রোহিঙ্গা সংকট

ঢাকার পাশেই থাকুক বেইজিং

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০১৯

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবারের চীন সফরে দুই দেশের মধ্যে নয়টি চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে; যদিও সফরের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সেখানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে অংশগ্রহণ। এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই যে, সফরের মূল লক্ষ্য ছিল রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বেইজিংকে ঢাকার আরও কাছাকাছি পাওয়া। আমরা মনে করি, প্রাথমিকভাবে সে সাফল্য পাওয়া গেছে। আমরা দেখছি, চীনের দুই শীর্ষ নেতৃত্বই- প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট এ ব্যাপারে ইতিবাচক অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। রোহিঙ্গা সমস্যার যে দ্রুততর সমাধান প্রয়োজন, এ ব্যাপারে তারাও একমত পোষণ করেছেন। বিশেষত চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং স্পষ্ট করে বলেছেন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয়ই চীনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। বন্ধুত্বের মাত্রায় দুই দেশের মধ্যে তারা কোনো পার্থক্য করেন না। অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক কৌশলগত দিক থেকে বেইজিংয়ের কাছে ঢাকা ও নেপিদোর সমান গুরুত্ব আমরাও অস্বীকার করি না। কিন্তু রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে 'ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান' কতটা যৌক্তিক, সে প্রশ্ন তুলতেই হবে। কারণ এ ক্ষেত্রে স্পষ্টতই মিয়ানমার সরকার একটি অযৌক্তিক অবস্থান গ্রহণ করেছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়নের ক্ষেত্রেই কেবল দেশটির সেনাবাহিনী ও উগ্র জাতীয়তাবাদীরা জড়িত ছিল না, খোদ অং সান সু চিও অগ্রহণযোগ্য অবস্থান নিয়েছেন। বিপরীতে বাংলাদেশ কেবল বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয়ই দেয়নি, তাদের সুষ্ঠু প্রত্যাবর্তনে সর্বোচ্চ সদিচ্ছা ও ছাড়ও দিয়ে চলছে। আরও দুর্ভাগ্যজনক, রোহিঙ্গা নিপীড়নের বিরুদ্ধে এবং তাদের প্রত্যাবর্তনের পক্ষে যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছে, তখন বেইজিংই মিয়ানমারের 'প্রশ্নহীন সমর্থক' হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অথচ, আমাদের মনে আছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ সত্ত্বেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন নিয়ে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে অপ্রত্যাশিতভাবে মিয়ানমারের সঙ্গে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করেছিল বাংলাদেশ।

এই চুক্তির ক্ষেত্রে তখন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছিল চীন। ওই চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত প্রত্যাবর্তন শুরু হওয়ার কথা ছিল গত বছরের নভেম্বর থেকে। আমরা গভীর হতাশার সঙ্গে দেখেছি, সেই প্রক্রিয়া আর অগ্রসর হয়নি মূলত মিয়ানমারের দায়সারা সাড়া এবং রাখাইনের পরিস্থিতি উন্নয়নে আন্তরিক না হওয়ার কারণে। আমরা মনে করি, এমন পরিস্থিতিতে ঢাকার পাশে দাঁড়িয়ে নেপিদোকে কূটনৈতিক চাপ দেওয়া বেইজিংয়ের অবশ্য কর্তব্য। নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের প্রতি আমাদের সহানুভূতির অভাব নেই; কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সীমিত সম্পদ ও ভূমির দেশ বাংলাদেশের পক্ষে এই বিপুল শরণার্থীকে অনির্দিষ্টকালের জন্য আশ্রয় দেওয়ার সুযোগ নেই। আমরা স্বীকার করি, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের রয়েছে এক ঐতিহাসিক সম্পর্ক। আমরা দেখেছি, স্বাধীনতার পরপরই দেশটি বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে। যত দিন গেছে, দুই দেশের অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গা সংকটে বেইজিং যদি ঢাকার ন্যায্য অবস্থানকে কার্যকর সমর্থন না দেয়, তাহলে 'বিপদে বন্ধুর পরিচয়' কীভাবে পাওয়া যাবে?