প্রমত্ত পদ্মার দুই কূল এক করে দিয়েছে বহুল আকাঙ্ক্ষিত পদ্মা সেতু। নকশা প্রণয়ন, নদীশাসন থেকে শুরু করে ব্যবস্থাপনা, সব ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে সেতুটি হয়ে উঠেছে নান্দনিক ও টেকসই ...
প্রমত্ত পদ্মার বুকে অত্যাধুনিক সেতু গড়ে তুলতে ব্যবহার করা হয়েছে ১৩ ধরনের প্রযুক্তি। স্মার্ট সেন্সর, স্যাটেলাইট, জিপিএস, পেন্ডুলাম বিয়ারিংসহ সেতু নির্মাণে প্রতিটি পর্যায়ে ব্যবহার করা হয়েছে নানা প্রযুক্তি ও ডিভাইস। গত শনিবার উদ্বোধন হওয়া পদ্মা সেতুর টোল আদায়েও ব্যবহূত হচ্ছে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি। মূল অবকাঠামোর পাশাপাশি নিরাপত্তায় পদ্মা সেতুতে রয়েছে অত্যাধুনিক সিসি ক্যামেরা।
স্মার্ট সেন্সরে সেতু পর্যবেক্ষণ
প্রচলিত ব্রিজে কোথাও ফাটল কিংবা অন্য কোনো সমস্যা আছে কিনা তা ম্যানুয়ালি পর্যবেক্ষণ করা হয়। পর্যবেক্ষণে এ রকম কিছু ধরা পড়লে তা ঠিকঠাক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে পদ্মা সেতুকে বলা হচ্ছে, স্মার্ট সেতু। কেননা সেতুটির বিভিন্ন পয়েন্টে বসানো হয়েছে স্মার্ট সেন্সরভিত্তিক গেজেট। এ সেন্সরগুলো সার্বক্ষণিক সেতুর স্বাস্থ্য (অবস্থা) পর্যবেক্ষণ করবে। একে বলা হচ্ছে, সেতুর 'হেলথ মনিটরিং সিস্টেম'। কোনো কারণে সেতুর কোনো অংশে ত্রুটি দেখা দিলে তাৎক্ষণিক জানিয়ে দেবে এ সেন্সর। সেতু রক্ষণাবেক্ষণে দায়িত্বরতদের কম্পিউটার সিস্টেমে ভেসে উঠবে তাৎক্ষণিক বার্তা। আর এটি দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবেন প্রকৌশলীরা। ধরা যাক, ভূমিকম্প কিংবা এ ধরনের বড় কোনো দুর্যোগে সেতুর স্টিলের ট্রাস বেঁকে যেতে পারে, ভেতরে ভেঙে যেতে পারে, সাব-স্ট্রাকচার কিংবা সুপার স্ট্রাকচারের ক্ষতি হতে পারে, পিয়ারের ক্ষতি হতে পারে, বিয়ারিংয়ের ক্ষতি পারে, ট্রাসের ক্ষতি হতে পারে, ডেকের ক্ষতি হতে পারে। মজার বিষয় হচ্ছে, আপাতদৃষ্টিতে ছোট সমস্যা থেকে বড় সমস্যা হওয়ার শঙ্কা থাকলেও সেটি জানিয়ে দেবে এ সেন্সর। এতে ক্ষতি এড়াতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। সেতুর এ স্মার্ট ফিচারটি সেতু রক্ষণাবেক্ষণে তাৎক্ষণিক কার্যকর ভূমিকা রাখতে সহায়ক হবে। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতায় এ ফিচার সেতুর জীবনকাল নিঃসন্দেহে বাড়িয়ে দেবে।
স্যাটেলাইট ও জিপিএস
পদ্মা সেতু নির্মাণে জটিল প্রক্রিয়া পার হতে হয়েছে নদীশাসন অংশে। শত শত বছর ধরে বাধাহীন প্রবহমান নদীকে পদ্মা সেতু নির্মাণবান্ধব করতে নানা কারিগরি কাজ করতে হয়েছে। বেপরোয়া চঞ্চল নদীকে বশে আনতে এ কাজে ব্যবহূত হয়েছে প্রযুক্তি। নদীশাসনে 'গাইড ব্যান্ড উইথ ফলিং অ্যাপ্রোন' কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে। নদীর প্রকৃতি পর্যবেক্ষণে স্যাটেলাইট খুবই কার্যকর প্রযুক্তি। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে যে কোনো নদীর কাঠামোগত মানচিত্র জানা যায়। তবে সেতু নির্মাণের জন্য প্রয়োজন ছিল স্যাটেলাইট মানচিত্রের বিস্তারিত তথ্য। সুইজারল্যান্ড থেকে স্যাটেলাইট মানচিত্র থেকে বিস্তারিত নিয়ে কাজ শুরু করে সেতুর পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। সেতুর নকশা প্রণয়নে নদীর গতিপথ বদলানোর চিত্র স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্নেষণ করা হয়েছে। বহুরূপী পদ্মার গতিপথ আর চরিত্র নির্ণয়ে জিপিএসের সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে। নদীশাসন আর পাইলিংয়ের কাজে ব্যবহূত হয়েছে জিপিএস প্রযুক্তি। নদীর পাড়ে যে বৃহৎ আকৃতির পাথর ও জিওব্যাগ বসানো হয়েছে, সেগুলো জিপিএসের মাধ্যমে হিসাব-নিকাশ করে বসানো হয়েছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় পেন্ডুলাম বিয়ারিং
ভূমিকম্প প্রতিরোধে পদ্মা সেতুতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পেন্ডুলার বিয়ারিং (এফপিবি) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। স্টিল সুপার স্ট্রাকচার ও কংক্রিটের ফাউন্ডেশনের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনের কাজটি করেছে এই ফ্রিকশন পেন্ডুলাম বিয়ারিং। এই বিয়ারিং থাকার ফলে নদীর তলদেশে শক্তিশালী ভূমিকম্পন হলেও এর পুরো মাত্রা সেতুর স্টিলের সুপার স্ট্রাকচারে যাবে না। ফলে ব্রিজটি বর্ধিত মাত্রার ভূমিকম্পও সহ্য করতে পারবে। সেতু কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে, পদ্মা সেতুটি ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। আর ভূমিকম্প প্রতিরোধে অন্যতম ভূমিকা রাখবে এই দোদুল্যমান বিয়ারিং।
পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব
সাধারণত প্রচলিত কংক্রিটের ব্রিজ জীবনকাল শেষ হয়ে গেলে একে পুনর্ব্যবহার করা যায় না। কিন্তু পদ্মা সেতু এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। এটি স্টিলের ট্রাস ব্রিজ। তবে সড়কে এবং রেলপথেও আছে কংক্রিটের ব্যবহার। ফলে একে বলা হচ্ছে, কম্পোজিট ব্রিজ। সেতুতে নেই কোনো নাট-বোলটু। এটি শতভাগ ওয়েল্ডেড (ঝালাই করা)। স্টিলের ব্রিজের বিশেষত্ব হচ্ছে, এটি কংক্রিটের চেয়ে অনেক হালকা ব্রিজ। জীবনকাল শেষ হলে একে পুনর্ব্যবহার করা যাবে এবং এটি পরিবেশবান্ধব।
ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ
পদ্মা সেতুর মাধ্যমে সহজেই অপেক্ষাকৃত কম খরচে দেশের দক্ষিণ অঞ্চলের জেলাগুলোতে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ পাওয়া যাবে। কুয়াকাটায় অবস্থিত ল্যান্ডিং স্টেশন থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে সারাদেশে ইন্টারনেট সংযোগ ছড়িয়ে পড়ে। তবে পদ্মা সেতু হওয়ায় বিকল্প সংযোগ স্থাপন সহজ হবে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে পদ্মা সেতুর মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ কানেক্টিভিটির দূরত্বও কমে যাবে। ল্যাটেন্সি কমবে। এর ফলে ইন্টারনেটের গতি বাড়বে।
গুগল ম্যাপে পদ্মা সেতু
গুগলের ম্যাপিং অ্যাপ্লিকেশন গুগল ম্যাপেও দেখা যাচ্ছে পদ্মা সেতু। পদ্মা সেতু সংলগ্ন রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন স্থাপনা চলে এসেছে গুগল ম্যাপে। স্যাটেলাইট ভিউতেও দেখা যাচ্ছে সেতুটি। ফলে সেতুর রুট ম্যাপ, সেতুর ওপর যানবাহনের অবস্থা যানজট আছে কিনা সেটিও এখন জানা যাবে।