সামাজিক সহিংসতা

আইনশৃঙ্খলায় অবহেলা নয়

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২০     আপডেট: ০৭ জুন ২০২০

করোনা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্ব বহুলাংশে থমকে আছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু তাতে করে এই নিশ্চয়তা দেওয়ার অবকাশ নেই যে, অপরাধী ও সমাজবিরোধীরাও হাত-পা গুটিয়ে বসে আছে। শনিবার সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, মাত্র ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১০ জন খুন হয়েছেন। যে কোনো হতাহতই অনাকাঙ্ক্ষিত এবং একটি মৃত্যুও গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু খুনের এই সংখ্যা কেবল সংখ্যাগত দিক থেকেই উদ্বেগজনক। এসব খুনের কারণ ভিন্ন ভিন্ন হলেও অভিন্ন যে দিকটি নির্দেশ করে তা হচ্ছে, সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি। এই আশঙ্কাও অমূলক হতে পারে না যে, খুন পর্যন্ত না গড়ানো আরও অনেক অপরাধ সংবাদমাধ্যম বা সমাজের চোখ এড়িয়ে গেছে। এমনকি বড় ধরনের অপরাধের খবরও করোনা পরিস্থিতির কারণে জনপরিসরে পৌঁছাতে বিলম্ব হচ্ছে। ভুলে যাওয়া চলবে না, গৃহ-সহিংসতার কথাও। সহযোগী একটি দৈনিকে শনিবার প্রকাশিত অপর এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, শুধু মার্চের তৃতীয় সপ্তাহের পর থেকে কেবল ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অন্তত ২০০ মামলা হয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন-সংক্রান্ত। বলা বাহুল্য, সব নির্যাতনের অঘটন আদালত পর্যন্ত গড়ায় না। করোনা পরিস্থিতিতে সেই হার আরও কমা স্বাভাবিক। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে দেশের মাত্র একটি নগরীতে নির্যাতন ও সহিংসতার চিত্র খানিকটা অনুধাবন করা যায়।

আমরা দেখছি, দেশে সীমিত পরিসরে কলকারখানা, সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, গণপরিবহন চালু হয়েছে। কিন্তু এখনও ঘরে অবস্থান করছেন- এমন নাগরিকের সংখ্যা কম নয়। বিশেষত যাদের সুনির্দিষ্ট চাকরি বা ব্যবসা-বাণিজ্য নেই, তারা দিনের বেশিরভাগ সময় ঘরে অবস্থান করছেন। মাত্র ২৪ ঘণ্টায় ১০ খুনের অঘটনে দেখা যাচ্ছে, ঘরে অবস্থান করা এমন কয়েকজন নাগরিক খুনের শিকার হয়েছেন। প্রকাশ্য স্থানেও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে অন্তত দু'জনকে। এসব অঘটন চোর, ডাকাত ও সন্ত্রাসীদের বেপরোয়া মনোভাবই স্পষ্ট করে। প্রশাসন ও পুলিশের বড় অংশ যখন করোনা মোকাবিলা-সংক্রান্ত সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়নে নিয়োজিত; আদালতও যখন ভার্চুয়াল ব্যবস্থায় সীমিত পরিসরে পরিচালিত হচ্ছে; সমাজের নজরদারি ও তদারকি যখন ঘরবন্দি; অপরাধীরা সেই সুযোগটিই গ্রহণ করছে। আমাদের মনে আছে, কিছুদিন আগে সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছিল, খোদ রাজধানীতে ছিনতাইয়ের বাড়বাড়ন্ত। তখন এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে আমরা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলাম যে, সময়ের এক ফোঁড় না দিলে অপরাধ বাড়তেই থাকবে। বস্তুত দুর্যোগ ও মহামারির ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের যে অপচেষ্টা যুগে যুগে দেশে দেশেই হয়ে এসেছে, বর্তমান অপরাধ চিত্র তা থেকে ভিন্ন নয়। আমরা মনে করি, করোনা পরিস্থিতি সত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়ার অবকাশ নেই। ঘরের মধ্যে সংঘটিত সব অপরাধ আগাম প্রতিরোধের ব্যবস্থা কঠিন, মানতে হবে। কিন্তু অপরাধ-পরবর্তী কঠোর পদক্ষেপ একই ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে হতে পারে কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা।

অতীতে আমরা বিভিন্ন সময় দেখেছি যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে দিলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং অপরাধীকে কাঠগড়ায় তোলা সহজ হয়। করোনা পরিস্থিতিতে থানাসহ নাগরিক প্রতিকারের গন্তব্যগুলো যখন আরও দুর্গম হয়ে পড়েছে, তখন আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত ব্যাপারে শূন্য সহিষ্ণুতার বিকল্প নেই। আমরা জানি, করোনা পরিস্থিতি বর্তমান সরকারের জন্যও প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে যদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়, তাহলে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা রক্ষার কাজ আরও কঠিন হয় পড়বে। এ ক্ষেত্রে আমরা দেখতে চাইব, এই সময়ে যে কোনো অপরাধের প্রতিকার যেন রাজনৈতিক প্রভাবে বিঘ্নিত না হয়। স্বাভাবিক সময়েও আমরা এমন অনাকঙ্ক্ষিত প্রভাব চাই না। কিন্তু এখন তা সবচেয়ে জরুরি রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও সুরক্ষার স্বার্থেই। আমরা বিশ্বাস করি, করোনাকালে 'মানবিক মুখ' দেখানো পুলিশকে যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া যায়, তাহলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আসবেই। একই সঙ্গে ঘরবন্দি পরিস্থিতির মধ্যেও সমাজকে যথাসম্ভব সতর্ক ও সচেতন থাকতে বলি আমরা। কোথাও কোনো অপরাধ বা অপরাধের আশঙ্কা দেখলে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে জানাতে দ্বিধার অবকাশ নেই। মনে রাখতে হবে, অপরাধীরা যদি পার চেয়ে যেতে থাকে, তাহলে কেউই ভালো থাকতে পারব না। পাশাপাশি যত দ্রুত সম্ভব স্বাভাবিক জীবন ও জনস্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনতে সবাইকে কাজ করতে হবে। মহামারি পরিস্থিতি যত দীর্ঘায়িত হবে, অন্ধকারের ছায়া তত গাঢ় হতে থাকবে।