আসামে নতুন করে নাগরিকদের জাতীয় নিবন্ধন বা এনআরসির প্রথম খসড়া তালিকা ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী যথাক্রমে সর্বানন্দ সান্যাল ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উভয়েরই কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়েছে। এ সমস্যাকে অসমিয় বনাম বাঙালি কিংবা স্থানীয় বনাম অভিবাসী, এমনকি হিন্দু বনাম মুসলিম সমস্যা হিসেবে দেখা যাবে না। বরং এটি আরও জটিল সমস্যা।

আসামে বিদেশি শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া অনেক দিন ধরেই চলছে। স্নেহলতা দত্ত নামে ৮৬ বছরের এক অর্ধ-পক্ষাঘাতগ্রস্ত বৃদ্ধকে তিন মাস ধরে অবৈধ অভিবাসী আইনে কারারুদ্ধ করা হয়। অথচ তার জামাতা মুকুল দের মতে, স্নেহলতার পরিবার দেশভাগের আগে থেকেই আসামে বাস করে আসছে। মারিজান বিবির (৪১) ঘটনা এ রকমই। সঠিক কাগজপত্র দেওয়ার পরও তাকে বিদেশি শিবিরে আটক করা হয় এবং তাকে তার দেড় বছর বয়সী সন্তান থেকে পৃথক করা হয়। আমার এক আত্মীয়কেও এভাবে আটক করে এক মাস রাখা হয়। কারণ বিয়ের আগে ও পরের নামে মিল ছিল না।

আসামে বিদেশি গ্রেফতারের নামে আসলে এ রকম চরিত্রেরই মঞ্চায়ন করা হচ্ছে। নাগরিক নিবন্ধনের নতুন তালিকা করা বিদ্যমান তালিকার চেয়েও উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা। ১৯৮০'র দশকে বিদেশি নাগরিকদের আটক করার জন্য আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। এটি ১৯৮৫ সালে আসাম অ্যাকর্ড নামে পরিচিত- যেখানে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর যারা আসামে প্রবেশ করেছে তারাই বিদেশি। তাদের শনাক্ত করে বিতাড়িত করা হবে। কিছু মানুষ বিতাড়ন করাও হয়। ২০১২ সাল পর্যন্ত এ সংখ্যা ২৪৪২। তবে ৫৪ হাজার জনকে বিদেশি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তাহলে কি খুব বেশি মানুষকে বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি?

বিষয়টি বলা কঠিন। তবে তাদের এ পদ্ধতিতে ধরলেও তথ্য নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কারণ ১৯৭১ সাল থেকে দু'দশক আগে আসামের জনসংখ্যা বৃদ্ধি ভারতের জাতীয় জনসংখ্যার হারের চেয়েও বেশি ছিল। হতে পারে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে শরণার্থী আসায় এটা হয়েছে। কিন্তু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আসামে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমেছে। ১৯৭১ সালের পর এ হার জাতীয় জনসংখ্য বৃদ্ধির হারের চেয়েও কম। যা হোক দীর্ঘ মামলা-মোকদ্দমার পর ২০১৪ সালে আদালত থেকে আদেশ আসে- এনআরসি আপডেট করতে হবে এবং ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আগে যেসব বিদেশি এসেছে, তাদেরকে সেখানে নিবন্ধন করা হবে। আর এ তারিখের পর যারা এসেছে তাদের 'ডি' বা ডাউটফুল (সন্দেহজনক) ভোটার হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। এখন নতুন করে ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর এনআরসির প্রথম খসড়া প্রকাশ হয়। যারা সেখানে আবেদন করে তাদের ৫৮ শতাংশের নাম আসে। চূড়ান্ত তালিকা এখনও প্রকাশ হয়নি। তবে প্রথম তালিকায়ই ঝামেলা সৃষ্টি করেছে। যদিও মুখ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন, প্রকৃত ভোটারদের চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই।

আসলে কি চিন্তার বিষয় আছে? প্রথমত আদিবাসীদের কথা বলতে হবে। তাদের কতজনের কাছে এ কাগজপত্র আছে যে তারা ৪৭ বছরেরও আগ থেকে আসামে আছে? অবশ্য এনআরসির রাজ্য পরিচালক প্রতীক হাজেলা নিশ্চিয়তা দিচ্ছেন- "এটা আমার দায়িত্ব, যাতে আদিবাসীদের মধ্য থেকে কোনো প্রকৃত নাগরিক 'ডি' ভোটারের কাতারে না পড়েন।" তার এ মন্তব্য ধরেই বলা যায়, তিনি আদিবাসীদের মধ্য থেকে প্রকৃত নাগরিকের কথা বলেছেন। এর দ্বারা অভিবাসী বোঝায় কি-না, স্পষ্ট নয়। ফলে অভিবাসীরা এতে উদ্বিগ্ন।

এটা বলা কঠিন যে, আসলে এনআরসির আপডেটের মাধ্যমে কী পীড়াদায়ক ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে! এখানে রাজনীতির বিষয় রয়েছে। বিজেপি একে ভালোভাবেই সমর্থন করছে। বিজেপির সাংসদ আরপি শর্মা তো বলেছেন, গোটা ভারতে এনআরসি আপডেট করা হোক, যাতে ৫ কোটি অবৈধ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো যায়। বিজেপির এ কথার মধ্যেও রাজনীতি রয়েছে। কারণ সেখানে বিজেপির মিত্রদের মধ্যে একটা বিদেশভীতি রয়েছে।

আবার অন্য রাজনীতিও আছে। আসামে হিন্দু বাঙালিরাও চিন্তিত। বরাক ভ্যালির শিলচর শহর সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, সেখানকার ৪০ শতাংশেরও কম নাগরিক প্রথম খসড়ায় স্থান পেয়েছে। তাহলে 'ডি' শ্রেণির হিন্দু ভোটারদের কী হবে? হিন্দুত্ববাদেরই-বা কী হবে? সম্ভবত তার জবাব রয়েছে বিজেপি নেতার কথায়। তিনি বলছেন, ২০১৯ সালের নির্বাচনের আগে একটি নাগরিক বিল পাস হবে। যদি তা হয় সেখানে হয়তো হিন্দু বাঙালিদের আত্তীকরণ করবে আর মুসলিমদের অবৈধ ঘোষণা করা হবে। এটিই হবে 'হিন্দু রাষ্ট্র' গড়ার পথে এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ!

নোট :লেখক আসামে চার পুরুষ ধরে বাস করা অভিবাসী পরিবারের সদস্য।

দ্য ওয়্যার ইন্ডিয়া থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর

মাহফুজুর রহমান মানিক

সহযোগী অধ্যাপক, মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগ, আইআইটি, গৌহাটি

মন্তব্য করুন