স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

নাগরিকদের অভিযোগ আমলে নিন

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২০     আপডেট: ১১ জুলাই ২০২০

সম্পাদকীয়

করোনা দুর্যোগ যখন মানুষকে গভীর সংকটে নিপতিত করেছে, তখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দায়িত্বশীলদের উদাসীনতা, দায়িত্বহীনতা, অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কে সজাগ-সতর্ক না হওয়ার বিষয়টি বিস্ময়কর ও যুগপৎ প্রশ্নবোধক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও এর নিয়ন্ত্রণাধীন কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম-দুর্নীতির বিরূপ চিত্র ফের উঠে এসেছে শুক্রবার সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনে। মহামারি ও দুর্যোগকালীন সংকটকে পুঁজি করে জেকেজি হেলথ কেয়ারের পর এখন দেশব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রিজেন্ট হাসপাতালের স্বত্বাধিকারী মো. শাহেদের নাম। কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে যেন সাপ বেরিয়েছে!

করোনা দুর্যোগ সংকটে দুষ্টচক্র কীভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, নানা অপতৎপরতার জাল কীভাবে বিস্তৃত করে চলেছে- জেকেজি ও রিজেন্টের প্রতারণা তারই নিকৃষ্ট নজির। মরণব্যাধি করোনা সংক্রমণে পরীক্ষার নামে ভুয়া সনদ বাণিজ্য থেকে শুরু করে কত ন্যক্কারজনক কাজই না করেছে রিজেন্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। শুধু এ দুটি প্রতিষ্ঠানই নয়, আরও অনেক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি এ রকম অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যেন 'মধুচাক'! আরও বিস্ময়কর হলো- করোনা-দুর্যোগকে পুঁজি করে কেনাকাটা থেকে নিয়োগ পর্যন্ত নগ্ন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কোনো কিছুই আমলে নেয়নি, দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকারের দায় বোধ করেনি।

সংবাদমাধ্যমে একের পর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত ও প্রচারিত হলেও দুর্নীতিবাজরা কী করে স্বপদে বহাল রইল- এ প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এড়াতে পারেন না। আমরা আরও প্রশ্ন রাখতে চাই- স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কি কোনো অভিভাবকহীন প্রতিষ্ঠান? আরও অভিযোগ আছে, জেকেজি ও রিজেন্ট হাসপাতাল থেকে শুরু করে করোনাকালে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের ঘনিষ্ঠজন। আমরা জানি, অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের 'শূন্য সহিষুষ্ণতা'র অঙ্গীকার রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী পুনর্বার বলেছেন, অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা বিশ্বাস করি তার সরকার নির্মোহ অবস্থান নিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মতো এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিভাগে সিন্ডিকেট গড়ে যারা দুর্নীতির মহোৎসব চালিয়েছে, তারা কোনোভাবেই পার পেতে পারে না। করোনার নমুনা পরীক্ষা নিয়ে রিজেন্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রতারণার বিষয়টি গত মাসের প্রথম দিকে নজরে আসে নিপসমের পরিচালকের। বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে জানালেও তিনি রহস্যজনকভাবে মৌন থাকেন। আমরা মনে করি, যারা মহামারিকালে সংকটকে পুঁজি করে নিজেদের উদরপূর্তি করেছে, তারা মানুষের মিত্র হতে পারে না। তারা কোনোভাবেই ছাড়ও পেতে পারে না।

আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে- এত কেলেঙ্কারির অভিযোগের পরও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দায়িত্বশীলদের কানে পানি ঢোকেনি কেন? জেকেজি ও রিজেন্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনিয়ম-দুর্নীতি একই সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে সংঘটিত অন্যান্য নেতিবাচকতার আশু যথাযথ প্রতিকারেই রয়েছে প্রতিবিধান। এত বড় কেলেঙ্কারির উপযুক্ত প্রতিকার নিশ্চিত করতে হাত দিতে হবে উৎসে। করোনা দুর্যোগের মর্মন্তুদতা যেখানে মানবতার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে, সেখানে এ মরণব্যাধিকালীন সংকটকে পুঁজি করে যারা এত নগ্ন দুর্নীতি ও প্রতারণা করেছে, তারা সভ্যতারও শত্রু।

করোনা দুর্যোগের মতো প্রায় বিশ্বব্যাপী অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ে যেভাবে প্রতারকরা জীবন নিয়ে জুয়া খেলেছে, সরকারি অর্থ লুটপাট করেছে, তা ধিক্কারের। রিজেন্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রতারণা আরও একটি বিষয় পরিস্কার করে দিয়েছে- এতদিন হাসপাতাল নামের এসব প্রতারণা কেন্দ্র স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্পূর্ণ তদারকি-নজরদারির বাইরে ছিল। এখন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কেউ কেউ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওপর দায় চাপিয়ে নিস্কৃতি পেতে চাইছে। কিন্তু তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আমরা চাই, এসব জালিয়াতি ও অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের কঠোর শাস্তি হোক।

রোগ যেহেতু গুরুতর, সেহেতু কোনো টোটকা দাওয়াইয়ে কাজ হবে না। প্রতারকদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্তরে স্তরে গভীর দৃষ্টি দিতে হবে। দুস্কর্মকারীরা যেন কোনো রকম অনুকম্পা না পায়। এরা সভ্যতার শত্রু, মানবতার শত্রু। এদের শিকড় উপড়ে ফেলতেই হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কেন এতসব অভিযাগ উপেক্ষা করল- তারও উৎস সন্ধান করতে হবে। রোগাক্রান্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ সারানোই এখন দায়।