হস্তশিল্পীদের তৈরি ঝুড়ি, মৃৎপাত্র, দেয়ালে ঝুলানোর সামগ্রী, হাত ব্যাগ, ভ্রমণ ব্যাগ, খেলনা, ছাইদানি, কার্পেট, নকশিকাঁথা ইত্যাদি পণ্যের বাজারে কদর রয়েছে। এ খাতে বিনিয়োগেও তাই এগিয়ে আসছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। 'সুকন্যা'র পরিচালক সুরাইয়া ইয়াসমিন এমনই এক তরুণ উদ্যোক্তা। যশোরের মেয়ে হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই সুরাইয়া ইয়াসমিন দেখেছেন সুঁইয়ের ফোঁড়ে কী করে একটু একটু করে আকার পায় একেকটি নকশিকাঁথা। সেই থেকে সুঁই-সুতার প্রতি আগ্রহ; সখ্যও গড়ে ওঠে দ্রুত।

সুরাইয়ার বেড়ে ওঠা যশোরের শার্শা উপজেলার গোগা গ্রামে। যশোরের শেখ আকিজউদ্দীন হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। এইচএসসি পাস করেন যশোরের ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অনার্স পাস করে একই বিভাগে তিনি স্নাতকোত্তর পর্যায়ে রয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় বর্ষে এসে কিছু একটা করার ইচ্ছা প্রবল হয় সুরাইয়ার। স্বাধীন পেশা দাঁড় করানোর ঝোঁক থেকেই 'সুকন্যা' নামে একটি অনলাইন পেজ খোলেন এবং এখানে টুকটাক হস্তশিল্পের পণ্যের ছবি দিতে থাকেন। আর্ট এবং ক্রাফটের প্রতি ভালোবাসা থেকেই জন্ম হলো 'সুকন্যা'র। শুরু হয়েছিল হাতে আঁকা টিপ দিয়ে। তারপর হাতে তৈরি শৌখিন গহনা, হাতে আঁকা পোশাক। মাঝখানে অনার্স পরীক্ষার জন্য আট মাস বন্ধ থাকলেও ২০২০ সালের মার্চে করোনার যখন ঊর্ধ্বগতি, তখন আবার শুরু করেন সুকন্যার কার্যক্রম।

যশোরের আদি শিল্প হচ্ছে সূচিশিল্প। তিনি বলেন, 'শৈশব থেকে দেখছি কীভাবে একেকটি নকশিকাঁথা তৈরি হয়। এ কারণে আমি নিজেই সব সেলাই পারি। প্রথমে নিজেই ডিজাইন করে ফেসবুকে পোস্ট করতাম। অর্ডার হলে অ্যাডভান্স পেমেন্টের টাকা দিয়ে কাপড় কিনে কাজ করে ডেলিভারি দিতাম। এভাবে ধীরে হাঁটতে শুরু করে সুকন্যা। এই পথে আমার মা সবসময় পাশে ছিলেন। আরেকজন আমার ছোট বোন, সারাক্ষণ ছায়ার মতো পাশে আছে।'
বর্তমানে সুকন্যা হস্তশিল্পের পোশাক যেমন- শাড়ি, থ্রিপিস, কুর্তি-পাঞ্জাবি এগুলো নিয়ে কাজ করছে। এর সঙ্গে হোম ডেকর আইটেম নকশিকাঁথা, কুশন এগুলোও উৎপাদন করছে। সুকন্যা গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা; যেগুলো ২০-৩০ বছর আগে বানানো হতো, সেগুলো সংগ্রহ এবং নতুন করে বানানোর চেষ্টা করছে বলে জানান সুরাইয়া ইয়াসমিন।

তবে স্বল্প পুঁজি এবং কোনো ধরনের সহযোগিতা না পাওয়া নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে সুরাইয়া ইয়াসমিন বলেন, 'কর্মী চালানো মুশকিল। তাদের বেতন বাড়াতে পারছি না। এত বেশি সময়, মেধা, শ্রম দিতে হয়; অথচ সে তুলনায় পুঁজি কম। দাম কম। কারণ, আমাদের দেশে দেশীয় পণ্যের চাহিদা কম।' তবুও লেগে থাকার যে চেষ্টা, রুচিশীল মানুষদের নজর কাড়ার যে চেষ্টা, তা করে যাচ্ছে সুকন্যা।

এ উদ্যোগে এখন কাজ করছেন ৩০ জনের বেশি কর্মী। তাঁরা সবাই গ্রামের নারী কিংবা স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী। অধিকাংশই দরিদ্র পরিবারের। অনেকে আবার পড়াশোনার খরচ চালাচ্ছেন সেলাইয়ের টাকা দিয়ে। সুকন্যার লক্ষ্য- এসব প্রান্তিক নারীদের অবস্থার উন্নয়ন করা, তাঁদের প্রাপ্য মজুরি নিশ্চিত করা। নারীরা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হলে পারিবারিক নির্যাতন অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করেন সুরাইয়া ইয়াসমিন।