে সেগুলো।

ব্যক্তি ও সমাজের কল্যাণমুখী অভিযোজনের লক্ষ্যেই শিক্ষার আয়োজন। আবার শিক্ষাকে বর্ণনা করা হয় অভিজ্ঞতার পুনর্গঠন প্রক্রিয়া হিসেবে। যেখানে শিক্ষার্থী প্রথম অভিজ্ঞতাটি লাভ করবে সমাজ থেকে। অর্থাৎ সমাজই শিক্ষার উৎস। তাই শিক্ষার্থীকে পুরোটা সময় শিক্ষার জন্য বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বন্দি না রেখে সুযোগ দিতে হবে সমাজ থেকে শেখার।

শিক্ষার্থী (মাস্টার্স), শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়