লাল সালাম, কমরেড জসিম

শ্রদ্ধাঞ্জলি

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০১৭      

শরিফুজ্জামান শরিফ

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের বর্ষীয়ান নেতা কমরেড জসিম উদ্দিন মণ্ডল ২ অক্টোবর ঢাকার একটা হাসপাতালে মারা গেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর।
তিনি মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলেন, ছিলেন রেলের শ্রমিক ও পরে শ্রমিক নেতা। জসিম উদ্দিন মণ্ডল ১৯২৪ সালে বর্তমান কুষ্টিয়া জেলার কালিদাসপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৩৯ সালে তিনি রেল ইঞ্জিনে কয়লা ফেলার চাকরি পান। কিশোর বয়স থেকে তিনি মহাত্মা গান্ধী, বাঘা যতীন, প্রীতিলতা, জ্যোতি বসু, কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামসহ প্রখ্যাত মানুষের সাম্নিধ্য পান। ষাটের দশকে রেলওয়েতে চালের বদলে খুদ দেওয়ায় তিনি রেল শ্রমিকদের নিয়ে প্রতিবাদ ও আন্দোলন করেন। এতে তার চাকরি চলে যায়। তিনি জেলের বন্দিদের ওপর পাকিস্তান সরকারের নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে নিজেই অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তিনি বাংলাদেশেও জিয়া এবং এরশাদের শাসনামলে একাধিকবার কারাবরণ ও নির্যাতনের শিকার হন। রাজনীতির জীবনে তিনি মোট ১৯ বছর জেলে কাটিয়েছেন।
জসিম উদ্দিন মণ্ডল শ্রমজীবী রাজনীতি করতেন। নিজেও ছিলেন সর্বহারা। তার নিজস্ব কোনো বাড়ি নেই। পাবনার ঈশ্বরদীতে বন্দোবস্ত নেওয়া সরকারি একখণ্ড জায়গায় তিনি বসবাস করতেন। তিনি খুব সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তেমন ছিল না।
জসিম উদ্দিল মণ্ডল কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতি করতেন। পার্টির অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। তিনি সারাদেশে ব্যাপক পরিচিত ও জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। এই পরিচিতির কারণ হলো, তিনি খুব সাধারণ ভাষায় মানুষের প্রাণের কথা বলতেন। সমাজে বৈষম্য-হাহাকার-বেকারত্ব-অনাচার তিনি খুব সরল ভাষায় ফুটিয়ে তুলতেন।
আমার মনে আছে, ১৯৮৮ সাল। আমরা ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী। মফস্বলে থাকি। আমাদের স্বপ্ন, আমরা সমাজ পাল্টে দেব। আমরা গ্রামে গ্রামে ক্ষেত মজুরদের সংগঠিত করছি, শ্রমিকদের সংগঠিত করছি, জনগণের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ বাড়াচ্ছি। আন্দোলন-সংগ্রাম-সংগঠন একসঙ্গে এগিয়ে চলছে। '৮৭-র এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আমাদের কমরেডরা মূলশক্তি। কেন্দ্র থেকে প্রান্তে।
ফলে জেল-হুলিয়া-নির্যাতনেও আমাদের কমরেডরা পুলিশের প্রথম টার্গেট। আমাদের বাগেরহাটেও পুলিশ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। বাড়ি বাড়ি হানা দিচ্ছে, কমরেড মৃণ্ময় মণ্ডল, ছাত্রনেতা কামরুজ্জামান গ্রেফতার। কাজী সোহরাব, অ্যাডভোকেট হাবিবুর রহমানসহ অনেকে পলাতক জীবনে। আমরা থানা শহরে থাকি, চাপ আছে তবুও আমরা ছুটে চলি- দিনে ছাত্রদের মাঝে কাজ করি, রাতে গ্রাম বৈঠক। আমাদের শক্তি বাড়ছে। আমরা ছড়িয়ে পড়ছি, ২০০০ সালের মধ্যে দৃশ্যমান শক্তি হিসেবে আমাদের পার্টিকে দাঁড় করতে হবে। আমরা মানুষের কাছে আমাদের কথা নিয়ে যাব।
১৯৮৮ সাল। তারিখটা মনে নেই, জসিম উদ্দিন মণ্ডল আমাদের এলাকায় এলেন। পরদিন জনসভা। মনে আছে, তরুণ কর্মী হিসেবে আমরা কয়েকজন মাইকিং করছিলাম। তিনি আমাদের ডাকলেন। বললেন, মাইকিংয়ের ধরন পাল্টাও। কে বক্তৃতা করবে সেটা গুরুত্বপূর্ণ না, জনসভায় কী বিষয়ে কথা হবে সেটা বলো। মনে আছে, তিনি বললেন, এরশাদ কেন যাচ্ছে না, চালের দাম কেন কমছে না, চাষি কেন পাটের দাম পায় না- এ বিষয়ে জনসভায় কথা বলা হবে। আমরা সেভাবে প্রচার করলাম। পরদিন তিনি বক্তৃতা দিলেন প্রায় দুই ঘণ্টা। আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনলাম। যেন আমরা প্রশিক্ষণ নিচ্ছি। তখন পর্যন্ত ছোটদের রাজনীতি-অর্থনীতির মতো বই পড়া শেষ করা তার বক্তৃতায় বুঝতে পেরেছিলাম, পৃথিবীর ইতিহাস আসলে শ্রেণি-সংগ্রামের ইতিহাস। পৃথিবীতে আসলেই দুটি শ্রেণি। ধনী ও গরিব। ধনী গরিবকে ঠকায়, শোষণ করে। একটি সমাজ গড়ে ওঠে, সভ্যতা গড়ে ওঠে শ্রমজীবীদের রক্ত আর ঘামে। অথচ সেই সভ্যতার সব থেকে বঞ্চিত জনগোষ্ঠী এরাই।
যারা তার বক্তব্য শুনেছেন তারা জানেন, আমাদের সমাজে আমাদের চোখের সামনে মানুষ মানুষকে কীভাবে শোষণ করছে, ধর্মের নামে, বর্ণের নামে বিভাজন ছড়িয়ে। তা তিনি বলতেন জীবনঘনিষ্ঠ ভাষায়। দেখেছি দু-একজন পণ্ডিত তার ভাষার ব্যবহার নিয়ে পেছনে আহ-উহ করেছেন। তিনি গেয়ো ভাষায় বক্তব্য দেন বলে। কিন্তু এটা তো ঠিক, বহু পণ্ডিত মার্কসবাদ নিয়ে ভলিউম লিখেছেন। কিন্তু এরা মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারেননি। যে শ্রমজীবী মানুষের জন্য আমরা রাজনীতি করি বলে দাবি করি, জসিম উদ্দিন মণ্ডল তাদের নেতা ছিলেন। এরা জসিম উদ্দিন মণ্ডলকে নেতা হিসেবে ভালোবেসেছেন।
আমরা কি বলতে পারব, তার মতো আর কেউ সহজ ভাষায় মার্কসবাদ, লেনিনবাদ বা বস্তুবাদকে শ্রমজীবী মানুষের কাছে কে তুলে ধরতে পেরেছে? খেয়াল করুন- 'আমার ফরিদপুরের পাটচাষি পাট বোনে, পাট ক্ষেত নিড়ায়, তার পায়ে জোঁক লাগে, ছটাক ছটাক রক্ত খায়। পাট বেচে সেই চাষি পায় ২০০ টাকা আর যে মতিঝিলে সাততলার পরে বসে ইনডেন্টিং ব্যবসা করে, পাটও দেখে না, জোঁকও দেখে না, সে পায় ৮০০ টাকা। এই ব্যবস্থা আমরা ভাঙতে চাই।' আবার তিনি বলেছেন, 'আমি শ্রমিকের বাড়িতে যাই, আমার শ্রমিক বলে, জসিম ভাই, আমি বিস্কুট কারখানায় কাজ করি, রাতে বাসায় ফিরলে আমার ছেলে বলে, বাপ তোর গায়ে এত ঘ্রাণ কেন? কিসের ঘ্রাণ? আমার জন্য একটা বিস্কুট আনতে পারিস নাঙ্ঘ তুই কেমন বাপঙ্ঘ' সমাজের বৈষম্য, শ্রমজীবী মানুষের জীবনের হাহাকার এভাবে কে তুলে ধরতে পেরেছে? এত সহজ করে শোষণ আর তাকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টার উদাহরণ আর কে দিতে পারত?
তিনি বক্তা ছিলেন, নেতা ছিলেন, শিক্ষক ছিলেন। ছিলেন মার্কসবাদী আর তার শিক্ষক। তার বক্তব্য শুনে অনেকে মার্কসবাদ বুঝত। তিনি ছিলেন নিজের জীবনের পাঠশালায় স্বশিক্ষিত এক বিপল্গবী। নিজের জীবন দিয়ে দেখেছেন তার সময়ে সমাজের বৈষম্য। তিনি সেই বৈষম্য দূর করতে সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করেছেন, রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করেছেন, কমিউনিস্ট পার্টি বেছে নিয়েছেন। তিনি ছোটবেলায় বুঝতে শিখেছেন, এই সমাজ আমাদের ভাত দেয় না, এই সমাজ আমাদের মধ্যে শোষক আর শোষিত সৃষ্টি করে। সেই সমাজকে টিকিয়ে রাখা মানেই শোষণকে টিকিয়ে রাখা। তিনি বিশ্বাস করতেন- সমাজ বদলের একমাত্র হাতিয়ার হলো রাজনীতি। বিপল্গব ছাড়া মুক্তির পথ নেই। তিনি জানতেন, সমাজ পাল্টাতে হলে একটি শক্তিশালী শ্রেণি-সংগ্রামের পার্টি দরকার। তিনি সেই পার্টি বেছে নিতে পেরেছিলেন। তিনি পার্টিকে ভালোবাসতেন। সে জন্য যখন তার পার্টিকে ১৯৯৩ সালে পার্টির ভেতর থেকে বিলুপ্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তিনি তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। তার সময়ের অনেকে রাজনীতির সুবিধা নিতে উল্টো দিকে ছুটেছেন। তিনি ছোটেননি। যে দেশের জন্য ত্যাগের যে জীবন তিনি বেছে নিয়েছিলেন, সেই বাল্যকালে সেখান থেকে সরেননি।
কমরেড জসিম উদ্দিন মণ্ডল বুকে সমাজ বদলের স্বপ্ন ধারণ করতেন। জেলজীবন-আত্মগোপন-জেলে অনশন সব ছিল মানুষের জন্য। তিনি জানতেন, স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য একটা শক্তিশালী পার্টি দরকার। সে জন্য তিনি ছুটেছেন দেশের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত। মানুষের কাছে, যে মানুষ ছিল তার রাজনীতির নায়ক। বিদ্যমান শোষণ কাঠামোর সমাজ পরিবর্তনের জন্য আরও শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তোলা এবং তাকে জয়ী করার মাধ্যমে আমরা তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাব।
কমরেড জসিম উদ্দিন মণ্ডল, লাল সালাম।
সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন