হাতিরঝিল থেকে বাঞ্ছারামপুর

অন্যদৃষ্টিৱ

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯

বিনয় চৌধুরী

রাজধানী ঢাকার বর্তমানের হাতিরঝিল ছিল এক সময় ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়। এর বিরূপ প্রভাব যে শুধু এর আশপাশের এলাকায়ই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল তা নয়, আরও বিস্তৃত পরিসরেও নানা কারণেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। সেই হাতিরঝিল এখন দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠেছে। হাতিরঝিলে এখন চক্রাকার বাস চলে, রাজধানীতে নিত্য ভোগান্তি পাওয়া যাতায়াতকারীদের মধ্য দিয়ে অনেক এলাকায় পৌঁছার পথও সুগম হয়েছে। স্থলভাগে গড়ে উঠেছে ব্যস্ত নগর জীবনের ফাঁকে প্রাণ খুলে সময় কাটানোর নানা কেন্দ্র। এই ঝিলের পানির বুক চিরে চলাচল করে ওয়াটার বাসও। এফডিসি মোড় থেকে গুলশান পুলিশ প্লাজা, রামপুরায় সহজে যাতায়াত করা যায় চক্রাকার বাস কিংবা ওয়াটার বাসে। অপরাহপ্ত থেকে ভিড় জমতে থাকে নগরজীবনের ক্লান্তিকর অবসাদ ঝেড়ে একটু মনোরঞ্জনের প্রত্যাশায় অসংখ্য মানুষের। সন্ধ্যার পর হাতিরঝিলে দৃশ্যমান হয় অন্যরকম মেলা। মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয় রাজধানীর এক সময়ে অবহেলিত এখনকার মনোমুগ্ধকর এই কেন্দ্রটি। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নগরীর একসময়ের বৃহদাকারের ডাস্টবিনটি পরিণত হয়েছে মানুষের মনের খোরাক জোগাতে একটি অপরূপ কেন্দ্রে। হাতিরঝিলের এই মনোরম রূপান্তর দেশের অন্য অঞ্চলেও পরিকল্পনার ঝাঁপি খুলে দিয়েছে। এর আদলে এমন দৃশ্য উপভোগ্য স্থান গড়ে তোলার প্রয়াস চলছে। ঢোলভাঙা-তিতাস নদী ঘেরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলা সদর ঘিরে নেওয়া হচ্ছে নবউদ্যোগ। সর্বাগ্রে নদীভাঙন ঠেকিয়ে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করে কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজও শুরু হয়ে গেছে। সাবেক মন্ত্রী বর্তমানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি সংসদ সদস্য ক্যাপ্টেন (অব.) এ বি তাজুল ইসলামের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে- সৌন্দর্য বৃদ্ধি, পরিবেশগত উন্নয়ন, ওয়াকওয়ে নির্মাণ ও পার্ক স্থাপন করাই এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। স্থানীয় অধিবাসীদের ঔৎসুক্য বাড়িয়ে দিয়েছে এমন বার্তা। বাঞ্ছারামপুরে ইতিমধ্যে সরকারের সংশ্নিষ্ট বিভাগের দায়িত্বশীল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরেজমিন পরিদর্শনে গেলে স্থানীয় অধিবাসীদের স্বপ্নের দিগন্ত আরও বিস্তৃত হয়। আমাদের দেশে রয়েছে প্রকৃতি প্রদত্ত পর্যটনের অফুরন্ত ভাণ্ডার। এগুলোকে আরও উন্নতকরণের পাশাপাশি ঢোলভাঙার মতো দেশের বিভিন্ন স্থানে নেওয়া যেতে পারে এমন আরও প্রকল্প। তাতে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের আয়ের দরোজাও খুলবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পর্যটন শিল্প হিসেবে দাঁড়িয়েছে এবং জিডিপিতেও পর্যটন খাতের অবদান বহু দেশেই দৃশ্যমান। আমাদের এমন সম্ভাবনার দরোজা উন্মুক্ত থাকলেও যথাযথ উদ্যোগ-আয়োজনের অভাবে কিংবা যা আছে এরও উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, পর্যটকদের আকৃষ্ট করার মতো অনেক কিছুর অভাবের কারণে আমরা কাঙ্ক্ষিত মাত্রা স্পর্শ করতে পারছি না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে এ অঞ্চলের দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ পর্যন্ত এর দৃষ্টান্ত রয়েছে। এ অঞ্চলের ছোট্ট রাষ্ট্র ভুটান এ খাতে উত্তরোত্তর মনোযোগ বাড়িয়েই চলেছে। এর বাইরে নয় নেপাল, শ্রীলংকা, ভারতও। অথচ আমাদের বিশ্বের সর্ববৃহৎ সমুদ্রসৈকতসহ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, পাহাড়, বন, জলাবনের যে সমারোহ রয়েছে তা সত্ত্বেও আমরা পর্যটকদের কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় আকৃষ্ট করতে পারছি না। আমাদের সমস্যাগুলো অচিহ্নিত নয়। এই চিহ্নিত সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারছি না বিধায় আমাদের অফুরন্ত সম্ভাবনাও সে অনুযায়ী ডানা মেলছে না। বিশ্বের কয়েকটি বড় বড় গবেষণাধর্মী সংস্থা ইতিমধ্যে এ ক্ষেত্রে আমাদের সম্ভাবনা যাচাই করে তাদের গবেষণা প্রতিবেদনে করণীয় সম্পর্কেও উল্লেখ করেছে। শুধু বাঞ্ছারামপুরই নয়, এমন আরও অনেক ক্ষেত্রই রয়েছে, যেগুলোকে কেন্দ্র করে নেওয়া যায় সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। পর্যটন দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশে যে দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে তা পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য যথেষ্ট। সম্ভব জিডিপিতেও এর অবদান ২ দশমিক ১ শতাংশ থেকে বাড়ানো। হাতিরঝিল থেকে বাঞ্ছারামপুর তারপর আমরা যেতে চাই আরও দূর।

সাংবাদিক