আমার সঙ্গে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের প্রত্যক্ষ পরিচয় ১৯৭২ সালে। বলতে গেলে মুক্তিযুদ্ধের পরপর। পরিচিত মুক্তিযোদ্ধারা তাকে মা বলে ডাকতেন। কেউ কেউ ডাকতেন খালাম্মা। আমিও খালাম্মা বলেই ডাকতাম এবং এর একটি ভিন্ন প্রেক্ষাপট ছিল। সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের মা আমার আপন সেজ খালাম্মা। তিনি এবং জাহানারা ইমাম ছিলেন সহপাঠী। দু'জনের মধ্যে সখ্যও ছিল খুব এবং আমি সে কারণে জাহানারা খালাম্মার অপত্যস্নেহ লাভে সমর্থ হয়েছিলাম। দু'জনেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েছিলেন।

জাহানারা খালাম্মার বাসার কাছেই আমার বাসা ছিল বিধায় যোগাযোগটা ছিল বেশি। প্রিয় সন্তান রুমী মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়ার মর্মন্তুদ সংবাদ শুনে শরীফ ইমাম হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। একই সময়ে সন্তান ও স্বামীকে হারিয়েও খালাম্মা মনোবল শক্ত করে পর্যায়ক্রমে সব দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন। তিনি আমার দেখা নারীদের মধ্যে ছিলেন অসম্ভব দৃঢ়চিত্তের অধিকারী, মমতাময়ী এবং সুশ্রী। খালাম্মা তার মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও আমি, শাহাদাত ভাইসহ কয়েকজনের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে মনোনিবেশ করেছিলেন 'একাত্তরের দিনগুলি' রচনায়। 'একাত্তরের দিনগুলি' মুক্তিযুদ্ধের একটি অনন্য দলিল। আমার বিবেচনায় এই বইটির সমকক্ষ মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় কোনো বই এখনও পাইনি। প্রখর পাণ্ডিত্যের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তার রচনার ভাষা, শব্দ চয়ন এত সহজ-সরল, যা যে কোনো পাঠককে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। কোনো কোনো সময় রাষ্ট্রদ্রোহী হওয়ার মতো বড় যেন আর কিছুই হয় না। আমি ১৯৬৯ সাল থেকেই রাষ্ট্রদ্রোহী। একমাত্র জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকালের সময়টুকু ছাড়া আমি সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই রাষ্ট্রশক্তির কাছে বিবেচিত হয়েছি। আমি খালাম্মার মৃত্যুর পর লিখেছিলাম, জাহানারা ইমাম আমাদের 'শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রদ্রোহী'। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি তার সৃষ্টি এবং এই প্ল্যাটফর্মে তিনি এতজনকে টেনে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন, যা বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। জাহানারা ইমাম এমন একটি নাম, যে নামের বিস্তৃতি উল্লেখ করে শেষ করার নয়। শিক্ষক, দক্ষ প্রশাসক, সংগঠক সব পরিচয়েই তিনি ঋদ্ধ। ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ একাত্তরের নরঘাতক গোলাম আযমের প্রতীকী বিচার হিসেবে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যে গণআদালত অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তা স্বাধীন বাংলাদেশে অক্ষয় অধ্যায় হয়েই থাকবে। ১৯৯২ সালের গণআদালত ছিল সময়োপযোগী সাহসী একটি প্রতিবাদ।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠন, গণআদালত পরিচালনা এবং এর পূর্বাপর বহু কারণে তার ওপর তৎকালীন রাষ্ট্রশক্তির নিপীড়ন-নির্যাতনের মাত্রা ছিল সীমাহীন। তখন তিনি ছিলেন অসুস্থ, ক্যান্সার আক্রান্ত। তিনি জানতেন, ব্যাধিটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নেই এবং হয়তো আয়ুসীমাও আর বেশি নেই। কিন্তু তিনি বিচলিত ছিলেন না। অবিচল এই সংগ্রামী তৎকালীন রাষ্ট্রশক্তির নির্দেশে পুলিশি নির্যাতনে অজ্ঞান হয়ে একবার রাস্তায়ও পড়েছিলেন। পুনর্বার বলছি, আমার দেখা নারী চরিত্রের মধ্যে এখনও শ্রেষ্ঠ মনে করি জাহানারা ইমামকে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অক্লান্ত সৈনিক জাহানারা ইমামের আমৃত্যু লড়াই ছিল মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। জীবনের শেষ দিনগুলোতেও তিনি এসব ব্যাপারে অন্যদের সাহস দিয়ে গেছেন। কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে যাওয়ার পর কম্পিত হাতে দেশের মানুষের কাছে চিঠি লিখে তার অন্তিম ইচ্ছা প্রকাশ করে গেছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, 'একাত্তরের ঘাতক ও যুদ্ধাপরাধবিরোধী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও '৭১-এর ঘাতক দালাল নির্মূল আন্দোলনের দায়িত্বভার আমি আপনাদের, বাংলাদেশের জনগণের হাতে অর্পণ করলাম। জয় আমাদের হবেই।' তিনি চিরজাগ্রত থাকবেন বাঙালির হৃদয়ে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনর্জাগরণের সঙ্গে তিনি জড়িয়ে আছেন। শহীদ জননীর ঘাতক দালালবিরোধী ভূমিকার সবচেয়ে স্বচ্ছ ও বলিষ্ঠ দিক ছিল গোলাম আযমকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে গণআদালতে বিচারের আন্দোলনে একনিষ্ঠতা। ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধায় তাকে স্মরণ করি।

সাবেক ক্যাপ্টেন ও বৈমানিক মুক্তিযোদ্ধা

মন্তব্য করুন