আত্মহত্যা প্রতিরোধ :দায়িত্ব সবার

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯      

মানিক রহমান

আত্মহত্যা প্রতিবাদ কিংবা প্রতিশোধ হতে পারে না। কারণ একজন মানুষ যখন পৃথিবী ছেড়ে চলে যায় পৃথিবীর কোনো হিসাবনিকাশই তার জন্য প্রযোজ্য নয়। ফলে আত্মহত্যাকে বলা যায় একটি মানসিক অসুস্থতা। মানসিক অসুস্থতা যেমন নিরাময় করা যায়, তেমনি আত্মহত্যাও প্রতিরোধ করা যায়। এ বিবেচনা থেকেই প্রতি বছর ১০ সেপ্টেম্বর পালন করা হয় বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস।

পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষই কারও না কারও সঙ্গে যুক্ত। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর সুইসাইড প্রিভেনশন (আইএএসপি) তাই বলছে, একজনের আত্মহত্যার কারণে অন্তত ১৩৫ জন মানুষকে প্রভাবান্বিত করে। যারা আত্মহত্যা করে, তারা নিশ্চয়ই কারও সন্তান, কারও ভাই কিংবা বোন, কারও হয়তো পিতা বা মাতা। কারও বন্ধু, কারও-বা সহপাঠী। এভাবে প্রিয় মানুষের বিদায় কিংবা 'অপমৃত্যু' সহ্য করা কঠিন।

আমরা দেখেছি, সাধারণ বিষয় নিয়েও অনেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। বিশেষ করে আমাদের পাবলিক পরীক্ষার ফলের পর ফেল করলে কিংবা কাঙ্ক্ষিত গ্রেড না পেয়ে অনেক ছেলেমেয়ে এ পথ বেছে নেয়। অথচ পরীক্ষার ফল জীবনের সাধারণ এক অনুষঙ্গ মাত্র। এমন তো নয় ভালো গ্রেড না পেলে জীবন অচল হয়ে যাবে। এমনও নয় ফেল করা মানে জীবন থেমে যাওয়া। মায়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, বাবার সোহাগের চেয়েও কি গ্রেড বড়?

পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর ১১ হাজার আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় এসেছে পারিবারিক সমস্যা, বৈবাহিক সমস্যা, ছেলেমেয়ের সম্পর্ক, অর্থকষ্ট ইত্যাদি নানা কারণে সৃষ্ট সমস্যায় মানুষ আত্মহত্যা করে বা আত্মহত্যার চেষ্টা করে। অথচ মানুষের জীবনের কোনো সমস্যাই স্থায়ী নয়। কোনো সমস্যার কারণে কিংবা বিশেষ কারও জন্য কোনো জীবন থেমেও থাকে না। জীবনের মানেই হলো এটি চলমান। আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়ে জীবনকে থমকে দেওয়া বোকামি ছাড়া কিছু নয়।

তবে কেউ যখন গভীর সংকটে কিংবা সমস্যায় পড়েন, তখন তাকে সাপোর্ট দেওয়ার দায়িত্ব আমাদেরই। এ অবস্থায় অধিকাংশই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। মানসিক বিপর্যয়ে ব্যক্তির পাশে দাঁড়িয়ে সাহস দেওয়া, তার প্রয়োজনে এগিয়ে আসা কিংবা প্রয়োজনে তার নিরাপত্তার দায়িত্ব কাউকে না কাউকে নেওয়া প্রয়োজন। আইএএসপিও সেটিই বলছে, ওয়ার্কিং টুগেদার টু প্রিভেন্ট সুইসাইড অর্থাৎ আত্মহত্যা প্রতিরোধে একত্রে কাজ করা। পারিবারিক বিরোধ হলে তার সুন্দর সমাধান। কেউ পরীক্ষায় ফেল করলে তাকে বকাঝকা না দিয়ে বরং অভয় দেওয়া, ভবিষ্যতে ভালোর জন্য চেষ্টা করতে উৎসাহ দেওয়া। কেউ অর্থকষ্টে পড়লে বা ঋণগ্রস্ত হলে তার ব্যবস্থা করা। কিছু বিষয়ের হয়তো ব্যক্তিগত সমাধান আছে আবার কিছু বিষয়ে সমাজের বা দশের সাহায্য লাগতে পারে। অবস্থা অনুযায়ী সে ব্যবস্থা করা দরকার। এমনকি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে তারও বন্দোবস্ত করা দরকার।

মানুষের অবস্থা সবসময় একরকম থাকে না। কারও হয়তো সাধারণ বিষয়েই মন খারাপ হয়ে যায়। আবার সামান্য বিষয়েই মন ভালো হয়ে ওঠে। মানসিক অবস্থার ওপর আমাদের অনেক কিছুই নির্ভর করে। মন খারাপ থাকলে আপনার প্রিয়জন হয়তো সাধারণ আবদারও পূরণ করবে না; কিন্তু মন ভালো তো অনেক বড় সারপ্রাইজ আপনি পেয়ে যাবেন। এ জন্য কারও আচরণে কষ্ট পেয়েও হুটহাট করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া বোকামি।

আত্মহত্যা প্রতিরোধে তাই অন্যের প্রতি যেমন আমরা সহানুভূতিপ্রবণ হবো, একই সঙ্গে নিজের জীবনের সংকট মোকাবেলায়ও ধৈর্য, সহনশীলতা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেব।

    manikrahmanbd@gmail.com