সমকাল :আমদানির বিকল্প ফসল হিসেবে ডাল, তেলবীজ, মসলাজাতীয় ফসল ও ভুট্টা চাষে ভর্তুকির আওতায় ৪ শতাংশ রেয়াতি সুদে ঋণ দিতে ব্যাংকগুলোকে তাগিদ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সুবিধার ফলে উৎপাদন বাড়বে বলে মনে করেন কিনা?

বেনজীর আলম :বাংলাদেশ ব্যাংকের এ উদ্যোগ বেশ ভালো। কৃষকের কাছে অনেক সময় টাকা থাকে না। কৃষক পুঁজি পেলে
ফসল চাষ করতে পারেন। ব্যাংক ঋণে সুদের হার কম হওয়ার কারণে কৃষক উৎপাদনে আগ্রহী হবেন।

সমকাল :আমদানি বিকল্প ফসলের উৎপাদন এখন কেমন?

বেনজীর আলম :আমাদের জমির পরিমাণ কম। ফলে আমাদের প্রথমে ধান উৎপাদন করতে হয়। কারণ প্রতিবছর আমাদের ২০ থেকে ২৫ লাখ নতুন মানুষ যুক্ত হচ্ছে। তাঁদের জন্য দানাজাতীয় খাবার বাড়াতে হয়। পাশাপাশি আমাদের তেলজাতীয় ফসল উৎপাদনে ঘাটতি আছে। সে ঘাটতি মেটাতে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। প্রতি বছর আমাদের ৫০ লাখ হেক্টর বোরো এবং ৫৯ লাখ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়। আমরা দেখেছি, আমন ও বোরোর মাঝখানে অনেক দিন প্রায় ২০ লাখ হেক্টর জমি পতিত থাকে। এই পতিত জমিতেই স্বল্পমেয়াদের সরিষা আবাদের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। কৃষককে স্বল্প মেয়াদের আমন ধান চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে, যাতে কৃষক আমন কাটার পর জমি ফেলে না রাখেন। স্বল্পমেয়াদি বারি ১৪, বারি ১৭ ও বিনা ৯ জাতের সরিষার আবাদ করতে পারবেন তাঁরা।

সরিষা তুলে বোরো ধান রোপণ করতে পারবেন। এর বাইরে চর এলাকায় বাদাম চাষে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

আমরা স্বল্পমেয়াদি ধানের জাত উদ্ভাবন ও তা কৃষকের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি। এতে মাঝে কৃষক ভালো সময় পাবেন। পাশাপাশি আমরা কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের অধীনে দ্রুত ফসল কাটা ও রোপণের ব্যবস্থা করছি। এসব কারণে মাঝে কৃষক তেল ও ডালজাতীয় ফসল চাষ করার জন্য যথেষ্ট সময় পাবেন। ধানের উৎপাদন ঠিক রেখেই তেল ও ডালজাতীয় ফসলের উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছি এবং আগামীতে উৎপাদন বাড়বে। আমাদের সম্ভাবনার দ্বার খুলছে। আমরা সরিষাসহ তেল ও ডালজাতীয় ফসল উৎপাদনের রোডম্যাপ তৈরি করেছি। তিন বছরের মধ্যে ৪০ শতাংশ ঘাটতি মেটাতে পারব।

কৃষকরা তেলজাতীয় ফসল উৎপাদনে অভ্যস্ত হয়ে গেলে উৎপাদন আরও বেড়ে যাবে। তখন আর ভোজ্যতেলের সংকট হবে না। আমাদের সরিষার জাতগুলো খুবই উন্নতমানের। উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে আমরা আবার সেই সরিষায় ফিরে যেতে পারব। এ তেল স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। সরিষার উৎপাদন বাড়াতে আমাদের বিজ্ঞানীরা বেশ আন্তরিক। কৃষিতে নতুন নতুন উদ্যোক্তা যুক্ত হচ্ছেন। অনেক ফসলেই আমরা বিশ্বের শীর্ষ অবস্থানে আছি। দেশের কৃষিমন্ত্রী একজন কৃষিবিজ্ঞানী। তিনি নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করছি। আমরা খুব দ্রুত সফল হবো। সবার সম্মিলিত চেষ্টায় আমরা আমদানি বিকল্প ফসল উৎপাদনে এগিয়ে যাব।

সমকাল :কৃষি যান্ত্রিকীকরণের সুফল কৃষক কতটুকু পাচ্ছেন?

বেনজীর আলম :এ বছরে বোরোতে ধান কাটার যন্ত্র কম্বাইন্ড হারভেস্টার এবং রিপার বেশি ব্যবহূত হওয়ায় দ্রুততার সঙ্গে সফলভাবে ধান ঘরে তোলা সম্ভব হয়েছে। 'কৃষি যান্ত্রিকীকরণ' প্রকল্পের মাধ্যমে অঞ্চলভেদে ৫০ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশ ভর্তুকিতে কৃষকদের কৃষিযন্ত্র দেওয়া হচ্ছে। এটি সারাবিশ্বের একটি বিরল ঘটনা। এ প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষিতে নতুন অধ্যায় সূচিত হয়েছে। এর মাধ্যমে ফসল উৎপাদনে সময় ও শ্রম খরচ কমবে। কৃষক লাভবান হবেন। বাংলাদেশের কৃষিও শিল্পোন্নত দেশের কৃষির মতো উন্নত ও আধুনিক হবে। একটি কম্বাইন্ড হারভেস্টারের মাধ্যমে এক দিনে কমপক্ষে ৮ একর জমির ধান কাটা যাচ্ছে। পাশাপাশি যন্ত্রের মাধ্যমে এক দিনে ২৫ বিঘা চারা লাগানো যায়। কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষক লাভবান হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। সময় বাঁচার ফলে আলাদা তেল ও ডালজাতীয় ফসল চাষ করা যাচ্ছে। ফলে কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। কৃষি দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাবে ও কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাড়বে। কৃষির ওপর ভিত্তি করে উন্নত বাংলাদেশ হবে।

সমকাল :তেলজাতীয় ফসলের আবাদ বাড়াতে আপনারা একটি রোডম্যাপের কথা বলছেন। সেটি যদি একটু ব্যাখ্যা করেন?

বেনজীর আলম :আগামী তিন বছরের মধ্যে চাহিদার ৪০ ভাগ ভোজ্যতেল স্থানীয়ভাবেই উৎপাদনের লক্ষ্যে কর্মপরিকল্পনা বা রোডম্যাপের খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। বোরো ও আমন ধানের মৌসুমের মাঝখানে পতিত থাকে প্রায় ২০ লাখ হেক্টর জমি। এর বাইরে দেশের নদী তথা চর এলাকা এবং উপকূলীয় এলাকার জমিতে তেলজাতীয় ফসল আবাদের পরিধি বাড়ানো হবে। এ ছাড়া কোন এলাকার জমি কখন খালি পড়ে থাকে, তার তালিকা করে তেলজাতীয় ফসল চাষের আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তেলজাতীয় ফসলের মধ্যে সরিষাই মুখ্য। এর বাইরে চীনাবাদাম, তিসি, তিল, সয়াবিন ও সূর্যমুখী অন্যতম। কৃষিমন্ত্রী তেলজাতীয় ফসল উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশনা দিয়েছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিসহ এ ধরনের তিনটি প্রকল্প রয়েছে।

সমকাল :পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কোনো চ্যালেঞ্জ আছে কিনা?

বেনজীর আলম :চ্যালেঞ্জ তো থাকবেই। কৃষকদের মোটিভেশন করতে হবে। কৃষক নতুন জিনিস অনেক সময় গ্রহণ করতে চান না। এটি চ্যালেঞ্জ নয়, সময়ের বিষয়। আমরা ধীরে ধীরে কৃষককে উৎসাহী করছি। তবে মূল চ্যালেঞ্জ হলো- প্রথম দুই তিন বছর কৃষককে বীজ দিতে পারব কিনা। যত বীজ আসবে সেগুলো যেন বীজ হিসেবেই ব্যবহার করা হয়- সেই নির্দেশনা আমরা মন্ত্রণালয় থেকে পেয়েছি। ফলে বীজের চ্যালেঞ্জ আমরা কাটিয়ে উঠতে পারব।

সমকাল :অনেক সময় দেখা যায় পণ্যের উৎপাদন বাড়লে দাম পড়ে যায়, এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফলে কৃষক ধীরে ধীরে উৎপাদনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।

বেনজীর আলম :কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারের নানা উদ্যোগ রয়েছে। আমরা চাচ্ছি কৃষিকে বাণিজ্যিকীকরণ করতে। কৃষিপণ্য রপ্তানির জন্যও আমরা নানা উদ্যোগ নিয়েছি। ইতোমধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় একটি অ্যাক্রিডিটেড ল্যাব স্থাপন করা শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী পূর্বাচলে দুই একর জায়গা দিয়েছেন। সেখানে আধুনিক মানের ল্যাব ও প্যাকেজিং হাউস হবে। এতে উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রপ্তানি বাড়বে। কৃষক তাঁর ন্যায্যমূল্য পাবেন।

সমকাল :কৃষকদের বিকল্প ফসল চাষে আপনাদের পক্ষ থেকে কেমন সহায়তা থাকবে?

বেনজীর আলম :কৃষকদের কাছ থেকে বিএডিসি সরিষা বীজ হিসেবে কিনে নেবে। এরপর তা প্রণোদনা হিসেবে কৃষককে দেবে। সঙ্গে সারও দেওয়া হবে। এ ছাড়া নানা রকম প্রণোদনা তো দেওয়া হচ্ছেই। আমরা সবসময় কৃষকের পাশে আছি।