বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ কার্যক্রম শুরুর দুই দশক পূর্ণ হচ্ছে আজ। এ কার্যক্রম শুরুর এক যুগ পর্যন্ত বৈশ্বিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় ছিল বাংলাদেশ। সেখান থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব হয় ২০১৪ সালে। পরবর্তী সময়ে এ ক্ষেত্রে 'কমপ্লায়েন্ট কান্ট্রি'র মর্যাদাও পেয়েছে বাংলাদেশ। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ এখন মালদ্বীপ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কাকে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির ফলে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কর্মকর্তারা এখন অন্য দেশের ঝুঁকি মূল্যায়নকারী হিসেবে কাজ করছেন।

মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। এশিয়ার মধ্যে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, মিয়ানমার, আফগানিস্তান ও কম্বোডিয়া এখনও ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় রয়েছে। এ তালিকায় থাকলে অন্য দেশের সঙ্গে করসপনডেন্ট ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে কিছুটা ঝক্কি পোহাতে হয়। অনেক দেশের ব্যাংক এলসি নিতে চায় না। নিলেও এলসি কনফারমেশন চার্জ বেশি দিতে হয়। যে কারণে কমপ্লায়েন্ট কান্ট্রির মর্যাদা পাওয়াকে বড় করে দেখা হয়।

সংশ্নিষ্টদের মতে, লেনদেন ব্যবস্থা যত আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে আসবে মানি লন্ডারিংয়ের ঝুঁকিও তত কমবে। কেননা ঘুষ, অবৈধ লেনদেন, সন্ত্রাসে অর্থায়নসহ অপরাধমূলক যে কোনো লেনদেন বেশিরভাগ হয় নগদে। তবে কোনো না কোনো পর্যায়ে তা ব্যাংক থেকে উত্তোলন হয়। টাকার গতিপথ দেখে অনেক বড় অপরাধ শনাক্ত করেছে বিএফআইইউ। ভারতে আটক প্রশান্ত কুমার হালদার (পিকে হালদার) দেশে থাকা অবস্থায় চার আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে আত্মসাৎ করা অর্থ পাচারের তথ্য উদ্ঘাটন করে বিএফআইইউ। আলোচিত ক্রিসেন্ট লেদার, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, হলমার্ক, বেসিক ব্যাংক, ডেসটিনি, যুবক, ইউনিপেসহ বড় অনেক আর্থিক কেলেঙ্কারির মামলাও হয় এ সংস্থার রিপোর্টের ভিত্তিতে। বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ঘুষ কেলেঙ্কারির দায়ে পদত্যাগে বাধ্য হন বিএফআইইউর রিপোর্টের পর। ৫০টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের জালিয়াতির ঘটনাতেও অনুসন্ধান চালাচ্ছে এ সংস্থা। এরই মধ্যে ৩৪টি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে পরিদর্শন শেষ করে সরকারের কাছে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। গত ২০ বছরে এ রকম নানা সফলতা রয়েছে সংস্থাটির।

বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রচলিত সেবার পাশাপাশি এখন ডিজিটাল লেনদেনে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মোবাইল অ্যাপ, অনলাইন ব্যাংকিংয়ে জোর দিয়েছে বেশিরভাগ ব্যাংক। মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছানো হচ্ছে। যে কারণে আগে কখনও ব্যাংকে আসতেন না এমন অনেক মানুষ এখন আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে লেনদেন করছেন। অবশ্য ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেন বাড়ার ফলে সাইবার ঝুঁকি বাড়ছে। এ ঝুঁকি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দিকনির্দেশনার পাশাপাশি ব্যাংকগুলো নানা উদ্যোগ নিচ্ছে।

যেভাবে আনুষ্ঠানিকতা পেল মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ ব্যবস্থা :বৈশ্বিক মানি লন্ডারিং প্রতিরোধের আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপের শুরু তিন দশকের বেশি আগে। ১৯৮৯ সালে জি-২০ দেশগুলো বসে মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধের আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠান ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স (এফএটিএফ) প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এফএটিএএফের সুপারিশ বাস্তবায়নকারী সংস্থা এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং (এপিজি)। বাংলাদেশ এপিজির প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য হলেও ২০০২ সালের আগ পর্যন্ত আলাদা কোনো আইন বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছিল না। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ হামলার পর বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বদলে যায়। বিশ্ব বাণিজ্যে নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে পড়তে থাকে বিভিন্ন দেশ। এ রকম এক পরিস্থিতির মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ২০০২ সালে বাংলাদেশই প্রথম মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন করে। ওই বছরই বাংলাদেশ ব্যাংক মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ নামে আলাদা একটি বিভাগ প্রতিষ্ঠা করে। পরে যা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বা বিএফআইইউ নামে স্বতন্ত্র সংস্থায় রূপ পেয়েছে।

ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে আসা : বাংলাদেশ এফএটিএফের সদস্য হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত তিন ধাপে মূল্যায়ন হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ২০০৩ সালের মধ্যে মানি লন্ডারিংকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। তাতে উতরে যায় বাংলাদেশ। এরপর জাতিসংঘের কনভেনশনের বাধ্যবাধকতা ও এফএটিএফের মানদণ্ডের আলোকে ৪০টি সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়। ২০০৮-০৯ মেয়াদে দ্বিতীয় দফা মূল্যায়নে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) যৌথ মূল্যায়নে বাংলাদেশ সব ক্যাটাগরিতেই নন-কমপ্লায়েন্ট বিবেচিত হয়। তখন ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচ অনেক বেড়ে যায়। এরপর সব পর্যায়ে নড়েচড়ে বসে। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের নেতৃত্বে এ-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠিত হয়। প্রতি তিন মাস অন্তর এই কমিটির পক্ষ থেকে প্রতিবেদন পাঠানো হতো। নানা উদ্যোগের পর অবশেষে কালো বা ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে আসার সুখবরটি মেলে ২০১৪ সালে। ওই বছরে ৯ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত এফএটিএফের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও পর্যালোচনা দলের (আইসিআরজি) সভায় ধূসর তালিকা থেকে বাংলাদেশকে বের করার প্রস্তাব করে যুক্তরাষ্ট্র। অন্য দেশগুলো তাতে সায় দেয়। এরপর ২০১৫-১৬ মেয়াদে এপিজির তৃতীয় পর্যায়ের মূল্যায়নে কমপ্লায়েন্ট কান্ট্রির মর্যাদা পায় বাংলাদেশ। চতুর্থ পর্যায়ের মূল্যায়ন হবে ২০২৪-২৫ মেয়াদে। মানি লন্ডারিং ঠেকানোর অন্যতম একটি উপায় হলো যে কোনো পর্যায় থেকে অভিযোগ গ্রহণ। সহজে অভিযোগ পাওয়া, নিজেদের উদ্যোগ তুলে ধরাসহ বিভিন্ন বিষয় মাথায় রেখে চলতি বছর বিএফআইইউ একটি স্বতন্ত্র ওয়েবসাইট খুলেছে। সেখানে অনেকেই অভিযোগ করছেন।

মানি লন্ডারিং ঠেকাতে তথ্য বিনিময় :মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে বিভিন্ন ব্যবস্থার পাশাপাশি বিএফআইইউ ২০১৩ সালে বিশ্বের ১৬৭টি দেশের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের আন্তর্জাতিক সংগঠন এগমন্ট গ্রুপের সদস্যপদ লাভ করে। তখন থেকেই এগমন্ট সিকিউর ওয়েবের মাধ্যমে মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন বিষয়ে তথ্য বিনিময় করছে তারা। এর বাইরে ৭৮টি দেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এতে তথ্য বিনিময় সহজ হয়েছে। আবার দেশের মধ্যে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শেয়ারবাজার-সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠান, এনজিও, বীমাসহ আর্থিক লেনদেন-সংশ্নিষ্ট ১৭ ধরনের প্রতিষ্ঠান বিএফআইইউর রিপোর্ট প্রদানকারী সংস্থা। এসব সংস্থা থেকে গত অর্থবছর পাঁচ হাজার ২৮০টি সন্দেহজনক রিপোর্ট এসেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশের বিভিন্ন সংস্থা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গেও তথ্যবিনিময় করে বিএফআইইউ। ২০২০-২১ অর্থবছরে বিএফআইইউ অন্য সংস্থার সঙ্গে ১ হাজার ৪৮১টি আর্থিক তথ্য বিনিময় করেছে। আগের বছর যা ছিল ৯০৩টি।

বাণিজ্যের আড়ালেই বেশি পাচার :অবৈধ উপায়ে অর্জিত কিংবা কর ফাঁকির লক্ষ্যে দেশ থেকে প্রতি বছর প্রচুর অর্থ পাচারের খবর মিলছে। গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, শুধু আমদানি-রপ্তানির আড়ালে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর প্রায় ৮ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার পাচার হচ্ছে। এ নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার ঠেকাতে ২০২০ সালে আলাদা নীতিমালা করেছে বিএফআইইউ। এটি বাস্তবায়নে চলতি বছর ব্যাংকগুলোর ঋণপত্রের তথ্য নির্দিষ্ট একটি ডাটাবেজে নেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে দর ঠিক আছে কিনা, যে পণ্য আনা বা পাঠানোর ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে- আসলে তা এলো বা গেল কিনা, অনলাইন ব্যবস্থায় তাও যাচাই করা হবে। এই নীতিমালা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।