বেসরকারি পর্যায়ে প্রাথমিকভাবে দুই লাখ টন সিদ্ধ চাল রফতানির অনুমোদন দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়- বৃহস্পতিবার সমকালে প্রকাশিত এই খবর মিশ্র তাৎপর্য বহন করে। একসময় খাদ্যশস্যের ক্ষেত্রে আমরা আমদানিনির্ভর ছিলাম, পরবর্তী সময়ে এই খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি সত্য; কিন্তু রফতানি করার মতো খাদ্যশস্য উদ্বৃত্ত রয়েছে কি? স্বীকার করতে হবে, সিদ্ধ চাল রফতানির এ সিদ্ধান্ত হঠাৎ করে গৃহীত হয়নি। আমরা দেখেছি, খাদ্যমন্ত্রী বিভিন্ন সময়েই বলেছেন যে ১০-১৫ লাখ টন চাল রফতানি করা যেতে পারে। অর্থমন্ত্রী আরও জোর দিয়ে জাতীয় সংসদে বলেছেন, প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়ে চাল রফতানি করা হবে। আমাদের প্রশ্ন, চাল রফতানিতে এতটা জোর দেওয়ার যুক্তি কী? আমরা জানি, বর্তমান রফতানি নীতি অনুযায়ী কেবল সরকার থেকে সরকার পর্যায়ে চাল রফতানি চলতে পারে। বস্তুত ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ও শ্রীলংকা সরকারের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতেই ৫০ হাজার টন চাল রফতানি করা হয়েছিল। এ ছাড়া বেসরকারি পর্যায়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি সাপেক্ষে সুগন্ধি চাল রফতানি করা যেতে পারে। কিন্তু নানা কারণেই সেই পরিমাণ খুব বেশি নয়। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, কৃষক পর্যায়ে 'ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে' এবার সাধারণ চাল রফতানি করা হচ্ছে। এই যুক্তি আমাদের কাছে খোঁড়াই মনে হয়। কারণ চাল রফতানির সুযোগ পাবেন ব্যবসায়ীরা, কৃষক নয়। আর ভরা মৌসুমে বেশিরভাগ কৃষক কীভাবে উৎপাদন খরচের চেয়েও কম মূল্যে মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে, আমরা ভুলে যাইনি। পাশাপাশি ধান উৎপাদনের ধারাবাহিকতাও বিবেচনা করতে হবে। আমাদের মনে আছে, শ্রীলংকায় সরকারিভাবে চাল রফতানি-পরবর্তী বছরগুলোতে বারংবার বেসরকারিভাবেও রফতানির দাবি উঠেছিল। কিন্তু গত বছর ও তার আগের বছর ধান উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দেওয়ায় সেই দাবি স্তিমিত হয়েছিল। আবার এক মৌসুমে ধানের ভালো উৎপাদন দেখেই চাল রফতানির সিদ্ধান্ত নেওয়া কি ঠিক হবে? বস্তুত গত এক দশকে ধানের উৎপাদন কখনও স্থিতিশীল ছিল না। এ ছাড়া বোরো মৌসুম ভালো গেলেও দেশে ইতিমধ্যে বন্যা দেখা দিয়েছে। এর জের ধরে আমন মৌসুম কেমন হবে, আমরা জানি না। তার আগেই সাধারণ চাল রফতানির সিদ্ধান্ত আমাদের কাছে দূরদর্শী মনে হয় না। এতে কৃষকের লাভের চেয়ে চালকল মালিক ও চাল ব্যবসায়ীদের পোয়াবারোর সম্ভাবনাই স্পষ্ট। চাল রফতানি হলে দেশীয় ভোক্তাদের ওপর চাপের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আমরাও নিশ্চয়ই চাই দেশে রফতানি বাড়ূক, চাল ব্যবসায়ীদের মুনাফা নিয়েও আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু কৃষক ঠকিয়ে তাদেরই নাম করে মধ্যস্বত্বভোগীদের সুবিধা দেওয়া কেন? কোনোক্রমেই খাদ্যশস্যের মজুদ ও খাদ্য নিরাপত্তায় ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। আর সবার আগে ভাবতে হবে কৃষকের স্বার্থ।

মন্তব্য করুন