সমকাল :মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কার্যক্রম শুরুর দুই দশক পূর্ণ হচ্ছে। আলাদাভাবে কার্যক্রম শুরুর প্রেক্ষাপট নিয়ে কিছু বলুন।
মাসুদ বিশ্বাস :মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। মানি লন্ডারিংয়ের ইতিহাস অনেক পুরোনো হলেও তা প্রতিরোধে প্রথম আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়া হয় গত শতকের শেষদিকে। ১৯৮৯ সালে জি-২০ দেশগুলো মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠান ফাইন্যান্সিয়াল টাস্কফোর্স (এফএটিএফ) প্রতিষ্ঠা করে। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এফএটিএফের সুপারিশ বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং (এপিজি)। বাংলাদেশ এপিজির প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য হলেও ২০০২ সালের আগ পর্যন্ত মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে আলাদা কোনো আইন বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছিল না। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর বিশ্বব্যাপী প্রেক্ষাপট দ্রুত বদলে যায়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ২০০২ সালে প্রথম মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন জারি করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে 'মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিভাগ' খোলা হয়, বর্তমানে যা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) নামে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে।

সমকাল :বাংলাদেশে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে আপনাদের অর্জন নিয়ে কিছু বলুন।
মাসুদ বিশ্বাস :একটি গোয়েন্দা সংস্থার সফলতা পরিমাপ করা দুরূহ। কেননা, গোয়েন্দা কার্যক্রম সব সময় গোপন রাখতে হয়। আবার গতানুগতিক গোয়েন্দা সংস্থার তুলনায় বিএফআইইউর অতিরিক্ত কিছু দায়িত্ব রয়েছে। আমাদের মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে নীতি-প্রবিধান প্রণয়ন ও তদারকি, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, সমন্বয় ও সহায়তা এবং জাতীয় উদ্যোগেরও সমন্বয় করতে হয়। ২০০২ সাল থেকে আমাদের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হলেও জাতিসংঘের কনভেনশনের বাধ্যবাধকতা ও এফএটিএফের মানদণ্ড পূরণ করতে না পারায় ২০০৮-০৯ মেয়াদে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের যৌথ মূল্যায়নে বাংলাদেশ সব ক্যাটাগরিতেই নন-কমপ্লায়েন্ট হিসেবে বিবেচিত হয়, যা অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক খাতের জন্য খারাপ বার্তা নিয়ে আসে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে ২০১৪ সালে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে আসতে সমর্থ হয়। ২০১৬ থেকে '২১ সাল পর্যন্ত এফএটিএফের রিপোর্টে মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে বিভিন্ন মানদণ্ডে বাংলাদেশ কমপ্লায়েন্ট কান্ট্রির মর্যাদা পেয়েছে। এই উন্নতির ধারা থেকে বিএফআইইউর সফলতার পরিধি স্পষ্ট। এক সময়ের ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় থাকা আমাদের কর্মকর্তারা এখন বিশেষজ্ঞ বক্তা ও এপিজির মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরিতে কাজ করছেন। মালদ্বীপ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার মানি লন্ডারিং এবং সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ ব্যবস্থার উন্নয়নে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছেন।

সমকাল :প্রতি বছর দেশ থেকে প্রচুর অর্থ পাচার হয় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ বেশি পাচার হয়ে থাকে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এ বিষয়ে আপনাদের পর্যবেক্ষণ কী?
মাসুদ বিশ্বাস :গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) সাম্প্রতিক এক সমীক্ষার রিপোর্ট আমাদের নজরে এসেছে। নিশ্চয় জানেন, জিএফআই একটি গবেষণা সংস্থা। তারা দুটি পদ্ধতি ব্যবহার করে উন্নয়নশীল দেশ থেকে কী পরিমাণ অর্থ বা সম্পদ যায় তার প্রাক্কলন করে। আইএমএফের তথ্য ব্যবহার করে যে প্রাক্কলন করা হয়েছে, তাতে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে অর্থ পাচার হয়। অন্যদিকে জাতিসংঘের তথ্য ব্যবহার করে দেখাচ্ছে, নিট ১ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত দেশে এসেছে। ফলে সংস্থাটি নিজেও তাদের পদ্ধতি একেবারে সঠিক মনে করে না। তবে হ্যাঁ, বাণিজ্যভিত্তিক মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে ব্যাংকগুলোতে আরও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা বিষয়ে 'ট্রেডবেজড মানি লন্ডারিং নীতিমালা' জারি করা হয়েছে। এটা প্রতিরোধে ব্যাংকারদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সহযোগিতায় এ ধরনের তদারকি আরও জোরদার ও ডিজিটালাইজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মানি লন্ডারিংয়ের আলোচিত সব কেস বিএফআইইউ ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে শনাক্ত করা হয়েছে। বিএফআইইউর পরিদর্শনে বা অন্য কোনো মাধ্যম থেকে এ ধরনের তথ্য পাওয়ার পর দ্রুততার সঙ্গে অন্য সংস্থায় পাঠানো হয়।

সমকাল :বিদেশে অর্থ পাচারের কথা অনেক শোনা গেলেও ফেরত আনার ঘটনা হাতে গোনা। পাচার করা অর্থ আশানুরূপ ফেরত আনা সম্ভব হচ্ছে না কেন?
মাসুদ বিশ্বাস :পাচারের অর্থ ফিরিয়ে আনা একটি রিলে দৌড়ের মতো। এখানে বিএফআইইউর দায়িত্ব হলো পাচার বিষয়ে বিদেশ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে দুদক, সিআইডি বা এনবিআরকে সরবরাহ করা। বিএফআইইউ বিভিন্ন সময়ে সুইজারল্যান্ডসহ বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, হংকং, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, সিংগাপুর, কানাডা ইত্যাদি দেশ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে বিভিন্ন সংস্থায় পাঠিয়েছে। আমার জানামতে, এ ধরনের বেশ কিছু মামলা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াধীন। তবে এখানেই শেষ নয়। বাংলাদেশে বিচার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর যেখানে গেছে তাদের কাছে অর্থ ফেরত দেওয়ার অনুরোধ করতে হয়। সেখানকার আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের পর অর্থ ফেরত পাওয়া-না পাওয়ার বিষয় থাকে। এটি একটি জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া।

সমকাল :মানি লন্ডারিং ও অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইন প্রয়োগে কোনো সমস্যা দেখেন কি?
মাসুদ বিশ্বাস :বাংলাদেশের মানি লন্ডারিং আইন অত্যন্ত শক্তিশালী। এটা প্রয়োগে বর্তমানে দুদক ছাড়াও পাঁচটি সংস্থাকে ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে। এখন কিন্তু মানি লন্ডারিং আইনে মামলার সংখ্যাও বেড়ে গেছে। বেশ কিছু মামলায় আদালত থেকে চূড়ান্ত রায় পাওয়া গেছে। মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণ ও কর্মপন্থা প্রণয়নে 'জাতীয় সমন্বয় কমিটি' কাজ করছে। ওই কমিটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কাজ করছে 'ওয়ার্কিং কমিটি'। বিএফআইইউ কমিটি দুটিতে যাবতীয় সাচিবিক সহায়তা দেয়। এ ছাড়া মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে একটি কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে জাতীয় ও বিভাগীয় পর্যায়ে দুই স্তরের টাস্কফোর্স রয়েছে। দ্রুত তথ্য বিনিময়ের জন্য বিএফআইইউর সঙ্গে ২৩টি মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সংস্থা গো এমএমএল মেসেজ বোর্ডে সংযুক্ত।

সমকাল :বাংলাদেশ থেকে কী পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে, সে বিষয়ে সরকার বা বিএফআইইউর কাছে কোনো তথ্য আছে কি? এটা নিরূপণে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কিনা?
মাসুদ বিশ্বাস :কী পরিমাণ অর্থ পাচার হয়, তা নিরূপণ করা যে কোনো দেশের জন্যই বেশ কঠিন। বিভিন্ন ধরনের নমুনার ভিত্তিতে কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা এ ধরনের স্টাডি করে থাকে। সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের প্রত্যক্ষ সমর্থন ও সহযোগিতায় ইউএনওডিসি বাংলাদেশ থেকে পাচার করা অর্থ নিরূপণে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ওই প্রকল্পে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা কাজ করছে। বিএফআইইউ পুরো প্রকল্প সমন্বয় করছে। এ ছাড়া বিএফআইইউর বিভিন্ন পর্যালোচনা ও সরেজমিন পরিদর্শনে কিছু এমএফএস এজেন্টের হুন্ডিতে সংশ্নিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এদের এজেন্টশিপ বাতিল এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় তালিকা পাঠানো হয়। অবৈধ হুন্ডি প্রতিরোধে বিএফআইইউর পাশাপাশি বাংলাদেশ পুলিশের বেশ কয়েকটি ইউনিট কাজ করছে।