হোম টেক্সটাইল খাতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া ও সম্ভাবনা নিয়ে সমকালের সঙ্গে কথা বলেছেন মমটেক্স এক্সপো লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার আবুল বাশার। আলাপচারিতায় উঠে এসেছে এ খাতের চ্যালেঞ্জসহ প্রাসঙ্গিক নানা বিষয়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনোয়ার ইব্রাহীম

সমকাল :করোনার ধকল কাটিয়ে ওঠার পর গত অর্থবছরে হোম টেক্সটাইল পণ্য রপ্তানিতে ৪৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর পেছনে কারণ কী?
আবুল বাশার :প্রথমত, করোনার প্রভাব কাটিয়ে ওঠার পর বিশ্বব্যাপী পণ্য চাহিদা বেড়েছে। দ্বিতীয়ত, মহামারি পরিস্থিতিতে ভারত ও চীনে যখন উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল, সেখানে বাংলাদেশ দ্রুততম সময়ে উৎপাদন কার্যক্রমে ফিরেছে। ফলে অনেক ক্রেতা বাংলাদেশকে রপ্তানি আদেশ দিয়েছেন। এ কারণেও কিছু রপ্তানি বেড়েছে।

সমকাল :গত এক দশকে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ৭৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এলেও হোম টেক্সটাইলে এসেছে ২৫ শতাংশ। বিপুল সম্ভাবনা থাকার পরও হোম টেক্সটাইলে প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক কম কেন?
আবুল বাশার :দেখুন, তৈরি পোশাকশিল্পে উৎপাদন সক্ষমতা যতটা বেড়েছে, হোম টেক্সটাইলে সে তুলনায় পরিবর্তন নেই। গার্মেন্টস কোম্পানি যেখানে প্রায় চার হাজার, সেখানে রপ্তানিমুখী হোম টেক্সটাইল কোম্পানি মূলত তিনটি- জাবের অ্যান্ড জোবায়ের, এসিএস টেক্সটাইল ও মমটেক্স এক্সপো। আরও কয়েকটি কোম্পানি আছে বটে, তবে সেগুলো খুব একটা বড় নয়। এ খাতে যে সম্ভাবনা রয়েছে, সে তুলনায় বিনিয়োগ কম।

সমকাল :কারণ কী?
আবুল বাশার :হোম টেক্সটাইল কোম্পানির একটি মেশিনের ক্রয়মূল্য দিয়ে পুরো একটি গার্মেন্টস কোম্পানি করা যায়। ৩০০-৪০০ কোটি টাকার কমে এ শিল্প গড়ার কথা ভাবাই যায় না। যেখানে ২০-৩০ কোটি টাকা নিয়ে গার্মেন্টস কোম্পানি করা যায়। ফলে সবাই গার্মেন্টস কোম্পানি করে, হোম টেক্সটাইল নয়। আবার ব্যাংকগুলোও এত বড় শিল্পের জন্য অর্থায়ন করার ক্ষমতা রাখে না। তার ওপর শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান বা ভারতের চেয়ে আমাদের দক্ষ জনশক্তি খুবই কম। এটা শুধু শ্রমনির্ভর শিল্প নয়। এখানে প্রযুক্তির প্রয়োগ বেশি। এর অভাবও হোম টেক্সটাইলে বিনিয়োগ কম হওয়ার কারণ।

সমকাল :অর্থায়ন ও দক্ষ কর্মীর অভাবই কি এ খাতের বড় হওয়ার পথে প্রধান অন্তরায়?
আবুল বাশার :হ্যাঁ, এ দুটি বড় সমস্যা। তবে এর থেকেও বড় সমস্যা হলো মানসম্পন্ন এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ না পাওয়া। জাতীয় গ্রিড থেকে সবসময় ও চাহিদা অনুযায়ী মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণেও অনেক কারখানা নিজেরাই ক্যাপটিভ পাওয়ার প্লান্ট করেছে। এই প্লান্টগুলো আবার গ্যাসভিত্তিক। প্রায়ই গ্যাসের চাপ কম থাকায় এই পাওয়ার প্লান্টগুলোও ঠিকমতো সচল রাখা যাচ্ছে না। এ কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগের পর কারখানা ঠিকমতো সচল রাখতে না পারলে ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। এ কারণেও এ খাতে বিনিয়োগ কম। এর বাইরে ব্যবসায়ীদের মধ্যে হোম টেক্সটাইল ব্যবসার অভিজ্ঞতাও কম। এটাও বিনিয়োগ কম হওয়ার একটা কারণ হতে পারে।

সমকাল :ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে পশ্চিমা দেশগুলোতে মূল্যস্ম্ফীতি বেড়েছে। কোনো কোনো দেশ মন্দায় পড়তে যাচ্ছে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। সেটি হলে বাংলাদেশের হোম টেক্সটাইলে কোনো প্রভাব পড়বে কিনা?
আবুল বাশার :মন্দা হলেও ধনীদের জীবনযাত্রার ব্যয় খুব একটা কমে না। সমস্যা হয় মধ্য ও নিম্নবিত্ত মানুষের। অন্য সব দেশের চেয়ে পশ্চিমা দেশগুলোতে মধ্যবিত্ত বেশি। তাঁরা সাধারণত যে জীবনযাত্রায় একবার অভ্যস্ত হন, অর্থনৈতিক সংকট হলেও সেখান থেকে খুব একটা নিচে নামেন না। অর্থাৎ যে মানের পণ্য কিনে তাঁরা অভ্যস্ত, সে পণ্যের বাইরে যেতে চান না। আয় কমলে হয়তো তাঁরা পণ্য কেনা কমিয়ে দেন। মন্দা হলে দামি পণ্যের চাহিদা কমবে, এটা ঠিক। অন্যদিকে, খুব বেশি কমমূল্যের বা বেসিক পণ্যের চাহিদাও বাড়বে না। মন্দায় তাঁদেরও চাহিদা কমবে। ফলে ইউরোপ ও আমেরিকার মন্দার কারণে হোম টেক্সটাইলে অভিঘাত আসার আশঙ্কা আছে।

সমকাল :বলা হচ্ছে, চীন ক্রমেই টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাকশিল্প থেকে সরে যাচ্ছে। এ সুবিধা কি তাহলে বাংলাদেশ নিতে পারবে?
আবুল বাশার :অবশ্যই পারব। তবে তার জন্য রপ্তানিমুখী সক্ষমতা সম্পন্ন কারখানা বাড়াতে হবে। পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্পে চীনের বিনিয়োগ ধীরে ধীরে কমছে এটা সত্য। এর কারণ, এ খাতে অনেক বেশি রাসায়নিক ব্যবহার হয়, যা পরিবেশের ওপর ভয়াবহ ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। তা ছাড়া এ খাতের মুনাফা তুলনামূলক কম। চীন এখন হাইটেক ও ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিতে বেশি বিনিয়োগ করছে। গার্মেন্ট ও হোম টেক্সটাইলে তাদের ছেড়ে দেওয়া ব্যবসার একটা অংশ বাংলাদেশে আসছে। কিন্তু যতটা আসতে পারত, ততটা আসছে না। কারণ ওই একটাই- আমাদের সক্ষমতা এখনও অনেক কম।
তার ওপর বিদেশি ক্রেতারা পণ্য কেনার আগে কারখানাটি কতটা পরিবেশসম্মতভাবে স্থাপন করা হয়েছে, তা নিশ্চিত হতে চায়। এখানে আমাদের অনেক ঘাটতি আছে। দেখুন, হোম টেক্সটাইল পণ্যের রপ্তানিকারক কোম্পানি হাতেগোনা কয়েকটি হলেও দেশের চাহিদা মেটানোর জন্য শতাধিক কোম্পানি আছে। যারা পরিবেশগত দিক পাত্তাই দেয় না। ডাইংয়ের পর রাসায়নিকযুক্ত পানি সরাসরি খালে, বিলে বা নদীতে ফেলছে। এ কারণে আমাদের নদীর ইকো-সিস্টেম নষ্ট হচ্ছে, মাছের উৎপাদন কমছে। এই বিষ যখন ফসলি জমিতে পড়ছে, সেখানকার উৎপাদন ক্ষমতা কমছে। এমনকি মানুষের শরীরে ঢুকেও ভয়ংকর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। শুধু রপ্তানি বাড়াতে নয়, নিজের দেশকে বাঁচানোর জন্য হলেও এসব কোম্পানিকে 'কমপ্লায়েন্স'-এর মধ্যে আনা উচিত। এর ফলে দুটি উপকার হবে। এক. দেশ বাঁচবে, দুই. রপ্তানি আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে।

সমকাল :পরিবেশগত ঝুঁকি কাটাতে এ ক্ষেত্রে কার অগ্রণী ভূমিকা আশা করছেন?
আবুল বাশার :অবশ্যই সরকারের। সরকার চাইলে দ্রুততম সময়ে এর প্রতিকার করতে পারে। আমার মনে হয়, টেক্সটাইল ও গার্মেন্ট শিল্প এত বড় যে, এ জন্য এখন পৃথক মন্ত্রণালয় করা যেতে পারে। মন্ত্রণালয় হলে এ খাতের সমস্যাগুলো সহজে নজরদারি করা এবং সমস্যাগুলো দ্রুত চিহ্নিত করা এবং কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরেরও বড় ভূমিকা রাখা উচিত।