ক্যান্ডি টেস্টে স্বাগতিক শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জয়ের জন্য ৪৩৭ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে ২২৭ রানেই গুটিয়ে গেছে বাংলাদেশ। এতে ২০৯ রানে বড় জয় পেয়েছে শ্রীলঙ্কা।

আগের দিন ৫ উইকেট হারিয়ে ১৭৭ রান তোলা বাংলাদেশ সোমবার ম্যাচের পঞ্চম ও শেষ দিনে পুনরায় ব্যাট করতে নেমে বাকি পাঁচ উইকেট হারিয়ে আর মাত্র ৫০ রান তুলতে সক্ষম হয়। দ্বিতীয় টেস্ট জয় পাওয়ায় দুই ম্যাচ সিরিজ ১-০ ব্যবধানে জিতে নিল স্বাগতিকরা।

গত বৃহস্পতিবার ক্যান্ডির পাল্লেকেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে শুরু হওয়া ম্যাচে টস জিতে আগে ব্যাট করতে নামে শ্রীলঙ্কা। দুই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান দিমুথ করুনারত্নে ও লাহিরু থিরিমান্নের জোড়া শতকে ভর করে ৭ উইকেটে ৪৯৩ রান তুলে শনিবার ম্যাচের তৃতীয় দিনের সকালে ইনিংস ঘোষণা করে স্বাগতিকরা।

ওপেনার লাহিরু থিরিমান্নে সর্বোচ্চ ১৪০ রান করেন। আরেক উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান দিমুথ করুনারত্নে করেন ১১৮ রান। এ ছাড়া ওশাদা ফার্নান্দো ৮১ এবং নিরোশান ডিকভেলা ৭৭ রান।

প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল বোলার ছিলেন তাসকিন আহমেদ। ১২৭ রানে ৪ উইকেট তুলে নেন এই পেসার। এ ছাড়া মেহেদি হাসান মিরাজ, শরিফুল ইসলাম ও তাইজুল ইসলাম একটি করে উইকেট নেন।

প্রথম ইনিংসে শ্রীলঙ্কার পাঁচশ' ছোঁয়া সংগ্রহের জবাবে ব্যাট করতে নেমে শুরুটা মন্দ হয়নি টাইগারদের। প্রথম উইকেট জুটিতেই তামিম ইকবাল ও সাইফ হাসান তুলে ফেলেন ৯৮ রান। তবে এরপরই যেন হঠাৎ খেই হারিয়ে ফেলেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। এক রানের ব্যবধানে ফিরে যান সাইফ ও নাজমুল হোসেন শান্ত। ফলে কোনো উইকেট না হারিয়ে ৯৮ রান তোলা বাংলাদেশের স্কোর মুহূর্তেই বদলে যায় ২ উইকেটে ৯৯ রানে।

এরপর তৃতীয় উইকেটে তামিম ও মুমিনুল এবং চতুর্থ উইকেটে মুমিনুল ও মুশফিকের দু'টি অর্ধশত রানের জুটিতে ধাক্কা সামলে ভালোই এগোচ্ছিল বাংলাদেশ। তবে ৩ উইকেট হারিয়ে ২১৪ রান তোলার পরই সর্বনাশের শুরু। এরপর মাত্র ৩৭ রান তুলতেই প্যাভিলিয়নে ফেরেন বাংলাদেশের শেষ সাত ব্যাটসম্যান। ফলে ২৫১ রানেই অলআউট হয় বাংলাদেশ। এতে প্রথম ইনিংসে ২৪২ রানের লিড পায় শ্রীলঙ্কা।

প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ ৯২ রান করেন তামিম ইকবাল। এ ছাড়া মুমিনুল হক ৪৯ ও মুশফিকুর রহিম ৪০ রান করেন।

শ্রীলঙ্কার পক্ষে প্রথম ইনিংসে অভিষিক্ত প্রভীন জয়াবিক্রমা ৯২ রান ৬ উইকেট নেন। এ ছাড়া সুরঙ্গা লাকমল ও রমেন মেন্ডিস দুটি করে উইকেট নেন।

প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশকে ফলোঅন করানোর সুযোগ পেয়েও তা কাজে লাগায়নি শ্রীলঙ্কা, নিজেরাই ব্যাট হাতে নেমে পড়ে দ্বিতীয় ইনিংস খেলতে। ব্যাট করতে নেমে ৯ উইকেট হারিয়ে ১৯৪ রান তুলে চতুর্থ দিনের মধ্যাহ্ন বিরতির পরপরই দ্বিতীয় ইনিংস ঘোষণা করে শ্রীলঙ্কা। এতে ম্যাচে তাদের লিড বেড়ে দাঁড়ায় ৪৩৬ রান। ফলে জয়ের জন্য ৪৩৭ রানের পাহাড়সম লক্ষ্য পায় বাংলাদেশ। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে এতো রান তাড়া করে জয়ের নজির নেই। অর্থাৎ জিততে হলে নতুন রেকর্ড গড়েই জিততে হবে বাংলাদেশকে।

দ্বিতীয় ইনিংসে শ্রীলঙ্কার পক্ষে সর্বোচ্চ ৬৬ রান করেন ওপেনার দিমুথ করুনারত্নে। এ ছাড়া ধনঞ্জয়া ডি সিলভা করেন ৪১ রান।

বাংলাদেশের পক্ষে বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম ৭২ রানে ৫ উইকেট নেন। এ ছাড়া মেহেদি হাসান মিরাজ ২টি এবং তাসকিন আহমেদ ও সাইফ হাসান একটি করে উইকেট নেন।

জয়ের জন্য ৪৩৭ রানের পাহাড়সম লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুটা মোটেও ভালো হয়নি বাংলাদেশের। দলীয় ৩১ রানেই আউট হয়ে সাজঘরে ফিরে যান ইনফর্ম ব্যাটসম্যান তামিম ইকবাল। এরপর দ্রুতই ফিরে যান সাইফ হাসান ও নাজমুল হোসেন শান্তও।

বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে স্বভাবসুলভ আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতেই ব্যাট করছিলেন ওপেনার তামিম ইকবাল। তবে প্রথম ইনিংসে ৯২ রানের ইনিংস খেলা এই ব্যাটসম্যান দ্বিতীয় ইনিংসে বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। দলীয় ৩১ রানে মেন্ডিসের বলে উইকেটরক্ষক ডিকভেলার হাতে ধরা পড়ে বিদায় নেন তিনি। ফেরার আগে ৩ চার ও ১ ছয়ে ২৬ বলে ২৪ রানের ইনিংস খেলেন তামিম।

তামিমের বিদায়ের পর ব্যাট করতে নামে নাজমুল হোসেন শান্ত। তাকে সঙ্গে নিয়ে দলীয় সংগ্রহে আরও ৪২ রান যোগ করার পর জয়াবিক্রমার বলে উড়িয়ে মারতে গিয়ে আউট হন সাইফ। সুরঙ্গা লাকমলের হাতে ধরা পড়ার আগে  ৪৬ বলে ৫ চার ও ১ ছয়ে ৩৪ রান করেন তিনি।

এরপর ব্যাট করতে নামে অধিনায়ক মুমিনুল হক। শান্তর সঙ্গে তৃতীয় উইকেটে ৩১ রান যোগ করার পর শান্তকে বোল্ড করে জুটি ভাঙ্গেন জয়াবিক্রমা। শান্ত করেন ২৬ রান। এরপর দলীয় ১৩৪ রানে মুমিনুল হক এবং ১৭১ রানে মুশফিকুর রহিম ফিরে গেলে বড় পরাজয়ের শঙ্কায় পড়ে টাইগাররা। মেন্ডিসের বলে বোল্ড হয়ে ফেরার আগে মুমিনুল করেন ৩২ রান। অন্যদিকে একই বোলারের বলে ডি সিলভার হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরার আগে মুশফিক করেন ৪০ রান।

৫ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ ১৭৭ রান তোলার পর আলো স্বল্পতার কারণে চতুর্থ দিনের খেলা বন্ধ হওয়ার আগে লিটনের সঙ্গে ব্যাট করছিলেন মেহেদি হাসান মিরাজ। পঞ্চম দিন সকালে এই জুটি পুনরায় ব্যাট করতে নামেন। তবে শুরুটা ভালো হয়নি। দলীয় সংগ্রহে আর মাত্র ৬ রান যোগ হওয়ার পরই জয়াবিক্রমার বলে এলবিডব্লিউ হয়ে ফিরে যান লিটন। তিনি করেন ১৭ রান। এরপর দলীয় ২০৬ রানে তাইজুল ইসলাম আউট হয়ে ফিরে গেলে বাংলাদেশের সপ্তম উইকেটের পতন হয়। ডি সিলভার বলে উইকেটের পেছনে ডিকভেলার হাতে ধরা পড়ার আগে তাইজুল করেন ২ রান।

তাইজুলের বিদায়ের পর ব্যাট করতে নামা তাসকিন আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে অষ্টম উইকেট জুটিতে দলীয় সংগ্রহ আরও ২১ রান যোগ করেন মিরাজ। তবে এরপর আর নড়েনি স্কোরবোর্ডের চাকা। দলীয় ২২৭ রানেই বাংলাদেশের শেষ তিন উইকেটে পতন হলে ২০৯ রানের বড় জয় পায় শ্রীলঙ্কা।

দ্বিতীয় ইনিংসে শ্রীলঙ্কার পক্ষে প্রভীন জয়াবিক্রমা ৮৬ রানে ৫টি ও রমেশ মেন্ডিস ১০৩ রানে ৪টি উইকেট নেন। এ ছাড়া ধনঞ্জয়া ডি সিলভা নেন একটি উইকেট।

প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট শিকারের পর দ্বিতীয় ইনিংসে ৫ উইকেট নেওয়া প্রভীন জয়াবিক্রমা ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। আর পুরো সিরিজে দারুণ ধারাবাহিক ব্যাটিংশৈলী উপহার দেওয়া শ্রীলঙ্কার অধিনায়ক দিমুথ করুনারত্নে পান সিরিজ সেরার পুরস্কার।

প্রসঙ্গত, ক্যান্ডিতে শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের মধ্যকার দুই ম্যাচ সিরিজের প্রথম টেস্ট ড্র হয়।