অনেকটাই নীরব বিপ্লব ঘটছে দেশের হোম টেক্সটাইল খাতে। রপ্তানি পণ্য হিসেবে কখনোই খুব বেশি আলোচনায় ছিল না হোম টেক্সটাইল। তবে অন্য অনেক পণ্যকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় প্রধান রপ্তানি খাতের মর্যাদা এখন হোম টেক্সটাইলের দখলে। রপ্তানি আয়ের হিসেবে তৈরি পোশাকের পরই এর অবস্থান। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত ১১ মাসে এ খাতের রপ্তানি ১৪৭ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। এ সুবাদে দেশের মোট রপ্তানি আয়ে এ খাতের অবদান এখন তিন শতাংশের বেশি।

বৈশ্বিক অতিমারি করোনার মধ্যেই রপ্তানিতে গত অর্থবছর প্রথমবারের মতো ১০০ কোটি ডলারের ঘর ছাড়ায় হোম টেক্সটাইল খাত। মোট রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়ায় ১১৩ কোটি ডলার। রপ্তানির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় শতভাগ জোগান দেওয়া হচ্ছে স্থানীয়ভাবে। স্থানীয় বাজার রয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকার। তবে তুলাসহ বেশিরভাগ কাঁচামালে আমদানিনির্ভরতা, দক্ষ জনবল ও অর্থায়নের অভাব এবং গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ না থাকাকে এখনও বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন উদ্যোক্তা ও রপ্তানিকারকরা। তাঁদের মতে, এসব সমস্যা সমাধান করা গেলে এ খাতে অভ্যন্তরীণ বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি রপ্তানি দ্বিগুণ করা সম্ভব।

সাম্প্রতিক সময়ে মূলত করোনার সুবাদেই হোম টেক্সটাইলে সুদিন আসে। দেশে দেশে লকডাউনে ঘরবন্দি মানুষের মাঝে হোম টেক্সটাইলের বিভিন্ন পণ্যের ব্যবহার বেড়ে যায়। আবার এ সময় রপ্তানিকারক অনেক দেশেও লকডাউন চলছিল। ব্যতিক্রম ছিল বাংলাদেশ। বেশিরভাগ সময়ই রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য লকডাউন শিথিল ছিল। এ সময় তৈরি পোশাকের মতো হোম টেক্সাইল রপ্তানিতেও নতুন গতি আসে। এ ছাড়া গুণমানসম্পন্ন হোম টেক্সটাইল পণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগও কিছুটা বেড়েছে। পরিবেশসম্মত উৎপাদন কাঠামোও বৈশ্বিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের হোম টেক্সটাইলের কদর বাড়িয়েছে। আবার অভিজাত ভোক্তারা রুচির বদলে এবং বিভিন্ন উপলক্ষে নিয়মিত বিরতিতে এ ধরনের পণ্য পরিবর্তন করে থাকে। এ প্রবণতা বাড়ছে। ফলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের হোম টেক্সটাইলের চাহিদা বাড়ছেই।

হোম টেক্সটাইল পণ্য কী :হোম টেক্সটাইল মূলত বাসাবাড়িতে ব্যবহার করা বিভিন্ন ধরনের বস্ত্রপণ্য। বিছানার চাদর, বালিশ, বালিশের কাভার, টেবিল ক্লথ, পর্দা, ফ্লোরম্যাট, কার্পেট, জিগজ্যাগ গালিচা, ফার্নিচারে ব্যবহার করা ফেব্রিক্স, তোশক, পাপোশ, কৃত্রিম ফুল, নকশিকাঁথা, কমফোর্টার, বাথরুম টাওয়েল, রান্নাঘর ও ঘর সাজাতে ব্যবহার করা নানা ধরনের বস্ত্রসামগ্রী এ খাতের অন্তর্ভুক্ত। এ শিল্পের প্রধান কাঁচামাল তুলা, পাট, শন, রেশম, ভেড়া-ছাগলের পশম ইত্যাদি। এ ছাড়া সম্প্রতি কৃত্রিম তন্তুর ব্যবহারেরও হোম টেক্সটাইল উৎপাদিত হচ্ছে দেশে। বিশ্বের ৪৭টি দেশে বাংলাদেশের হোম টেক্সটাইল পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। এর মধ্যে প্রধান বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আমেরিকা। হোম টেক্সটাইলের ৬০ শতাংশ ব্যবহার হয় সেখানে। বাংলাদেশের হোম টেক্সটাইলের ৮০ শতাংশই যায় এ দুই বাজারে। অন্য বাজারের মধ্যে জাপান, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া উল্লেখযোগ্য।

হোমটেক্সের বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অবস্থান :হোম টেক্সটাইলের বিশ্ববাজার এখন ১৩১ বিলিয়ন ডলারের। বাজার গবেষণা ও অ্যাডভাইজরি ফার্ম মরডর ইন্টেলিজেন্সের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী ২০২৫ সাল নাগাদ এই বাজার ১৮০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হতে পারে। বর্তমানে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অংশ সাত শতাংশের কিছু বেশি। বাংলাদেশ প্রতিবছর গড়ে ১০০ কোটি ডলারের হোম টেক্সটাইল রপ্তানি করে থাকে। রপ্তানি খাতের অন্যান্য পণ্যের মতো যুক্তরাষ্ট্র বাদে প্রায় সব বাজারে শুল্ক্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা পাচ্ছে হোম টেক্সটাইল।

তৈরি পোশাকের মতো হোম টেক্সটাইলের বিশ্ববাজারও চীনের দখলে। অন্যান্য রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে তুরস্ক, ভিয়েতনাম, ভারত, পাকিস্তান উল্লেখযোগ্য। এইচঅ্যান্ডএম, ওয়ালমার্ট, জারা হোম, কেরিফোর, লিডল, মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার, মরিচ ফিলিপ, লিটলউড, টার্গেট, আইকিয়া, আলদি বাংলাদেশের হোম টেক্সটাইল পণ্যের সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ড এবং ক্রেতা প্রতিষ্ঠান। করোনার কারণে চীনের অনেক এলাকায় লকডাউন এখনও রয়েছে। এ ছাড়া পরিবেশ সুরক্ষা ইস্যুর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক্ক লড়াই নিয়েও সংকটে রয়েছে দেশটি। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে হোম টেক্সটাইলের খাতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় আরও বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা সম্ভব বলেও মনে করেন অনেকে। বর্তমানে দেশের ১৪৭টি কারখানায় হোম টেক্সটাইল পণ্য উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে ৬০টি প্রতিষ্ঠান সরাসরি রপ্তানি করে থাকে। এর মধ্যে শীর্ষে পাঁচ প্রতিষ্ঠান হচ্ছে- জাবের অ্যান্ড জোবায়ের ফেব্রিক্স, সাদ মুসা গ্রুপ, অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, ক্লাসিক্যাল হোমটেক্স ও এসিএস টেক্সটাইলস।

বাড়ছে রপ্তানি আয় :দেশের মোট রপ্তানি আয়ে তৈরি পোশাকের দাপট নিরঙ্কুশ। মোট রপ্তানি আয়ের ৮২ শতাংশ এ খাতের দখলে। রপ্তানিতে অংশীদারিত্বের বিবেচনায় দ্বিতীয় হোম টেক্সটাইলের অংশ ৩ দশমিক ১০ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের গত ১১ মাসে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে হোম টেক্সটাইল খাতের। আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে রপ্তানি বেড়েছে ৪১ শতাংশ।

বড় হচ্ছে অভ্যন্তরীণ বাজারও :সংশ্নিষ্টরা বলছেন, রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি এ খাতের স্থানীয় বাজারও বাড়ছে। বিশেষ করে আবাসন খাত এগিয়ে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে হোম টেক্সটাইলেও। পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে অনেকের ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে। ফ্ল্যাট বা বাসাবাড়িতে দরজা-জানালার পর্দা, বিছানার চাদর, কিচেন-ডাইনিংয়ের বস্ত্রপণ্যের বেশ ভালো চাহিদা তৈরি হয়েছে। এতে হোম টেক্সটাইলের অভ্যন্তরীণ বাজারও বড় হচ্ছে। হোম টেক্সটাইল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য বলছে, এ বাজার এখন আনুমানিক ১০ হাজার কোটি টাকার।

চ্যালেঞ্জ রয়েছে যেসব :হোম টেক্সটাইল খাতের বড় সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে প্রধান কাঁচামাল তুলার সংকট এখনও বড় প্রতিবন্ধকতা। দেশে তুলা উৎপাদন বলতে গেলে হয় না। প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। হোম টেক্সটাইল খাতের বেশ কয়েকজন উদ্যোক্তা ও রপ্তানিকারকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তুলা ছাড়াও ডাইস কেমিক্যালসহ অন্যান্য রাসায়নিক কাঁচামালের পুরোটা আমদানি করতে হয়। এতে সময় ও ব্যয় দুটিই বাড়ছে। অথচ প্রতিযোগী প্রায় সব দেশে নিজস্ব তুলা আছে। একই সঙ্গে অবকাঠামো, গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ না থাকাকেও বড় বাধা মনে করেন উদ্যোক্তারা। তাঁদের মতে, গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যায় পণ্যের ফিনিশিং মান খারাপ হয়ে যাচ্ছে প্রায়ই। সাম্প্রতিক সময়ে কাঁচামালের দামের ঊর্ধ্বগতি, জাহাজভাড়া বৃদ্ধিতেও সমস্যায় রয়েছে এ খাত।