আজীবন সংগ্রামী, কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু, ভুট্টা আন্দোলনের অন্যতম বিপ্লবী, খাপড়া ওয়ার্ডের আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হন আমিনুল ইসলাম বাদশা। আজ ৪ আগস্ট তার ২১তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯২৯ সালের ১৪ এপ্রিল পাবনা শহরের কৃষ্ণপুর মহল্লায় আমিনুল ইসলাম বাদশার জন্ম। তাঁর পিতার নাম আলহাজ নুরুজ্জামান শেখ, মাতার নাম খবিরন নেছা। আমিনুল ইসলাম বাদশা পাবনার গোপালচন্দ্র ইনস্টিটিউশনের ছাত্র থাকাকালে কৈশোরে ১৯৪৩ সালে জননেত্রী সেলিনা বানু ও কমরেড প্রণতিকুমার রায়ের সঙ্গে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন এবং ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন। তখন চলছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। অবিভক্ত ভারতে ৫০-এর মন্বন্তরের পদধ্বনি। আমিনুল ইসলাম বাদশা ব্রিটিশ ভারতবর্ষের স্বাধীনতা, দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ আন্দোলনে অংশ নেন। ১৯৪৭-এর ৪ নভেম্বর পাবনার ঈশ্বরদীতে অনুষ্ঠিত যুব সম্মেলনে রাজশাহীর প্রখ্যাত নেতা আতাউর রহমানের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠিত হয়। তাতে উপস্থিত ছিলেন আমিনুল ইসলাম বাদশা। ১৯৪৮ সালের গোড়ার দিক থেকেই গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠনে তিনি আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাংলা ভাষাবিষয়ক প্রস্তাবনা মুসলিম লীগ সরকারের বিরোধিতায় নাকচ হয়ে গেলে পাবনার সচেতন প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। ১৯৪৮-এর ২৬ ফেব্রুয়ারি সর্বদলীয় সভায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। আমিনুল ইসলাম বাদশা রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক নির্বাচিত হন। ২৭ ফেব্রুয়ারি সর্বদলীয় বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুসারে ১৯৪৮ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি পাবনা শহরে হরতাল পালিত হয়। প্রশাসনের জারি করা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে পাবনা শহরে ছাত্র-জনতার মিছিল নামে। সে মিছিলে নেতৃত্ব দানকারীদের একজন ছিলেন আমিনুল ইসলাম বাদশা। পুলিশ আমিনুল ইসলাম বাদশাসহ ৬৪ জনকে গ্রেফতার করলেও আন্দোলনের মুখে ওই দিনই আদালত মুক্তি দেন সবাইকে। এর দু'দিন পর আবার গ্রেফতার হন ও ক'দিন পর ছাড়া পান। ১৯৪৮-এর ১১ মার্চ সারা পাকিস্তানে ডাকা হরতাল সর্বাত্মকভাবে পালিত হয় পাবনায়। ১৯৫০-এর ২৪ এপ্রিল রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডে আটক রাজবন্দিদের ওপর জেল পুলিশের নির্মম গুলিবর্ষণে ৭ জন বিপ্লবী শহীদ হন এবং অবশিষ্ট ৩০ জনেরও অধিক গুরুতর আহত হন। আমিনুল ইসলাম বাদশা তাদের অন্যতম। মৃত্যুর দিন পর্যন্ত বুলেট তাঁর পায়ের ভেতরে থেকে গিয়েছিল। তিনি তাঁর পায়ের চিকিৎসার জন্য কোনো প্রকার রাষ্ট্রীয় বা দলগত সুযোগ-সুবিধাও গ্রহণ করেননি। কারাগার থেকে বেরিয়ে এসে ১৯৫৩ সালে বন্দিমুক্তিসহ মুসলিম লীগবিরোধী নানা আন্দোলনে অংশ নেন। ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন পরিচালনার জন্য গঠিত পাবনা জেলা গণতান্ত্রিক কর্মী শিবিরের যুগ্ম আহ্বায়ক নির্বাচিত হন। নির্বাচনী অভিযান চালানোকালে '৫৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। সে নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি হলে এক মাস পর মুক্তি পান। এর দু'মাস পর ৯২ (ক) ধারা জারি করে যুক্তফ্রন্ট নেতা শেরেবাংলা ফজলুল হকের নেতৃত্বে গঠিত পূর্ববাংলার প্রাদেশিক সরকার বাতিল করার সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার হন। ১৯৫৭ সালে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠনের পর তিনি ন্যাপে যোগ দেন। ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে ন্যাপ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে অংশ নেন। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে পাবনা জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে গঠিত হাইকমান্ডের সদস্য ছিলেন। একই বছর ১০ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী পাবনা পুনর্দখল করার পর কলকাতা গিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে আত্মনিয়োগ করেন। দেশের রাজনীতিতে একটি প্রগতিশীল বিকল্প ধারা সৃষ্টিতে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৯৮ সালের ৪ আগস্ট ঢাকার হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান।

সাংবাদিক

মন্তব্য করুন