বাড়তি টাকায়ও মিলছে না পছন্দের পণ্য

তথ্যপ্রযুক্তির বাজারে সংকট

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

রাশেদ মেহেদী

করোনা মহামারির প্রভাবে দেশে তথ্যপ্রযুক্তি পণ্যের চাহিদা বেড়েছে, কমেছে সরবরাহ। ফলে বাজারে সংকট দেখা যাচ্ছে ল্যাপটপ, ট্যাবলেট পিসি, ওয়েব ক্যাম, হেডফোনের মতো পণ্যের। দামও কমবেশি বেড়ে গেছে। এই মুহূর্তে অনেকেই বাজারে গিয়ে পছন্দের ব্র্যান্ডের পণ্য খুঁজে পাচ্ছেন না। যেমন বেসরকারি চাকরিজীবী শফিকুল ইসলাম তার কলেজপড়ূয়া ছেলের জন্য একটি ল্যাপটপ কিনতে গিয়েছিলেন আগারগাঁওয়ের বিসিএস কম্পিউটার সিটি মার্কেটে। পছন্দের কনফিগারেশনের একটি নামি ব্র্যান্ডের ল্যাপটপ খুঁজে পেতে এক শো-রুম থেকে আরেক শো-রুম ঘুরতে হয়েছে তাকে। অনেক ঘোরাঘুরির পর একটি শো-রুমে খুঁজে পেলেন। বাজারদর আরেকটু যাচাই করার জন্য আরও দু'একটি শো-রুম ঘুরে আগের শো-রুমে ফিরে এসে দেখেন তার পছন্দ করা ল্যাপটপটি দশ-পনের মিনিটের মধ্যেই বিক্রি হয়ে গেছে। সরেজমিনে একাধিক প্রযুক্তিপণ্যের বাজার ঘুরে সংকটের এমন চিত্রই দেখা গেছে। তবে দেশে উৎপাদন হওয়ার কারণে স্মার্টফোনের বাজারে সরবরাহের ঘাটতি নেই। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, বাজারে স্মার্টফোন এবং ফিচার ফোন- দুটিরই সরবরাহ পর্যাপ্ত। এগুলোর দামও বাড়েনি।
তথ্যপ্রযুক্তি পণ্যের শীর্ষস্থানীয় পরিবেশকরা সমকালকে জানিয়েছেন, কিছু পণ্যের চাহিদা হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ায় সংকট সৃষ্টি হয়েছে। আবার বিদেশি উৎপাদকরা চাহিদার বিপরীতে সরবরাহও কম দিচ্ছেন। বিদেশ থেকে পণ্য আসতে আগের চেয়ে সময় বেশি লাগছে। এ সব মিলিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থায় সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এরসঙ্গে ডলারের মূল্য বেড়ে যাওয়ার কারণেও দাম কিছুটা বেড়ে গেছে। অবশ্য পরিবেশকরা বলছেন, চলতি মাসের শেষের দিকে সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
সরেজমিন রাজধানীর কয়েকটি মার্কেট ঘুরে প্রযুক্তিপণ্যের সংকটের বাস্তব চিত্র চোখে পড়ে। নিউ এলিফ্যান্ট রোডের মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারে টেকনো স্টারের কর্ণধার সাদিকুল বারী জানালেন, তার মতো খুচরা বিক্রেতারা এখন অর্ডার দিয়ে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য পাচ্ছেন না পরিবেশকদের কাছ থেকে। বিশেষ করে ল্যাপটপ, ওয়েব ক্যাম, হেডফোনের চাহিদা এখন সবচেয়ে বেশি। এর বাইরে মাদার বোর্ড, প্রসেসর, হার্ড ডিস্ক, পোর্টেবল হার্ড ডিস্কেরও সরবরাহ কমে গেছে। ফলে যারা নিজের পছন্দ মতো কনফিগারেশনে ডেস্কটপ কম্পিউটার সাজিয়ে নিতে চাচ্ছেন, তারা পুরোপুরি পছন্দের সঙ্গে সবকিছু মেলাতে পারছেন না। তিনি বলেন, এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে, পরিবেশকরা সকালে সরবরাহ করলে বিকেলের আগেই সেই ল্যাপটপ কিংবা ট্যাবলেট পিসি আর পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি আরও জানান, আগে সপ্তম কিংবা অষ্টম জেনারেশনের কোর আই ফাইভ প্রসেসর, দুই টেরাবাইট হার্ড ডিস্ক, আট জিবি র‌্যামের একটি ল্যাপটপের দাম ব্র্যান্ডভেদে ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকার মধ্যে ছিল। এখন সেটির দাম পড়ছে ৬৫ হাজার টাকা বা তারও বেশি। যে ওয়েব ক্যাম আগে দেড় হাজার টাকায় পাওয়া যেত, সেটি ১ হাজার ৮০০ থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি
হচ্ছে। এভাবে মাদারবোর্ড, প্রসেসর, র‌্যাম সব কিছুরই দাম সামান্য হলেও বেড়েছে। এর ফলে ডেস্কটপ তৈরির ক্ষেত্রে আগের চেয়ে দাম বেশি পড়ছে। এগুলোর বাইরে অন্যান্য পণ্য- যেমন মাউস, কি বোর্ড, কেসিং, পাওয়ার বক্স, ল্যাপটপের ব্যাটারি, এসবের দাম প্রায় আগের মতোই আছে।
দেশে প্রযুক্তিপণ্যের শীর্ষস্থানীয় পরিবেশক বি-ট্র্যাক টেকনোলজিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মাবুদ সমকালকে বলেন, শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্ববাজারেই বিশেষ করে ল্যাপটপ এবং ট্যাবলেট পিসির সংকট দেখা যাচ্ছে। বাজারে সরবরাহ কমেছে কয়েকটি কারণে। মূলত করোনা মহামারির মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর অফিস ফ্রম হোম, অনলাইন মিটিং, শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাস, অনলাইনে সেমিনার এসব বেড়ে যাওয়ার কারণে ল্যাপটপের চাহিদা বিশেষভাবে বেড়েছে। আগে যেখানে মাসে এক হাজার ল্যাপটপ বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা থাকত, এখন সেটির চাহিদাই দশ হাজারে পৌঁছেছে। এ পরিস্থিতির জন্য উৎপাদক এবং পরিবেশক কেউই প্রস্তুত ছিলেন না। এর মধ্যে মহামারির কারণে চীনে বেশিরভাগ কোম্পানির উৎপাদন দুই-তিন মাস বন্ধ ছিল। চালু হওয়ার পরও পূর্ণ মাত্রায় উৎপাদনে যেতে পারেনি অনেক কোম্পানি। কারণ, একটা ল্যাপটপ তৈরির জন্য অনেক যন্ত্রাংশ ভিন্ন ভিন্ন দেশের কোম্পানির কাছ থেকে সংগ্রহ করতে হয়। যেমন মাইক্রোচিপের মূল সরবরাহ আসে তাইওয়ান থেকে। মহামারির কারণে মাইক্রোচিপ কারখানাতেও উৎপাদন বন্ধ ছিল। সেখান থেকে সরবরাহ পেতে দেরি হওয়ায় উৎপাদকদের উৎপাদনে যেতে সময় লেগেছে। আবার উৎপাদনের পর সরবরাহেও সময় লাগছে বেশি। যেমন আগে চীন থেকে দেশে একটি চালান আসতে সময় লাগত চার সপ্তাহ, এখন লেগে যাচ্ছে আট সপ্তাহ। সবকিছু মিলে বাজারে পণ্যের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহের ক্ষেত্রে একটা সংকট দেখা যাচ্ছে।
তবে মোহাম্মদ মাবুদ জানান, দাম যেটুকু বেড়েছে সেটা ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাবে। আরেকটা দিক হচ্ছে, আগের চেয়ে উৎপাদনের হার কমে যাওয়ার কারণে উৎপাদন খরচ আনুপাতিক হারে বেড়েছে। এ কারণে দামে একটু প্রভাব পড়ছে। কিন্তু বাংলাদেশে পরিবেশকরা সেটুকুও বাড়াননি। ডলারের মূল্যের প্রভাব ছাড়া আর কোনো প্রভাব দামের ক্ষেত্রে পড়েনি।
দেশের অপর শীর্ষ পরিবেশক স্মার্ট টেকনোলজিসের পরিচালক মুজাহিদুল আল বেরুনী সুজন সমকালকে জানান, কমিউনিকেশন ডিভাইস এবং সফটওয়্যারের চাহিদা বেড়েছে। চাহিদার কারণে ডিভাইস সরবরাহে কিছুটা সংকট সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, এর আগে দু'মাস চীনে ডিভাইসের উৎপাদন বন্ধ ছিল, এলসির বিপরীতে কোনো সরবরাহ পাওয়া যায়নি। এর ফলে সরবরাহে 'ডেডলক' অবস্থা ছিল। এখন সেটা কাটছে এবং সরবরাহের গতি বেড়েছে। আশা করা যায়, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে সংকট কেটে যাবে। তিনি আরও জানান, স্মার্ট টেকনোলজিস এখন ভার্চুয়াল মিটিংয়ের জন্য জনপ্রিয় হয়ে ওঠা জুম, সিসকো ওয়েবিনার এবং মাইক্রোসফট টিমসের পরিবেশক পার্টনার। এ তিনটি সফটওয়্যার বাংলাদেশে আগে বলতে গেলে পরিচিতই ছিল না, যা এখন ব্যাপক চাহিদাসম্পন্ন পণ্যে পরিণত হয়েছে। এসব সফটওয়্যার ব্যবহারের জন্যই ডিভাইসের চাহিদা বেড়েছে। আগে একটি পরিবারের পুরো কাজ যেখানে একটি ডেস্কটপ বা ল্যাপটপ দিয়ে হতো, এখন সেখানে কর্মজীবী, বাবা-মা-সন্তানের জন্য পৃথক ল্যাপটপ বা এ ধরনের কমিউনিকেশন ডিভাইস ব্যবহার করতে হচ্ছে। ডিভাইসের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে এ কারণেই।
আসুস ল্যাপটপসহ প্রযুক্তিপণ্যের অপর বৃহৎ পরিবেশক গ্লোবাল ব্র্যান্ডের উপ-মহাব্যবস্থাপক (সেলস অ্যান্ড টেন্ডার) করিম খান সমকালকে বলেন, এখনও চাহিদার বিপরীতে উৎপাদকদের কাছ থেকে স্বাভাবিক সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে এক হাজার ল্যাপটপের অর্ডার দিলে পাঠানো হচ্ছে ৫০০টি। এ অবস্থা খুব বেশিদিন থাকবে না জানিয়ে তিনি বলেন, এখন সামান্য দাম বেড়েছে। সেটাও পরিবেশকদের কাছ থেকে নয়, খুচরা বিক্রির ক্ষেত্রে। এটাও সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
একসেসরিজ প্রযুক্তিপণ্যের অন্যতম সরবরাহকারী ও বিক্রেতা মোশন ভিউ'র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমরুল হাসান সমকালকে বলেন, বাজারে একসেসরিজের যত চাহিদা তার ৬০ শতাংশের জোগান এ মুহূর্তে আছে, ৪০ শতাংশের ঘাটতি আছে। ঘাটতির কারণে খুচরা পর্যায়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাড়তি দাম দিতে হচ্ছে ক্রেতাদের। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আগের দামেই পণ্য পাওয়া যাচ্ছে। তিনিও বলেন, এ সংকট সাময়িক। সরবরাহ স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। সংকট দ্রুত কেটে যাবে।