একজন নারী মা হবেন, সংবাদটি নিঃসন্দেহে আনন্দের। কিন্তু সেই সঙ্গে এটি অনেক দায়িত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অন্তঃসত্ত্বা নারীটি যদি চাকরি করেন তাহলে বিষয়টি তাঁর জন্য আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং। একজন নারী গর্ভকালে কর্মক্ষেত্রে তাঁর সহকর্মীদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পেলে সেটা তাঁর জন্য শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। সবার জন্য এ বিষয়টি বোঝা জরুরি- অন্তঃসত্ত্বা নারী মানেই অসুস্থ নয়। গর্ভাবস্থা অসুখ নয়।

সব অফিসের পরিবেশ আবার একই রকম নয়। কোনো কোনো অফিসে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জন্য খুবই অনুকূল পরিবেশ রয়েছে। তবে বেশিরভাগ অফিসের ক্ষেত্রে পরিবেশ খুব অনুকূল নয়। কোনো কোনো অফিসে লিফটের ব্যবস্থা নেই। আবার কোনো কাজের জন্য সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা করতে হয়। প্রথম তিন মাসে দেখা যায়, বমি হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে, এ সময়ে নারীরা একসঙ্গে বেশি খাবার খেতে পারেন না। অল্প অল্প করে বারবার খেতে হয়। কিন্তু অফিসের পরিবেশ হয়তো এমন, তিনি বারবার খেতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন। আবার কাজের চাপ এমন, তিনি হয়তো খাওয়ার সময়টাও পাচ্ছেন না। আবার অন্তঃসত্ত্বাদের ঘন ঘন প্রস্রাব হতে পারে, তাঁদের বারবার টয়লেটে যেতে হয়। কিন্তু অফিসের পরিবেশের কারণেই হয়তো তিনি টয়লেট চেপে রাখছেন। বেশিরভাগ অফিসেই খাবারের কোনো ব্যবস্থা থাকে না। বাইরে থেকে কিনে খেতে হয়, যা সবসময় স্বাস্থ্যসম্মতও হয় না।

আরেকটি বড় সমস্যা যাতায়াত। সবার বাড়ি অফিসের কাছাকাছি থাকে না। অনেকে হয়তো যাত্রাবাড়ী থেকে উত্তরা গিয়ে অফিস করছেন। সব অফিসে ট্রান্সপোর্টের সুবিধা থাকে না। অন্তঃসত্ত্বাদের যাতায়াতের একটি ব্যবস্থা অফিস থেকে করে দেওয়া যেতে পারে। অথবা যে দিনগুলোতে না গেলেই নয়, সে দিনগুলো বাদে সম্ভব হলে হোম অফিসের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। এ ছাড়া অফিসে একটি ফুড কর্নার রাখা দরকার, যেখানে পর্যাপ্ত খাবার রাখা ও গ্রহণের ব্যবস্থা থাকবে। সম্ভব হলে একটি রেস্ট রুম খুব জরুরি। তিনি হয়তো তিন-চার ঘণ্টা কাজ করলেন, তারপর কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে আবার কাজ শুরু করলেন। যাঁরা ডেস্কে কাজ করেন, পা ঝুলিয়ে রাখলে পায়ে পানি আসতে পারে। তাই এ সময়ে ডেস্কের নিচে টুল বা এমন কিছু রাখার ব্যবস্থা করা উচিত।

মানসিকভাবে অন্তঃসত্ত্বা নারীর চ্যালেঞ্জটা আরও বেশি। তিনি ভাবতে থাকেন, এখন তো আমি অন্তঃসত্ত্বা, আমি আগের মতো বেশি কাজ করতে পারছি না, আমি চাকরিটা চালিয়ে যেতে পারব বা অফিসে আমি আগের অবস্থানে ফিরতে পারব কিনা? এ সময়ে এমনিতেই খুব বেশি মুড সুইয়িং করতে পারে। ঘরের বিভিন্ন কাজ, অফিসের কাজ, পরিবার, সমাজ সব মিলিয়ে এ সময় অন্তঃসত্ত্বা অনেক বেশি স্ট্রেসে থাকতে পারেন, যা গর্ভের সন্তানের জন্য মোটেও ভালো না। এ ক্ষেত্রে সহকর্মীদের সহযোগিতা খুব জরুরি। ওই নারীর কিছু কাজ অন্যরা ভাগ করে নিলে কিন্তু কাজের চাপটা কমে আসে। এ ছাড়া মাতৃত্বকালীন ছুটি নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো রকমের বাধার সম্মুখীন না হওয়াটা খুব জরুরি। ছুটি শেষে যোগদানের পরও ওই কর্মীর প্রতি সহযোগিতামূলক মনোভাব জরুরি।

এ সময়ে মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে ঘরেও যেমন লক্ষ্য রাখা দরকার, তেমনি কর্মক্ষেত্রেও। অফিসে নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে কর্মীরা যেমন জেন্ডার ইস্যুতে সংবেদনশীল হয়ে উঠবেন, তেমনি এটি গর্ভাবস্থায় মানসিক সমস্যাগুলো কাটাতেও ভূমিকা রাখতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, গর্ভাবস্থা কোনো রোগ নয়, এটি জীবনের একটি স্বাভাবিক অবস্থা। আজকাল নারীরা অনেক বেশি কর্মমুখী। তবে কর্মপরিবেশের ক্ষেত্রে অনেক প্রতিকূলতা রয়ে গেছে। এ জন্য নারীর কর্মবিমুখ হওয়াটা সমাধান নয়। নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ গড়ার মধ্য দিয়েই এর সমাধান সম্ভব।
লেখক : পুষ্টিবিদ, গুলশান ডায়াবেটিক কেয়ার