পথের ক্লান্তি ভুলে

বাড়ি ফেরা

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০১৯     আপডেট: ১১ আগস্ট ২০১৯      

ড. হারুন রশীদ

বাংলাদেশের মানুষ ভাগ্যের সন্ধানে যেমন শহরে পাড়ি জমায়, তেমনি আবার উৎসবে-আনন্দে গ্রামে যায়। বিশেষ করে দুই ঈদে মানুষের প্রিয়জনের সান্নিধ্যে যাওয়ার সে কী প্রাণান্তকর চেষ্টা! মওকা বুঝে বাস মালিকদের ভাড়া বৃদ্ধি, রেলের টিকিটের জন্য রাতভর অপেক্ষা, সড়ক-মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট ইত্যাকার কষ্টকর নানা সমস্যা উজিয়ে ঘরে ফেরার আনন্দই হয়ে ওঠে মুখ্য। ঠাঁই নেই, তবুও যেতে হবে। বাসে, ট্রেনের কামরার ভেতরে দাঁড়িয়ে, সেখানে ঠাঁই না হলে ছাদে। লঞ্চেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ফ্লোরে বসে, ডেকে দাঁড়িয়ে, এমনকি ছাদের ওপর বিছানা পেতে সেখানেই গন্তব্যের জন্য বসে পড়া। ঈদ সামনে রেখে প্রতি বছর একই অবস্থা হয়। যেভাবেই হোক বাড়িতে পৌঁছতেই হবে। এ টান যে বড় বেশি প্রাণের। এ টান নাড়ির। দুনিয়ার কোথাও কি মানুষ এভাবে ছোটে প্রাণের টানে, শিকড়ের সন্ধানে? কিসের এত মায়া? কিসের জন্য মানুষের এই ঘরে ফেরার আকুতি? সে কি কেবলই প্রিয়জনের সান্নিধ্য? নাকি তারও অতিরিক্ত অন্য কিছু?

কী শোভা, কী ছায়া গো, কী স্নেহ, কী মায়া গো-/কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে, নদীর কূলে কূলে। ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় গ্রামকে দেখার জন্য আকুতি? ইট-কাঠ-পাথরের এই শহর ছেড়ে মুক্তভাবে শ্বাস নেওয়ার জন্য? নাকি জীবনানন্দের বনলতা সেনের মুখোমুখি বসার মতো 'দুদণ্ড শান্তির' জন্য এই যাত্রা? যারা গ্রাম থেকে শহরে আসেন, তাদের প্রাণটা আসলে পড়ে থাকে গ্রামেই। বিশেষ করে যারা গ্রামে বড় হয়েছেন। এই নাগরিক জীবন হয়তো অনেক কিছু দেয়। শিক্ষা-দীক্ষা, ভাত-কাপড়, রুটি-রোজগারের নিশ্চয়তা। অনেক উত্তেজনা। ভোগবিলাস-আনন্দ। কিন্তু জীবনের সব পাওয়া, সব তৃষ্ণা কি মেটে তাতে? কিছুই কি বাকি থাকে না? এই শহরে তো দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ নেই, জোয়ার-ভাটায় দোলে ওঠা নদী নেই, বৃক্ষের শ্যামল ছায়া নেই, ধানের ক্ষেতে রোদ ও ছায়ার লুকোচুরি খেলা নেই, ঘাসের ডগায় শিশির নেই, রাখালের বাঁশের বাঁশি নেই, গোধূলির আলো নেই, বাউকুড়ানির ডগায় ঝরাপাতার নৃত্য নেই, পাখির কলকাকলি নেই, পিঠেপুলি ও পাটিসাপটার আয়োজন নেই, আউল-বাউল, জারি, সারি, ভাটিয়ালির হৃদয় উদাস করা সুর নেই, বাঁশ বাগানের মাথার ওপর চাঁদ নেই, নেই এক চিলতে উঠোন। এসব নেই-এর পাল্লা এতটাই ভারী যে, তা বলে শেষ করার নয়।

সে জন্যই কি আমাদের ছুটে চলা? গ্রামছাড়া ওই রাঙামাটির পথে পায়ে ধুলো মাখিয়ে হাঁটার জন্য? নাকি আদিখ্যেতা হয়ে যাচ্ছে এসব কথা? মানুষ কি আর এত হিসাবনিকাশ করে চলে! কয়েকটা দিন ছুটি পেলাম আর কোথাও ঘুরে এলাম-এ রকম তো। আটপৌরে বাঙালি। কোথায় আর যাবে। বেড়ানোর কি ফুরসত আছে? যে মাইনে আর রোজগার তাতে সংসারের হাঁড়ি টানতেই তো সব যায়। দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়াকে সামাল দিতেই তো হিমশিম খেতে হয়। সে জন্য বিদেশ বিভুঁই নয়, 'ঘর হতেই আঙিনা বিদেশের মতো' দেশের বাড়িতেই (নিজ গ্রাম) ঈদ করা। কিন্তু সেই গ্রামও কি আর আগের মতো আছে? নাগরিক সুযোগ-সুবিধার অনেকখানিই পাওয়া যায় এখন গ্রামে বসেই। বিদ্যুৎ পৌঁছেছে বেশিরভাগ গ্রামেই। সে জন্য বাড়ি বাড়ি টেলিভিশন। সবার হাতে হাতে মোবাইল ফোন। কম্পিউটার, সঙ্গে ওয়্যারলেস, ইন্টারনেট সংযোগ। ভার্চুয়াল একটা যোগাযোগ তৈরি হয়েছে গ্রামের সঙ্গে শহরের। শহরের সঙ্গে গ্রামের; কিন্তু তাতেও তো সব হয় না। দুধের স্বাদ কি ঘোলে মেটে?

এর জন্য তো আসল দুধই চাই। আর সেটি পেতে হলে তো 'গোলাভরা ধান আর গোয়ালভরা গরু'র দেশে যেতে হবেই। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, গ্রামের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাটা এখনও আশানুরূপ নয়। এ জন্য ঘরমুখো মানুষজনকে কম দুর্ভোগ পোহাতে হয় না। কিন্তু তাতে কী? যেতে তো হবেই। শিশির ভেজা সবুজ ঘাস, ছোট্টবেলার স্কুলে যাওয়ার মেঠোপথের স্মৃতি, হাডুডু আর ফুটবল খেলার মাঠ কিংবা টাকার অভাবে পড়তে না পারা স্কুলজীবনের সেই সহপাঠীর প্রিয় মুখ দেখার আনন্দ কোথায় পাওয়া যাবে এই শহরে। পাশের বাড়ির সাপের ফণার মতো বেণি দুলানো দুরন্ত সেই কিশোরীর হাসি কোথায় মিলবে এই শহরে। এই শহরে নির্ভেজাল জীবনানন্দ কোথায়? এখানে তো মানুষ নয়, শোষক আর শোষিত, আমলা আর কামলা, মালিক-শ্রমিক, পুঁজিপতি আর নিঃস্ব, হাইরাইজ বিল্ডিং বনাম রেললাইনের পাশের বস্তির বিস্তর ব্যবধানের মধ্যে সরকার কিংবা বিরোধী দলের শিল-পাটার ঘষাঘষির মধ্যে বাস। জীবন কোথায় এখানে? চারদিকে ঠগ, প্রবঞ্চক, প্রতারক, অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টি, যানজট আর জনজটে রাস্তায় চলাই দায়। ঘুষখোর কর্মকর্তা ইলিশ কেনে ১৪ হাজার টাকা হালি আর সাধারণের পুঁটি কিনতেই নাভিশ্বাস।

তিন হাজার টাকা নূ্যনতম মজুরি ঠিকমতো না পাওয়া গার্মেন্টস কর্মীদের জীবনেও ঈদ আসে। তারাও ঘরে ফেরে। শরীরের প্রায় শেষ শ্রমটুকু নিংড়ে দিয়ে তাদের যখন ছুটি মেলে ফেরার নিশ্চয়তাটুকুও নেই। মধ্যরাত পর্যন্ত বাক্স-পেটরা হাতে রাস্তার পাশে অপেক্ষা আর অপেক্ষা। অথচ এদের ঘাম-শ্রমের বিনিময়েই আমাদের অর্থনীতির চাকা সচল থাকে। রেমিট্যান্স প্রবাহ জিডিপির হার বাড়ায়। যা এই দেশকে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। আসলে এই যে এত ঝক্কি-ঝামেলা সহ্য করে ঘরে ফেরা, এটাও তো দেশপ্রেমেরই অংশ। আমরা তো আমাদের মায়ের কাছেই ফিরি। দেশও তো মায়ের সমতুল্যই। মা ছাড়া আর কারও জন্য কি এভাবে জীবন বাজি রাখা যায়? একাত্তরে যা করেছে বীর বাঙালি।

সাংবাদিক