করোনার আকাশে ঈদের চাঁদ

কালের আয়নায়

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২০

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

কথায় বলে, 'এক রামে রক্ষা নেই, সুগ্রীব দোসর।' বাংলাদেশ এক করোনায় বিপর্যস্ত, এর পর পাশ কাটিয়ে গেছে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়। এই পাশ কাটানো ঝড়ে ক্ষয়ক্ষতি কম নয়। আর এই দুই দানবের অত্যাচারে যখন জনজীবন জর্জরিত, ঠিক তখন এসেছে রমজান শেষে ঈদ। কিন্তু এবার কি রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ গান ঘরে ঘরে শোনা যাবে? এই ভরা গ্রীষ্ফ্মের আকাশে সাদা মেঘের ভেলার পাশে এক ফালি ঈদের চাঁদ হয়তো দেখা যাবে; কিন্তু তার আলোর রেখা কি ঘরে ঘরে আনন্দ জাগাবে?

দেশ আজ করোনার আক্রমণে অবরুদ্ধ। শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা পৃথিবীর আজ একই অবস্থা। মানুষ মরছে, কান্নার রোল উঠছে দেশে দেশে। এবার কি বিশাল মাঠজুড়ে ঈদের জামাত হবে? নামাজ শেষে মানুষ কি পরস্পরের সঙ্গে কোলাকুলি করতে পারবে? বুকে বুক মেলাতে পারবে? ঘরে বসে একসঙ্গে শিরনি-পায়েস খেতে পারবে?

না, পারবে না। ইসলামের দেড় হাজার বছরের বেশি ইতিহাসে এই প্রথম ঈদের উৎসব হবে আনন্দহীনভাবে। ঈদের জামাত হবে না। যেগুলো হবে তাতে নামাজিরা পরস্পরের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রেখে বসবেন। নামাজ শেষে কোলাকুলি হবে না। দূর থেকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে তারা পরস্পরের কাছ থেকে বিদায় নেবেন। ঈদের চাঁদ দেখার আনন্দে এবার শিশুদের মিলিত আনন্দ কলরব শোনা যাবে না।

তবু ঈদ আবার আসবে। ততদিনে করোনামুক্ত মানবতা আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। ঈদের চাঁদ দেখে শিশুরা হাসবে। পাখি গান গাইবে। সন্ধ্যার আকাশে লালিমা ফুটবে। ঈদগাহে আবার মিলিত প্রাণের ঢল নামবে। ধনী-গরিব নির্বিশেষে মানুষ আবার নামাজ শেষে কোলাকুলি করবে। একসঙ্গে বসে উৎসবের খাওয়া খাবে- এই মুক্ত মানবতার সম্ভাবনার কথা মনে রেখে এই তমসার দিনে সবাইকে জানাই খুশির ঈদের শুভেচ্ছা, অভিনন্দন। ঈদ মোবারক, ঈদ মোবারক।

মানবতার ইতিহাসে বিপর্যয় এসেছে বারবার। শুধু প্রকৃতি নয়, মানুষ মানুষকে নিধন করার কাজে মেতে উঠেছে বারবার। কুরুক্ষেত্র, কারবালা, ট্রয়ের যুদ্ধ দূরের ইতিহাস হলেও কম বিপর্যয় ঘটায়নি। একালে হয়েছে দুটি বিশ্বযুদ্ধ। এখন মানুষেরই হাতে আছে বিশ্ব ধ্বংসের হাতিয়ার। আছে অতীতের হালাকু, চেঙ্গিস, তৈমুরের মতো রক্তপিপাসু নেতা- বুশ, ট্রাম্প, ব্লেয়ার প্রমুখ। বিশ্ব-মানবতা ধ্বংস করার জন্য প্রকৃতিও ছোবল মেরেছে বারবার। ঝড়, বন্যা, মহামারি মন্বন্তর ফিরে এসেছে একের পর এক।

চারশ' বছর আগে প্লেগ মহামারিতে লন্ডনসহ সারা ইংল্যান্ড ধ্বংস হতে বসেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে কাইজার, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলার, মুসোলিনি ও তোজো বিশ্ব ধ্বংসের মানুষরূপী দানবরূপে দেখা দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষে জাপানে বিশ্বধ্বংসী আণবিক বোমা ফেলেছিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান। এ কারণে কলঙ্কিত প্রেসিডেন্টের নামের তালিকায় যার নাম। কিন্তু পৃথিবী ধ্বংস হয়নি, মানবতা ধ্বংস হয়নি। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যুদ্ধেও প্রকৃতি জয়ী হয়নি। মানুষ জয়ী হয়েছে। এটা সত্য, এবারের কভিড-১৯-এর মতো সারা বিশ্বজুড়ে গোটা মানব সভ্যতার জন্য এমন মহাবিপদ আর কখনও আসেনি; কিন্তু এই বিপর্যয়ও মানব সভ্যতা কাটিয়ে উঠবে। ইতিহাসই সে কথা বলে, সে কথার সাক্ষ্য দেয়।

একজন উর্দু কবি ইসলাম সম্পর্কে যে কথা বলে গেছেন, তা মানব সভ্যতা সম্পর্কে খাটে। কবি বলেছেন, 'ইসলাম জিন্দা হোতা হায় হর কারবালা কি বাদ।' এর অর্থ 'প্রত্যেক কারবালার বিপর্যয়ের পরই ইসলাম নতুন করে বেঁচে ওঠে।' এ কথাটা মানব সভ্যতার জন্যও সঠিক। দেখা গেছে, প্রত্যেকটি প্রাকৃতিক ধ্বংসলীলা এবং মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয়ের পর মানব সভ্যতা নতুনভাবে জেগে উঠেছে। কয়েক বছর আগে আমি জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট এবং মিউনিখ শহরে বেড়াতে গিয়েছিলাম। দুটি শহরই খুব সুন্দর। রাস্তাঘাট পরিস্কার, নতুন বাড়িঘর। মিউনিখ শহর তো ছবির মতো সুন্দর। আমার জার্মান বন্ধুকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তিনি বলেছেন, 'দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বোমা হামলায় বার্লিনের পর বেশি ধ্বংস করা হয়েছে এ দুটি শহরকে। দুটি শহরেই আবার নতুন করে বাড়িঘর, রাস্তাঘাট তৈরি করা হয়েছে।'

প্রকৃতির চাইতেও মানব সভ্যতার বড় শত্রু মানুষ। বাংলা ১৩৫০ সালে অবিভক্ত বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ ও মহামারি সৃষ্টি প্রকৃতির দ্বারা হয়নি। হয়েছে মানুষের দ্বারা। আর সে মানুষটি তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল। তার নির্দেশে যুদ্ধকালীন বাংলাদেশে খাদ্যশস্য বাজার থেকে সরিয়ে ফেলে ৫০ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটানো হয়েছিল। জার্মানির হিটলার বিতর্কিত ৬ লাখ না ৬০ লাখ ইহুদি হত্যা করে হলোকাস্টের ইতিহাস তৈরি করে বিচারে দণ্ডিত হবেন- এই ভয়ে আত্মহত্যা করেছেন। চার্চিলের অপরাধের বিচার হয়নি। তিনি দণ্ড পাননি। তাকে আত্মহত্যা করেও মরতে হয়নি।

একদিন প্রকাশ পাবে আজকের করোনা সমস্যাও প্রকৃতি সৃষ্টি করেনি, মানুষ সৃষ্টি করেছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষ দিকে যখন বিষাক্ত রাসায়নিক অস্ত্র আবিস্কৃত হয়, তখন তার প্রথম ব্যবহার শুরু করে আমেরিকা। ভিয়েতনামে তারা নাপামসহ নানা রাসায়নিক মারণাস্ত্র ব্যবহার করে। তখন থেকেই 'একতরফাভাবে অস্ত্র নির্মাণ বর্জনের আন্দোলন' নামে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে, সে আন্দোলনে বার্ট্রান্ড রাসেল থেকে এন্থনি ওয়েজউড বেন পর্যন্ত মনীষীরা যুক্ত ছিলেন। তারা বিশ্বের শক্তিশালী দেশকে কেমিক্যাল ও এটম বোমা নির্মাণ বেআইনি ঘোষণার জন্য আহ্বান জানান।

তারা বলেছিলেন, এই বিষাক্ত ও মহাবিপজ্জনক অস্ত্র নির্মাণ ও তার পরীক্ষামূলক ব্যবহারে বিশ্বের প্রকৃতি বিষাক্ত হয়ে উঠবে এবং মানুষ ও জীবজন্তুর বেঁচে থাকা অসম্ভব করে তুলবে। বার্ট্রান্ড রাসেল তো এমন কথাও বলেছিলেন, দানব পুষলে যেমন সেই দানবের হাতেই পোষকের মৃত্যু ঘটে, তেমনি আণবিক অস্ত্র তৈরির পরীক্ষা চালাতে গিয়ে এবং তা স্টক করতে গিয়ে মানুষ একদিন ভুলক্রমে হলেও এ অস্ত্রটির ব্যবহার করে ফেলবে এবং বিশ্ব ধ্বংস হবে।'

এসব দার্শনিক ও বিশেষজ্ঞদের সতর্কবাণী ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নেতা ও মিডিয়া উপহাস করেছেন। বলেছেন, 'একতরফা নিরস্ত্রীকরণের নীতি গ্রহণের কথা বলা হাস্যকর। কারণ তাহলে কমিউনিস্টরা সারা দুনিয়া দখল করে ফেলবে।' অন্যদিকে সাবেক কমিউনিস্ট দেশ সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথমে নিরস্ত্রীকরণ আন্দোলন ও বিশ্ব শান্তি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরবর্তীকালে তারাও আণবিক অস্ত্র তৈরিতে সক্ষম হয় এবং আমেরিকার সঙ্গে এই অস্ত্রের নির্মাণ প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়।

আমেরিকা রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারেরও প্রথম দেশ। ভিয়েতনাম যুদ্ধে তারা এ অস্ত্র ব্যবহার করে এবং ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য এ অস্ত্র সাদ্দাম হোসেনকে সরবরাহ করে। সাদ্দাম হোসেন এ অস্ত্র ব্যবহার করার ফলে ১৫ লাখ ইরানির মৃত্যু হয়। এখন আমেরিকার ইতিহাসে সবচাইতে নিন্দিত ব্যক্তি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট পদে আসীন। অনেক বিশেষজ্ঞ বলেন, 'চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে জয়ী হতে না পেরে তার বিরুদ্ধে এই গোপন রাসায়নিক যুদ্ধে জড়িত হয়ে নিজেদের কোনো ভুলে গোটা বিশ্বকে এমনকি নিজেদেরও বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে ফেলেছেন। চীনের উহান প্রদেশে ভাইরাসটি ছড়িয়ে আমেরিকা এর কার্যকারিতা পরীক্ষা এবং চীনকে শিক্ষা দিতে গিয়ে এখন নিজেও শিক্ষা পাচ্ছে।

আবার কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ বলছেন, রাসায়নিক অস্ত্র পরীক্ষায় আমেরিকার চাইতেও এক ধাপ এগিয়ে থাকার ইচ্ছাতেই চীন এই ভাইরাস নিয়ে পরীক্ষা চালাতেই উপকথার জেলের মতো বোতলবন্দি দৈত্যকে মুক্ত করে দিয়েছে। যে বিশেষজ্ঞদের কথাই সঠিক হোক, আসল কথা তাদের ভাষায় Its a man made crisisএটা একটি মনুষ্যসৃষ্ট সংকট।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্বে সামাজিক উদারতা ও সহিষ্ণুতা এখন আর নেই। ভিক্টোরিয়ান যুগের 'ক্রুড ক্যাপিটালিজমের' হিংস্রতা ও নিষ্ঠুরতা বাড়ছে। মানুষ নিজের অজান্তে নিজেকে ধ্বংস করার শেষ প্রান্তে নিয়ে এসেছে। এই সময় শুধু মুসলমানদের ঈদ নয়, ক্রিশ্চানদের ক্রিসমাস ডে এবং হিন্দুদের সর্বজনীন দুর্গাপূজাও তার সামাজিক ঐক্য ও উৎসবের গৌরব হারানোর মুখোমুখি। এই গৌরব পুনরুদ্ধার করতে হলে গোটা মানব সভ্যতার পুনর্জাগরণ দরকার। আমার বিশ্বাস, সেই পুনর্জাগরণ সম্ভব এবং খুব বেশি দূরে নয়। দানবের সঙ্গে যারা সংগ্রামের তরে, প্রস্তুত ঘরে ঘরে সেই মানবতার পরাজয় নেই, মৃত্যু নেই। আর সেই বিশ্বাসেই সকলকে জানাই ঈদ মোবারক।