একজন নারী জীবনে বহুবার যৌন হয়রানির শিকার হন। সম্প্রতি এর একটি অকুস্থল হয়ে উঠেছে গণপরিবহন। প্রতিনিয়ত বাড়ছে যৌন হয়রানি, ধর্ষণ ও হত্যার মতো ঘটনা। গণপরিবহনের এই চিত্র তুলে ধরেছেন জান্নাতুল মাওয়া

জীবনকে গতিময় করতে আমাদের গণপরিবহনে নিত্য যাতায়াত করতে হয়। একদিকে রিকশা থেকে ট্রেন, অন্যদিকে বাস থেকে প্নেন- এসব গণপরিবহন আমাদের জীবনকে করেছে গতিময়; সময়কে করেছে নিয়ন্ত্রণ। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন গণপরিবহন হলো প্রাণী দ্বারা চালিত পরিবহন। সাধারণত গরু, ঘোড়া, কুকুর কিংবা অন্য প্রাণী। এরও আগের পরিবহন ছিল মানুষের পা। প্রাচীন চিত্রে বিশেষ করে রোম বা মিসর সভ্যতার প্রাচীরচিত্রে মানুষের কাঁধে চড়ে শাসক ও ব্যবসায়ী শ্রেণির যাতায়াত করতে দেখা যায়। এমনকি ভারতীয় উপমহাদেশে পালকির চলন ছিল। বর্তমানে ব্যবহূত গণপরিবহনের কাঠামোগত প্রবর্তন হয় ১০ জন যাত্রী নিয়ে। ১৮২০ সালে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সে অমনি বাস যেটি ছিল ঘোড়ার সঙ্গে গাড়ির একটি সংমিশ্রিত রূপ। গণপরিবহনের সঙ্গে জনগণের একটি যোগসূত্র রয়েছে। আদিম যুগ থেকে এই অব্দি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে গণপরিবহন ব্যবহার করে আসছে।

তবে নারীদের ক্ষেত্রে এই পরিবহন খুব একটা নিরাপত্তার জায়গা সেই প্রাচীনকালেও ছিল না, আধুনিককালেও নেই। গণপরিবহন যেন হয়ে উঠেছে নারীর জন্য নিত্যদিনের হেনস্তা এবং নির্যাতনের প্রাত্যহিক দৃশ্যমান স্থান!

গত ৮ আগস্ট (সোমবার) স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন 'সেভ দ্য রোড' প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ৫ বছর ৭ মাসে (২০১৭ থেকে ২০২২ সালের ৭ আগস্ট) সড়ক-মহাসড়কে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩৫৭ জন নারী। এই সময়ে ২৭ জনকে হত্যা করা হয়েছে। গড়ে মাসে ৫ জন ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন আরও ৬৮ জন নারী। নির্যাতনের শিকার নারীদের মধ্যে প্রতি ১০০ জনে ৬৭ জন ছিলেন বোরকা বা হিজাব পরিহিত ও ৩২ জন অন্যান্য পোশাক পরিহিত।
চলতি বছরের জুনে প্রকাশিত 'ঢাকা শহরে গণপরিবহনে হয়রানি :কিশোরী এবং তরুণীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব' শিরোনামে আঁচল ফাউন্ডেশনের এক জরিপ প্রতিবেদনে দেখা যায়, গণপরিবহনে চলতি বছর গত ৬ মাসে ৬৩ দশমিক ৪ শতাংশ কিশোরী ও তরুণী বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে আঁচল ফাউন্ডেশন। এর মধ্যে ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশকে যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ বুলিং; ১৫ দশমিক ২ শতাংশ সামাজিক বৈষম্য; ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ লিঙ্গ বৈষম্য এবং ৮ দশমিক ২ শতাংশ বডি শেমিংয়ের মতো হয়রানির মধ্য দিয়ে গেছেন। এতে দেখা যায়, যৌন নিপীড়নের শিকার নারীদের ৭৫ শতাংশই অন্য যাত্রীদের মাধ্যমে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। ২০ দশমিক ৪ শতাংশের মত, তাঁরা হেল্পার কর্তৃক এ ধরনের ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়েছে। এ ছাড়া ৩ শতাংশ হকারের মাধ্যমে এবং ১ দশমিক ৬ শতাংশ ড্রাইভারের মাধ্যমে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে সমীক্ষায় উঠে এসেছে।

সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা যাত্রীবাহী একটি বাসে গত ২ আগস্ট (মঙ্গলবার) গভীর রাতে ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ডাকাত দল বাসটি কয়েক ঘণ্টা তাদের নিয়ন্ত্রণে রেখে ভেতরে যাত্রীদের মারধর ও লুটপাট চালায়। এ সময় এক নারী যাত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়। পরে বাসটিকে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে ডাকাতরা পালিয়ে যায়।

এর আগে গত ২৪ জুলাই (রোববার) রাত ৯টার দিকে রাজধানীতে বিকাশ পরিবহনের একটি বাস থেকে লাফ দিয়ে নেমে নিপীড়কের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করেছেন এক শিক্ষার্থী। ওই নারী শিক্ষার্থী তাঁর অভিজ্ঞতার কথা ফেসবুকে লিখেছেন। তাঁর ওই ফেসবুক পোস্টটি ভাইরাল হয়েছে। ঘটনায় জড়িত বাসচালককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ অবস্থা শুধু ঢাকা শহরের নয়। গোটা দেশের অবস্থা এর চেয়ে ভালো কিছু নয়।

সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলায় বসবাসরত এক নারী শ্রমজীবী জাকিয়া রাজিয়া বলেন, 'খুব বাধ্য না হলে আমি গণপরিবহন সাধারণত পরিহার করি। দূরের কোনো রাস্তা হলে আমি ভেঙে ভেঙে পথ চলি। তাতে আমার সময় যেমন বেশি লাগে; টাকাও বেশি খরচ হয়। এর মূল কারণ হিসেবে তিনি বলেন, সাধারণত আমাদের গ্রামের দিকের পরিবহনে সিট ভরে গেলেও হেল্পপাররা আরও লোক তুলতে থাকে এবং বাসের মাঝখান দিয়ে দাঁড় করিয়ে দেয়। আর টাকা তোলার জন্য সে এর মাঝখান দিয়ে আবার যায় এবং ইচ্ছা করেই শরীরকে বাজেভাবে স্পর্শ করে। একদিকে যাত্রীদের বাজে স্পর্শ, আবার হেল্পারেরও। ফলে দেখা যায়, এই ভিড়ের মাঝখানে নারী হিসেবে শতভাগ আপনাকে শারীরিক সহিংসতার শিকার হতেই হবে। তিনটি স্মরণীয় ঘটনা মনে করে তিনি বলেন, 'আমি প্রতিবাদ করায় বলেছে, ভিড়ের মধ্যে বাসে ওঠেন কেন? গ্রামের দিকে সাধারণত নারীদের জন্য সংরক্ষিত সিটের কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই আমার যে কোনো ধরনের গণপরিবহন বিশেষ করে লোকাল পরিবহনে উঠতেই ইচ্ছা করে না।'

ব্র্যাকের একটি গবেষণা বলছে, গণপরিবহনে যাতায়াতের সময় ৯৪ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হন। এই হয়রানিমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত বেশিরভাগই মাঝবয়সী বা তার বেশি বয়সী পুরুষ। যৌন হয়রানিগুলোর ধরন ইচ্ছাকৃত স্পর্শ করা, চিমটি কাটা, শরীর ঘেঁষে দাঁড়ানো, আস্তে আস্তে ধাক্কা দেওয়া, স্পর্শকাতর জায়গায় স্পর্শ করা, গায়ের ওপর ইচ্ছাকৃত ঘুমিয়ে পড়া, কাঁধে হাত দেওয়া। ২০১৭ সালে ব্লেড দিয়ে নারীর স্পর্শকাতর জায়গার কাপড় কাটতে শোনা যায়। মূলত গণপরিবহনে চলাচলকারী নারীরা জীবনে বহুবার যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। প্রতিবাদ করতে গেলেই এসব পুরুষ দলবদ্ধভাবে নারীকে উল্টে শাসায় এবং আশপাশের মানুষ নীরব ভূমিকা পালন করে। আবার কেউ বাঁচতে হয়রানি থেকে দূরে সরার চেষ্টা করেন।

আরও একটি বেসরকারি সংস্থা বিন্দুর গবেষণা বলছে, গণপরিবহনে যৌন হয়রানি হয় কিনা- এই প্রশ্নে ১০০ জনে ৬০ জন পুরুষ বলেন, হয়। বাকিরা এটিকে তাচ্ছিল্য, অযৌক্তিক, নারীদের প্রতি কটু মন্তব্য, তাঁদের পোশাক- এসব বিষয় সামনে তুলে ধরেন, যা পুরুষতন্ত্রের একটি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এমনকি জরিপকৃত নারীদের হেনস্তাও করেন। যাতে বোঝা যায়, কোনো না কোনোভাবে তারা এই কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আবার গণপরিবহনে উঠতে গেলে হাত ধরে তোলা, হাতের নিচ দিয়ে স্পর্শকাতর জায়গা ছোঁয়া, পিঠে হাত দিয়ে চিমটি কাটা- হেল্পার আর কন্ডাক্টরের এসব যৌন হয়রানি প্রতিনিয়ত দৃশ্যমান একটি বিষয়। একজন নারী তাঁর জীবনে বহুবার যৌন হয়রানির শিকার হন।

মানবাধিকার কর্মী এবং গণপরিবহনে যৌন হয়রানি রোধ আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী মুসফিকা লাইজু বলেন, 'বাসে নারীদের এক রকম মানসিক নিগ্রহ করা হয়। তাদের বক্তব্য হলো- বাসে উঠলেই মেয়েদের বসতে দিতে হবে; গায়ে লাগলে সমস্যা। তার চেয়ে বাসে না তোলাই ভালো। সাত-আট বছরের বাচ্চা থেকে শুরু করে ৮০ বছরের বৃদ্ধ পর্যন্ত যৌন হয়রানির শিকার হয়। বেশিরভাগ সময় মেয়েরা এগুলো প্রকাশ করেন না। কারণ বললে তাঁরা কোনো সুবিচার পাবেন না বরং তাঁদের ওপরেই দোষারোপ করা হয়। আমার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, আধুনিক পোশাক পরা নারী যেমন রেহাই পান না; তেমনি একজন পর্দা করা নারীও। আমরা ২০১৮ সাল থেকে গণপরিবহনে যৌন হয়রানি রোধ নিয়ে আন্দোলন করে যাচ্ছি। আমাদের দাবি- বাসে সংরক্ষিত নারী সিট বৃদ্ধি; নারীদের জন্য যে বাসের প্রতিশ্রুতি আগে দেওয়া হয়েছে তা বাস্তবায়ন; হটলাইন নম্বর চালু; যৌন হয়রানির আইন আরও শক্তিশালী করা এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ। আমরা মনে করি, সচেতনতা বেশি দরকার এখানে। দরকার মূল্যবোধ তৈরি- কোনো গণপরিবহনের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট ব্যক্তি এবং যাত্রীরা যেন কিছুতেই নারীকে হেনস্তা
না করে।'

২০১৮ সালে দোলনচাঁপা নামে শুধু নারীদের জন্য বাস সার্ভিসটি চালু হয়। দোলনচাঁপার বর্তমানে একটি বাস চলে। এতসংখ্যক নারী বাসে ওঠার পরও মহিলা সিটের সংখ্যা আনুপাতিক হারে কম। নারী এবং প্রতিবন্ধী মিলে ৯টি সিট; আবার কোনো কোনো বাসে ৬টি, যেটি ইঞ্জিন কাভারের সঙ্গে, সেখানে বসা অত্যন্ত কষ্টকর। যদিও অধিকাংশ সময় তা পুরুষের দখলে থাকে। এ ক্ষেত্রে বাসচালক বা কন্ডাক্টররা নীরব ভূমিকা পালন করে। এসব শহরের গল্প। গ্রাম বা জেলা শহরে এই নারী ও প্রতিবন্ধী সিট অলীক স্বপ্ন। সেখানে যৌন হয়রানি এক ভয়াবহ জাল বিস্তার করে আছে।

২০১৭ সালে গণপরিবহনে নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ও বয়স্কদের জন্য সংরক্ষিত আসনে অন্য কোনো যাত্রী বসলে এক মাসের কারাদণ্ড ও ৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান থাকলেও আজ পর্যন্ত তার প্রয়োগ দেখা যায়নি দেশের কোথাও। কোনো প্রতিরোধ না থাকায় বাসে যৌন হয়রানিকে স্বাভাবিক বলেই মেনে নিতে শুরু করেছেন নারীরা।

বিআইএসআরের এক গবেষণা বলছে, ৬০ শতাংশ ড্রাইভার যৌনকর্মীর কাছে গমন করে এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির গবেষণামতে, ৩০-৩৫ শতাংশ পরিবহন শ্রমিক মাদক সেবন করে। অধিক মুনাফার লোভে অতিরিক্ত যাত্রী তোলা, সিসি টিভি ফুটেজ না থাকা, টিকিট না কাটা, মানুষের নীরব ভূমিকাই এ সমস্যা জিইয়ে রেখেছে বহুদিন ধরে।

এক বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক মোহন কুমার মণ্ডল বলেন, 'একটি স্বাধীন দেশে নারীর স্বাধীন চলাচলের সুযোগ পাওয়া তাঁর মানবাধিকার। আমাদের প্রথম করণীয় হলো- বাস পরিচালনার সঙ্গে সংশ্নিষ্টদের সচেতন ও সংবেদনশীল করে তোলা। আরও জোর দিতে হবে আইন ব্যবস্থায় ও প্রয়োজনবোধে আইন প্রণয়নের ওপরে। নারীকর্মী ও মানবাধিকার কর্মীদের আরও বেশি সোচ্চার হওয়া; বিশেষ করে কিছু জরুরি সেবা নম্বর চালু করা, যাতে সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির নম্বর ও লোকেশন বলে তাঁরা সুবিচার পেতে পারেন।'

আমরা যেখানে যোগাযোগকে মনে করি সবচেয়ে বড় হাতিয়ার, সেখানে মানে নারীর জন্য তা এক ভয়ংকর বাধা। তবুও নারীরা থেমে নেই। চলার পথকে সুন্দর করতেই তাঁর যত যুদ্ধ। এই যুদ্ধে আমাদের হতে হবে সহযোদ্ধা। মুখ বন্ধ নয়; প্রতিবাদ, প্রতিরোধ দরকার। আলোচনায় আনতে হবে এই ইস্যু। যত আলোচিত হবে, ততই ভাঙতে থাকবে পুরুষতন্ত্র। গড়ে উঠবে নারী-পুরুষের সমতা।

লেখক: উন্নয়নকর্মী