তামিম ইকবালের সেঞ্চুরিতে জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশ করে সিরিজ জিতেছে বাংলাদেশ। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ১২ বছর পর বিদেশের মাটিতে কাউকে হোয়াইটওয়াশ করার কীর্তি গড়লেন টাইগাররা। সর্বশেষ ২০০৯ সালে বিদেশের মাটিতে প্রতিপক্ষকে হোয়াইটওয়াশ করার স্বাদ পেয়েছিল বাংলাদেশ। সেবার ওয়েস্ট ইন্ডিজে গিয়ে তিন ম্যাচের প্রতিটি জিতে নেয় টাইগাররা। এর আগে ২০০৬ সালে কেনিয়ার মাঠে তাদেরকে বাংলাওয়াশ করে লাল-সবুজের পতাকাধারীরা। আর এবার তৃতীয় দল হিসেবে বাইরে গিয়ে সবকটি ম্যাজ জিতল সুপার লিগের পয়েন্ট টেবিলের দুই নম্বরে থাকা দলটি।

স্বাগতিকদের ছুড়ে দেয়া ২৯৯ রানের টার্গেট তাড়া করে ১২ বল বাকি থাকতেই জয়ের বন্দরে নোঙর ফেলে টাইগাররা।

সবমিলিয়ে ছয়বার টাইগারদের কাছে হোয়াইটওয়াশ হয়েছে জিম্বাবুয়ে। এর মধ্যে টানা পাঁচ সিরিজের দেখায় পাঁচবারই রোডেশিয়ানদের হোয়াইটওয়াশের স্বাদ দিয়েছে টাইগাররা। ২০১৪ সালে ঘরের মাঠে জিম্বাবুয়েকে পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে ৫-০ ব্যবধানে পরাজিত করেছিল বাংলাদেশ দল। এরপর ২০১৫ সালে ঢাকায় তিন মাচের সিরিজে ৩-০ ব্যবধানে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের মাটিতে তিন ম্যাচের তিনটিতেই হারিয়েছে টাইগাররা। ২০২০ সালের মার্চে ৩-০ ব্যবধানে সিরিজ জিতে বাংলাদেশ। সর্বশেষ ২০২১ সালে জিম্বাবুয়ের মাটিতে গিয়ে প্রথমবারের মত রোডেশিয়ানদের হোয়াইটওয়াশের স্বাদ দিল বাংলাদেশ।

হারারে ক্রিকেট গ্রাউন্ডে মঙ্গলবার সিরিজের তৃতীয় এবং শেষ ওয়ানডেতে টস জিতে প্রথমে জিম্বাবুয়েকে ব্যাটিংয়ে পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। ব্যাটিংয়ে নেমে সাবধানী শুরু করে জিম্বাবুয়ে। রেগিস চাকাবা ও তাদিওয়ানাশে মারুমানির ব্যাটিংয়ে দলের রান বাড়ান।  দুই ওপেনারের জুটি বড় হতে থাকলে সাকিবকে বোলিংয়ে নিয়ে আসেন তামিম। নবম ওভারে বোলিংয়ে এসেই ব্রেক থ্রু দেন সাকিব। তার বল সুইপ করতে গিয়ে এলবিডব্লিউ হন ৮ রান করা তাদিওয়ানাশে মারুমানি।

চাকাভাকে সঙ্গ দিয়ে দলীয় স্কোর বড় করছিলেন জিম্বাবুয়ে অধিনায়ক্ক টেইলর। জুটি ভাঙতে দীর্ঘদিন পর মাহমুদউল্লাহকে বোলিংয়ে নিয়ে আসেন তামিম। এসেই অধিয়ায়কের আস্থার প্রতিদান দেন রিয়াদ। জিম্বাবুয়ে অধিনায়ককে তামিমের ক্যাচ বানিয়ে সাজঘরে পাঠিয়েছিয়েন টাইগার এই অলরাউন্ডার। ৩৯ বলে ২৮ রান করেই ফেরেন জিম্বাবুয়ে অধিনায়ক। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারির পর এই প্রথম এ সংস্করণে উইকেট পেলেন মাহমুদউল্লাহ!

দীর্ঘদিন পর বোলিংয়ে এসে জোড়া শিকার করেন মাহমুদউল্লাহ। টেইলরের পর মায়ার্সকেও ফেরান তিনি। ৩৮ বলে ৩৪ রান করে ফিরেছেন মায়ার্স। এর আগে ক্যারিয়ারের তৃতীয় ফিফটি তুলেছেন জিম্বাবুয়ের ওপেনার রেজিস চাকাভা। তার ফিফটির আগেই ১০০ রান পেরিয়ে যায় জিম্বাবুয়ে।

মাহমুদউল্লাহর পর জিম্বাবুয়ে শিবিরে আঘাত হানেন মোস্তাফিজ। মাধেভেরেকে সাকিবের তালুবন্দী করে প্যাভিলিয়নে পাঠান 'কাটার মাস্টার'। ৪ বলে ৩ রান করে ফিরেছেন মাধেভেরে।

সেঞ্চুরির পথে এগিয়ে যাচ্ছিলেন রেগিস চাকাভা। কিন্তু তাসকিনের গতিতে পরাস্ত হয়ে সাজঘরে ফেরেন। তাসকিন পান এই ম্যাচে নিজের প্রথম উইকেট। ৯১ বলে ৭ চার ও ১ ছক্কায় ৮৪ রান করে বিদায় নেন চাকাভা।

তার বিদায়ের পর স্বাগতিকদের হাল ধরেন সিকান্দার রাজা। ডানহাতি এই ব্যাটসম্যান ৪৯ বলে ১৭তম হাফ সেঞ্চুরি করেন। ষষ্ঠ উইকেটে ১১২ রানের জুটি গড়লে বড় ইনিংসের দিকে এগোতে থাকে জিম্বাবুয়ে। রাজার পর বার্লও অর্ধশতক করেন। ৫৪ বলে ৫৭ রানে ফেরেন রাজা। জিম্বাবুয়ের এই ব্যাটসম্যান ফিরেছেন মোস্তাফিজুরের বলে মোসাদ্দেকের ক্যাচ হয়ে।

এরপর এক ওভারেই তিন উইকেট নেন সাইফউদ্দিন। দলীয় ২৯৪ রানে বার্লকে থামান টাইগার এই অলরাউন্ডার। আউট হওয়ার আগে বার্ল করেন ৪৩ বলে ৫৯ রান। পরের বলে ডোনাল্ড তিরিপানোকে করেন বোল্ড। তেন্দাই চাতারা হ্যাটট্রিক হতে দেননি। দুই বল পরই বোল্ড হন ১ রানে।

শেষ ওভারে ব্লেসিং মুজারাবানিকে শূন্য রানে বোল্ড করেন মোস্তাফিজুর রহমান। 

বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ তিনটি করে উইকেট নেন মোস্তাফিজুর রহমান এবং মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। এছাড়া দুটি উইকেট নেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ।

২৯৯ রানের বড় লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে দুই ওপেনার তামিম ইকবাল এবং লিটন দাসের ব্যাটে উড়ন্ত সূচনা করে বাংলাদেশ। দুজনের জুটিতে ৮৮ রান উঠতেই তামিমের সঙ্গ ছাড়েন লিটন। মাধেভেরের স্পিনে মারুমানির ক্যাচে বন্দি হয়ে সাজঘরে ফেরেন এই টাইগার ওপেনার। আউট হবার আগে ৩৭ বলে ৩২ রান তোলেন লিটন।

তামিমের সঙ্গে ৫৯ রানেই জুটি থামে সাকিবের। পেসার লুক জংওয়ের অফস্টাম্পের বাইরের লেন্থ বল কাট করতে গিয়েছিলেন সাকিব। টাইমিং মেলাতে পারেননি। ক্যাচ ধরে ফেলেন চাকাভা। তবে আম্পায়ারের আউটের সিদ্ধান্তের পর এটি মানতে পারেননি সাকিব। যদিও এতে কোন প্রতিক্রিয়া দেখাননি বিশ্বসেরা এই অলরাউন্ডার। ৪২ বলে সাকিবের রান ৩০।

টেন্ডাই চাতারাকে চার মেরে ক্যারিয়ারের ১৪তম ওয়ানডে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন তামিম ইকবাল, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে যা চতুর্থ। মাত্র ৮৭ বলেই মাইলফলকে গেলেন তিনি। ওয়ানডেতে এটি তার দ্রুততম সেঞ্চুরি। এর আগে ২০১০ সালে ৯৪ বলে সেঞ্চুরি পান। গত বছর মার্চে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেই ওয়ানডেতে সর্বশেষ সেঞ্চুরি করেন তামিম।

ড্রিঙ্কস বিরতির পরই ফিরে গেছেন তামিম।  ডোনাল্ড তিরিপানোর খোঁচা দিয়ে ধরা পড়েন উইকেটের পেছনে চাকাভার হাতে। ৯৭ বলে ১১২ রান করে ফিরতে হয় তাকে। এর ঠিক পরের বলেই ক্যাচ আউট মাহমুদউল্লাহ। তিরিপানোর বলে ইনসাইড এজড হয়ে চাকাভার হাতেই পড়ে সেই বল।

গেল দুই ম্যাচের ব্যর্থতার পর শেষ ম্যাচে ব্যাট হাতে রান পেয়েছেন মিঠুন। তবে ইনিংস বেশিদূর নিয়ে যেতে পারেননি। মাধেভেরেকে ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে খেলতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দেন।  সীমানার ওপর সেটি নিয়েছেন টেন্ডাই চাতারা। ৫৭ বলে ৩০ রান করে ফিরেছেন মিঠুন। ভেঙেছে নুরুলের সঙ্গে তার ৬৪ রানের জুটি। শেষ ৬ ওভারে বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ৩০ রান। এরপর জয় নিয়েই মাঠ ছাড়েন নুরুল হাসান সোহান। ৩৯ বলে ৪৫ রান অপরাজিত থাকেন তিনি। এদিকে আফিফ অপরাজিত ছিলেন ১৭ বলে ২৬ রানে।