আবার বাসচাপা!

বাবার পর ছেলে নিছক 'নিয়তি' নয়

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯

সড়ক-মহাসড়কে তো বটেই, খোদ রাজধানীতেও যাত্রীবাহী বাসের বেপরোয়া গতি নিয়ে আমাদের বিক্ষোভ পুরনো। এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে আমরা বিভিন্ন সময় বিস্ময়ও প্রকাশ করেছি। কোনো কিছুতেই বাগে আসছে না কেন বাসচালকরা! আর কিছু না হোক, সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই আহতদের আর্তনাদ কিংবা নিহতের স্বজনের আহাজারি কি তাদের নজরে পড়ে না? বাস দুর্ঘটনায় হতাহত নিয়ে নাগরিকদের বেদনাও কি স্পর্শ করে না তাদের? কিন্তু শনিবার রাজধানীর তুরাগের ধউর এলাকায় কলেজ শিক্ষার্থী ইয়াসির আলভী রব আহত হওয়ার অঘটনের কাছে যেন সব প্রশ্ন বোবা হয়ে যায়। মাত্র বৃহস্পতিবার ওই তরুণের পিতা কণ্ঠশিল্পী পারভেজ রব উত্তরায় বাসচাপায় নিহত হয়েছিলেন। আলভী যাচ্ছিলেন বাবার কুলখানির সামগ্রী কেনাকাটার জন্য। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আমরা 'নিয়তির নির্মম পরিহাস' লিখে অভ্যস্ত। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এমন আধ্যাত্মিকতার আশ্রয় নেওয়ার অবকাশ সামান্য। আমরা একই সঙ্গে গভীর বেদনা, বিস্ময় ও বিক্ষোভের সঙ্গে দেখছি, পিতা নিহত ও পুত্র আহত হওয়ার স্থান ও কাল ভিন্ন হলেও ঘাতক পাত্র অভিন্ন। দু'জনকেই চাপা দিয়েছে ঢাকা ও গাজীপুরের মধ্যে চলাচলকারী ভিক্টর পরিবহনের দুটি বাস। এমন নিদারুণ 'কাকতাল' আমরা এর আগে কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ে না। 'দুর্ঘটনা' দুটির মধ্যে সাযুজ্য যা-ই থাকুক না কেন, আমরা এটাকে নিছক 'নিয়তি' মনে করি না। করার কোনো কারণও নেই। আলভী কোনোরকমে প্রাণে বেঁচে গেলেও সঙ্গে থাকা বন্ধু মেহেদী হাসান ছোটন নিহত হয়েছেন। একই মর্মান্তিক পরিণতি হতে পারত আলভীরও। বস্তুত মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে যখন বাসচাপায় পিতা নিহত ও পুত্র আহত হয়, তার চেয়ে মর্মান্তিক আর কী হতে পারে? এটাও কম মর্মান্তিক নয় যে, দেশের সুপরিচিত একজন সঙ্গীতশিল্পী বাসচাপায় নিহত হওয়ার পর ওই পরিবহনের মালিকরা 'সমঝোতা' বৈঠকে গিয়ে দায়সারা ক্ষতিপূরণ দিতে চেয়েছেন। নিহতদের স্বজনের ওপর তৈরি করেছে নানা চাপ। এমন প্রেক্ষাপটে এই আশঙ্কা অমূলক হতে পারে না যে, আগের দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণের বদলে পাল্টা চাপ তৈরি করতে গিয়েই পরের দুর্ঘটনা ঘটানো হয়েছে। যদি সত্যিকারের কাকতালও হয়, পরের দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়েছে যে, ভিক্টর পরিবহনের চালকরা বেপরোয়াভাবে বাস চালানোতেই অভ্যস্ত। আমরা মনে করি, এই দুই দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে পরিবহন কোম্পানিটি সভ্য সমাজের রাজপথে বাস চালনার যোগ্যতা হারিয়েছে। ক্ষতিপূরণে টালবাহানা এবং ফের একই পরিবারের আরেকজনকে চাপা দেওয়ার মধ্য দিয়ে পরিবহনটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অপরাধী মনোবৃত্তিও আমাদের কাছে স্পষ্ট। আমরা দেখতে চাইব, অবিলম্বে পরিবহন কোম্পানিটির ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাদের সব চালক-হেলপারের লাইসেন্স, সব বাসের ফিটনেস পরীক্ষা করা হয়েছে। ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে তারও আগে। কেবল নিহত পিতা ও আহত পুত্রের নয়, দ্বিতীয় দুর্ঘটনায় নিহত বন্ধুটির পরিবারেরও অধিকার আছে অন্তত ক্ষতিপূরণ পাওয়ার। আর ঘাতক চালক ও হেলপারের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানোর স্বার্থেই।