ডাল, তেলবীজ, মসলাজাতীয় ফসল আমদানিতে প্রতিবছরই ব্যয় বাড়ছে। চলতি অর্থবছরে শুধু এসব পণ্য আমদানিতে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি মূল্যমানের বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হবে। অথচ দেশে এসব ফসলের উৎপাদন বাড়ানোর বিশেষ সুযোগ রয়েছে। ভর্তুকি সুদে ঋণ নিয়ে আমদানি বিকল্প ফসল চাষ করতে পারেন কৃষক। তবে অনেক ক্ষেত্রে না জানা কিংবা ব্যাংকারদের অনীহার কারণে এসব খাতে আশানুরূপ হারে ঋণ বাড়ছে না। বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য ব্যাপক বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে আমদানি বিকল্প এসব ফসল। মাত্র ৪ শতাংশ সুদের এ ঋণ জোরদারে গত ২২ মে নতুন করে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের উৎসাহিত করার অনুরোধ জানিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

আমদানি বিকল্প ফসল চাষের তাগিদ নতুন করে এমন এক সময়ে এসেছে, যখন আমদানি দায় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে ব্যাংকগুলো। আশানুরূপ ডলার না পেয়ে প্রতিদিনই কোনো না কোনো ব্যাংক ধরনা দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। বাজার ঠিক রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি অর্থবছর এরই মধ্যে ৫৮০ কোটি ৭০ লাখ ডলার বিক্রি করেছে। যে কারণে গত আগস্টে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন ৪২ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। বৈদেশিক মুদ্রাবাজার ঠিক রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। বিলাসবহুল পণ্য আমদানিতে এরই মধ্যে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত এলসি মার্জিন বসিয়েছে। বিদেশ ভ্রমণের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।

সংশ্নিষ্টরা জানান, বৈদেশিক মুদ্রার খরচ কমাতে সরকারের সুদ ভর্তুকির আওতায় ২০০৬ সাল থেকে আমদানি বিকল্প ফসল চাষে ঋণ বিতরণের এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। শুরুর দিকে গ্রাহক পর্যায়ে ২ শতাংশ সুদে শুধু রাষ্ট্রীয় মালিকানার ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করা হতো। ওই সময় ৬ শতাংশ হারে ভর্তুকি দিত সরকার। পরে ২০১১-১২ অর্থবছর থেকে বেসরকারি ব্যাংকগুলোকেও এ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করে গ্রাহক পর্যায়ে সুদহার বাড়িয়ে ৪ শতাংশ করা হয়। শুরুতে সরকারি ভর্তুকি ৬ শতাংশ অপরিবর্তিত ছিল। তখন সাধারণ কৃষি ঋণের সুদহার নির্ধারিত ছিল ১০ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে দুই ধাপে কৃষি ঋণের সুদহার কমিয়ে ৮ শতাংশ হয়েছে। ব্যাংকগুলোর ঋণের গড় সুদহার নেমেছে ৭ শতাংশে। এরপরও সেভাবে আগ্রহ বাড়েনি। যে কারণে আমদানি নির্ভরতা যেভাবে কমার কথা, তা কমেনি।

আমদানি ব্যয় অনেক :দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তনের সঙ্গে আমদানি বিকল্প ফসলের চাহিদা বাড়ছে। এর মধ্যে দর বাড়ার কারণে চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে তেল, ডাল ও মসলা আমদানিতে ৪২২ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ২৯১ কোটি ডলার বা ২৫ হাজার কোটি টাকার কম। এর মানে ডলারের হিসাবে চলতি অর্থবছর এসব পণ্য আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে ১৩১ কোটি ডলার বা ৪৫ শতাংশের বেশি। সব মিলিয়ে গত অর্থবছর এসব আমদানিতে ব্যয় ছিল ৪৪২ কোটি ডলার। ২০১৯-২০ অর্থবছরে যেখানে ব্যয় হয় ৩৮১ কোটি ডলার। এর মানে প্রতিবছর এসব পণ্য আমদানিতে ব্যয় বাড়ছে। তবে এসব ফসল চাষে ঋণ বিতরণ তেমন বাড়ছে না। মোট কৃষি ঋণের ১ শতাংশের কম বিতরণ হচ্ছে এসব ফসলে।

কোন কোন ফসল এ ঋণ পায় :বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আমদানি বিকল্প ফসলের আওতায় যেসব খাতে ঋণ দেওয়া হয়, সে তালিকায় ডালজাতীয় ফসলের আওতায় রয়েছে মুগ, মসুর, খেসারি, ছোলা, মটর, মাষকলাই ও অড়হর। তেল বীজের আওতায় সরিষা, তিল, তিসি, চীনাবাদাম, সূর্যমুখী ও সয়াবিন। মসলাজাতীয় ফসলের আওতায় আদা, রসুন, পেঁয়াজ, মরিচ, হলুদ ও জিরা। এ ছাড়া ভুট্টা চাষেও ৪ শতাংশ সুদের এ ঋণ নিতে পারেন কৃষক। এসব খাতে ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোর জন্য প্রতিবছর একটি লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়। চলতি অর্থবছর এসব খাতে ১৫৯ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

গত ১৯ মে পর্যন্ত ব্যাংকগুলো ১২৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকা বিতরণ করেছে। মোট লক্ষ্যমাত্রার যা ৮১ দশমিক ৩৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে যেখানে কৃষি খাতে মোট ২৩ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এর মানে কৃষি ঋণের মাত্র শূন্য দশমিক ৫৪ শতাংশ দেওয়া হয়েছে আমদানি বিকল্প ফসল চাষে। গত অর্থবছর ১৪২ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১২৭ কোটি টাকা ঋণ দেয় ব্যাংকগুলো। তার আগের অর্থবছর ১০৭ কোটি, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১০৯ কোটি এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৯১ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়। ২০১১-১২ অর্থবছরে বিতরণের পরিমাণ ছিল ৭০ কোটি ৬০ লাখ টাকা। কম সুদের এ ঋণের বিষয়ে ২০২০ সালে একটি জরিপ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেখানে অংশগ্রহণকারীদের ৭৫ শতাংশই একরপ্রতি বিদ্যমান ঋণ অপর্যাপ্ত বলে উল্লেখ করেন। যদিও অংশগ্রহণকারীর বেশিরভাগই এ ধরনের ফসল চাষে ভালো মুনাফার কথা বলেন। প্রসঙ্গত, ফসলভেদে একরপ্রতি ১৭ হাজার থেকে ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয় ব্যাংক।

তদারকি বাড়িয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক :সাধারণ কৃষি ঋণের তুলনায় আমদানি বিকল্প এসব ফসলের ঋণ বিতরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাপক চাপ রয়েছে। তদারকির সুবিধার্থে প্রতি সপ্তাহে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ অগ্রগতি প্রতিবেদন নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পিছিয়ে থাকা ব্যাংকগুলোকে নানা উপায়ে উৎসাহ দেওয়া হয়। এর পরও অনেক ব্যাংক আশানুরূপ ঋণ বিতরণ করছে না। ঋণ বিতরণে অনীহার প্রধান কারণ হিসেবে সুদ ভর্তুকির টাকা পেতে বিভিন্ন নিয়ম পরিপালনকে বিবেচনা করা হয়। কেননা, বাংলাদেশ ব্যাংক এ ধরনের ঋণ দ্বৈবচয়ন ভিত্তিতে পরিদর্শন করে। সেখানে কোনো অনিয়ম ধরা পড়লে ওই ব্যাংকের এ খাতে বিতরণ করা পুরো ঋণের সমানুপাতিক অংশে আর সুদ ভর্তুকি দেওয়া হয় না। এসব কারণে নানা উপায়ে গ্রাহকদের ফিরিয়ে দেয় ব্যাংক। অথচ এ রকম ঘটনার শিকার হলে গ্রাহক তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৬২৩৬ নম্বরে ফোন করে অভিযোগ জানাতে পারেন।

ঋণ বিতরণ বাড়াতে ব্যাংকগুলোকে নতুন করে তাগিদের পাশাপাশি কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে গত ২২ মে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে চিঠি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চিঠিতে বলা হয়, আমদানি ব্যয় কমাতে সরকারের একটি অগ্রাধিকারমূলক খাত হিসেবে আমদানি বিকল্প ফসল চাষে ভর্তুকি সুদে ঋণ বিতরণ করা হয়। বর্তমানে দেশের বাজারে ভোজ্যতেলের সরবরাহ ঘাটতির কারণে আমদানিনির্ভরতা এড়িয়ে দেশেই এসব পণ্যের উৎপাদন বাড়ানো অত্যন্ত প্রয়োজন।