সমকাল :মানি লন্ডারিং ও অর্থ পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরুর ২০ বছর পূর্ণ হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক খাত কতটা এগিয়েছে বলে মনে করেন?
সেলিম আর. এফ. হোসেন :আমি মনে করি, দেশের ব্যাংকগুলোতে মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী কাজে অর্থায়ন প্রতিরোধসংক্রান্ত নিয়মকানুন বাস্তবায়নে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) বিধিবিধান ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সংগতি রেখে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এই অগ্রগতির পেছনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে বিএফআইইউ। তারা দেশের ব্যাংকগুলোর জন্য ব্যাপক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করেছে। সচেতনতা বাড়াতে দেশজুড়ে এ প্রশিক্ষণ পরিচালনা করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে যা ভূমিকা রেখেছে। এ কার্যক্রম ব্যাংকগুলোর জন্য সহায়ক হয়েছে। বৈশ্বিক পরিবর্তনের সঙ্গে সংগতি রেখে আইন পরিবর্তন করা হয়েছে। এতে দেশের ব্যাংকগুলোর জন্য বিদেশি করসপন্ডিং ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা ও লেনদেনও সহজ হয়েছে। বৈদেশিক বাণিজ্য নিষ্পত্তিতে আগের তুলনায় খরচ কমেছে।

সমকাল :আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নির্ধারিত হারে কর দিয়ে পাচার করা অর্থ ফেরত আনার সুযোগ রাখা হয়েছে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?
সেলিম আর. এফ. হোসেন :বিদেশ থেকে অর্থ ফেরত আনা অর্থনীতির জন্য সহায়ক হবে। এটি আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং অভ্যন্তরীণ খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়তা করবে। দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় ভূমিকা রাখবে।

সমকাল :বাংলাদেশ ২০১৪ সালে মানি লন্ডারিংয়ের ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে আসতে সমর্থ হয়েছে। নতুন করে কোনো ঝুঁকি দেখেন কি?
সেলিম আর. এফ. হোসেন :মূলত প্রযুক্তিগত পরিবর্তন থেকেই ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি উদ্ভূত হয়। ফিনটেক সম্পর্কিত কেলেঙ্কারি, গ্রাহকের তথ্য হ্যাকিং, ব্যাংকগুলোতে সাইবার আক্রমণ, ক্রিপ্টো কারেন্সির বিষয়গুলো অন্যতম চ্যালেঞ্জ। গ্রাহকের কাছে ব্যাংকিং পণ্য ও সেবা পৌঁছে দেওয়ার পদ্ধতিতে আমরা দ্রুত পরিবর্তন লক্ষ্য করছি। এগুলোর জন্য আইন তৈরি করা কষ্টসাধ্য। তার পরও অপরাধীরা অর্থ পাচারের জন্য নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। অনেক সময় ব্যাংকগুলোর কাছে যা পরিচিত নয়। সাম্প্রতিক বিভিন্ন ই-কমার্স স্ক্যাম এর অন্যতম উদাহরণ।

সমকাল :বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্টে জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশ থেকে বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার হচ্ছে বেশি। এটি ঠেকাতে ব্যাংকগুলো কি ব্যর্থ হচ্ছে?
সেলিম আর. এফ. হোসেন :বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার রোধে ব্যাংকগুলোতে আগ থেকেই সতর্কতা রয়েছে। ২০২০ সালে বিএফআইইউ বাণিজ্যভিত্তিক মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ সম্পর্কিত বিশদ নীতিমালা জারি করে। এটি একটি সম্পূর্ণ এবং বিস্তারিত গাইড লাইন্স। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে। দেশের ফরেন এক্সচেঞ্জ প্রবিধানের মতো স্থানীয় বিষয়গুলোও এখানে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এই নীতিমালা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন। এর পুরোপুরি বাস্তবায়নের জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার জরুরি। এটি সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন শুরু হলে বাণিজ্যের আড়ালে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে ব্যাংকগুলোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে।

সমকাল :মানি লন্ডারিং ও অর্থ পাচার প্রতিরোধে ব্র্যাক ব্যাংকের উদ্যোগ নিয়ে কিছু বলুন?
সেলিম আর. এফ. হোসেন :ব্র্যাক ব্যাংক সব সময়ই মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে জোর দিয়ে আসছে। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ নীতিমালা যথাযথভাবে পরিপালনে বাংলাদেশে আমরা শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে একটি। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কার্যক্রমের গুরুত্ব বিবেচনায় গত বছর আমাদের এ-সংক্রান্ত বিভাগ পুনর্গঠন করা হয়। বিএফআইইউর নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমরা বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ নীতি ও পদ্ধতি বাস্তবায়ন করেছি। কর্মকর্তাদের ব্যাপক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। যেখানে সম্ভব প্রযুক্তি চালু করেছি। আমাদের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কমপ্লায়েন্স আরও কার্যকর করতে সার্বক্ষণিকভাবে বিএফআইইউর পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা নিচ্ছি। আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তাও নিচ্ছি। আমাদের পরিচালনা পর্ষদ কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে ব্র্যাক ব্যাংক জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। কমপ্লায়েন্সের ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগামী অবস্থান বজায় রাখতে প্রচুর বিনিয়োগ করে যাব।

সমকাল :আরও শক্তিশালী মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যাংক খাতের করণীয় নিয়ে কিছু বলুন?
সেলিম আর. এফ. হোসেন :মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে ব্যাংকগুলোতে আরও কর্মদক্ষতা আনতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। নতুন ঝুঁকি চিহ্নিত করে তা প্রতিহত করার ব্যবস্থা রাখতে হবে। বিএফআইইউর নির্দেশনায় ইকেওয়াইসি (ইলেকট্রনিক নো ইউর কাস্টমার) বাস্তবায়ন একটি মাইলফলক। ইকেওয়াইসির ফলে এখন অনেকে ঘরে বসে অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ পাচ্ছেন। আবার গ্রাহককে চিহ্নিত করাও সহজ হয়েছে। এসব যথাযথভাবে পরিপালনের পাশাপাশি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ঠিকভাবে পরিচালনা করতে হবে। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ জোরদারে যা সহায়ক হবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ব্যাংকের উদ্দেশ্য, প্রতিশ্রুতি এবং সংস্কৃতি। আমাদের সুদৃঢ় অবস্থানে পৌঁছাতে যা সহায়ক হবে।