বরিশাল নৌবন্দর নামেই আধুনিক

দখল-দূষণে পরিবেশ বিপর্যস্ত

প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০১৯      

সুমন চৌধুরী, বরিশাল

ব্যাংকার জুবাইর আহমেদ দিবা সার্ভিসের নৌযান গ্রিন লাইনে সোমবার দুপুর সোয়া ২টায় ঢাকা থেকে বরিশাল নৌবন্দরে পৌঁছেন। বন্দর এলাকার দুর্গন্ধে নৌযান থেকে তাকে নামতে হয়েছে রুমালে নাক চেপে। তার মতো সব যাত্রীকে প্রতিদিন বরিশাল নৌবন্দরে এমন অসহনীয় দুর্গন্ধের মুখে পড়তে হয়। শুধু দুর্গন্ধ নয়, নৌবন্দরের সামনের জায়গা দখল হওয়ায় ওই এলাকায় ঢুকতে কিংবা বের হতে যাত্রীদের বেগ পেতে হয়। দখল ও দূষণে বরিশাল নৌবন্দর এলাকা এখন নগর নৌযানের যাত্রীদের দুর্ভোগের কারণ হয়ে হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বন্দরটির পোশাকি নাম 'বরিশাল আধুনিক নৌবন্দর' হলেও আধুনিকতার বিন্দুমাত্র ছোঁয়া নেই সেখানে। বরং প্রথমবারের মতো যদি কেউ নৌপথে বরিশালে আসেন, তাহলে নৌবন্দর এলাকার শ্রী দেখেই পুরো বরিশাল নিয়ে নেতিবাচক ধারণা হবে তার। অভিযোগ রয়েছে, শ্রমিক লীগ, ঘাট শ্রমিক লীগসহ ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা নৌবন্দরের জমি দখল করে অস্থায়ী স্থাপনা তৈরি করে ভাড়া দিয়েছেন। বন্দর এলাকার মধ্যে করা হয়েছে সবজির পাইকারি বাজার, কাঁচাবাজার ও হাঁস-মুরগির বাজার। সেখান থেকে উত্তোলনের টাকার একটি ভাগ পান বিআইডব্লিউটিএর কিছু কর্মকর্তাও।

সরেজমিন দেখা গেছে, মূল নদীবন্দর এলাকায় প্রবেশের সবক'টি সড়ক দখল করেছেন ভাসমান ব্যবসায়ীরা। সড়কগুলোর অবস্থাও বেহাল। বন্দরের দক্ষিণাংশের জমি সিটি করপোরেশন ইজারা নিয়ে কয়েক বছর আগে সবজির পাইকারি বাজার করেছে। সবজি ব্যবসায়ীদের নির্ধারিত আধাপাকা স্টল থাকলেও তারা পুরো সড়ক দখলে নিয়ে সবজি স্তূপ করে রাখেন। নিয়মিত পরিস্কার না করায় যত্রতত্র ছড়িয়ে- ছিটিয়ে থাকা সবজির উচ্ছিষ্ট অংশের পচা দুর্গন্ধে ওই এলাকায় দাঁড়ানো যায় না। এ বাজার-সংলগ্ন বিআইডব্লিউটিসির স্টিমারঘাট। দিনে স্টিমার না থাকায় ওই পন্টুনে ভেড়ানো হয় দিবা সার্ভিস গ্রিন লাইনের লঞ্চ। স্টিমার ও গ্রিন লাইনের যাত্রীদের ময়লা পেরিয়ে রুমালে নাক চেপে নৌযানে ওঠানামা করতে হয়।

সবজি ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেনের কাছে সেখানকার দুর্গন্ধময় অবস্থার কথা জানতে চাইলে তিনি স্বীকার করেন, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এলাকাটি পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যবস্থা নেবেন।

সবজির পাইকারি বাজার ও নৌবন্দর ভবনের মাঝের এলাকাটি চরকাউয়া খেয়াঘাট নামে পরিচিত। কীর্তনখোলার পূর্ব তীরে বরিশাল সদর ও বাকেরগঞ্জ উপজেলার একাংশ এবং পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার মানুষ এ খেয়াঘাট দিয়ে যাতায়াত করেন। প্রতিদিন কমপক্ষে ৫০ হাজার মানুষ এ জায়গা দিয়ে যাতায়াত করায় এটি বরিশালের একটি গুরুত্বপূর্ণ খেয়াঘাটে পরিণত হয়েছে। খেয়াঘাট এলাকায় প্রবেশের পথ ছাড়া সবটুকু দখল করে ভাসমান ব্যবসায়ীদের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। ফলে দিন-রাত এখানে যানজট লেগেই থাকে।

খেয়াঘাট এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে অনুমোদনহীন একটি কাঁচাবাজার ও হাঁস-মুরগির বাজার। ফলে দোকান, রেস্তোরাঁসহ ভাসমান ব্যবসায়ীরা দখল করে রেখেছেন সড়কের বেশিরভাগ অংশ। জানা গেছে, বিআইডব্লিউটিএর জমি দখল করে ভাসমান ব্যবসায়ীদের ভাড়া দিয়েছেন ঘাট শ্রমিক লীগ ও শ্রমিক লীগের কিছু নেতা। কীর্তনখোলার পূর্বতীরে সাহেবেরহাট বন্দরে শহীদ জিয়াউর রহমান কলেজের সহকারী অধ্যাপক মাহবুবা খানম খুশবু। তিনি খেয়া পাড়ি দিয়ে প্রতিদিন বরিশাল নগরী থেকে কর্মস্থলে যান। খুশবু বলেন, চরকাউয়া খেয়াঘাট দিয়ে যাতায়াত করা এক অসহনীয় ব্যাপার। দিনের শুরুতেই সেখানে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। ফুটপাত দখলের কারণে সেখান দিয়ে হেঁটে চলাও দায়। দুর্গন্ধ তো আছেই।

কীর্তনখোলার পূর্বতীরের বাসিন্দাদের স্বার্থ সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করছে পূর্বাঞ্চলীয় উন্নয়ন পরিষদ নামের একটি সংগঠন। এ সংগঠনের আহ্বায়ক মুনাওয়ারুল ইসলাম অলি বলেন, নৌবন্দরে দূষণ অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। কাঁচাবাজারের কারণে বন্দরের আশপাশে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। সড়ক দখল করেছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। স্টিমারঘাট মসজিদের পয়ঃনিস্কাশনও নদীর সঙ্গে যুক্ত। কসাইরা গরু জবাই করে কীর্তনখোলায় ফেলছে। তিনি এসবের জন্য বন্দর কর্মকর্তা আজমল হুদা মিঠুর ব্যর্থতাকে দায়ী করেছেন।

তবে বন্দরের পুরো বিষয় নিয়ে বন্দর কর্মকর্তা আজমল হোসেন মিঠু বলেন, বিভিন্ন নেতার নামে বন্দর এলাকায় অবৈধ স্থাপনা করা হলেও তিনি তাৎক্ষণিক সেগুলো উচ্ছেদ করেন। সবজির পাইকারি বাজার প্রসঙ্গে বলেন, বন্দর কর্তৃপক্ষ সেখান থেকে ভাড়া পাচ্ছে না। সেখানকার পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করলেও এ বিষয়ে বেশি কিছু বলতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন। চরকাউয়া খেয়াঘাটের কাঁচাবাজারের ভাড়া পেলেও অন্য স্থাপনাগুলো অবৈধ বলে তিনি স্বীকার করেন। বন্দর কর্মকর্তা বলেন, কীর্তনখোলার তীর দখলমুক্ত করার প্রস্তুতি চলছে। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ সড়ক সংস্কারে দরপত্র সম্পন্ন হয়েছে।