আমাদের দেশে শিশুরা বিভিন্ন ধরনের হয়রানির সম্মুখীন হয়। ঘরে-বাইরে, অনলাইনে সবখানেই রয়েছে এ হয়রানি। তা তৈরি করেছে নানা ধরনের উদ্বেগ। এ নিয়ে লিখেছেন সানজিদা আহমেদ

পারুল আহমেদ- গৃহিণী, ঢাকার বাসিন্দা। তাঁদের একটাই মাত্র সন্তান; বয়স আট বছর। পারুল ও তাঁর স্বামী সব সময় এই ছেলেকে নিয়ে তটস্থ থাকেন। সন্তানকে ভালো পুষ্টিকর খাবার দিতে চেষ্টা করেন। শহরের সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত স্কুলে ভর্তি করানোর ইচ্ছা তাঁদের। যদি খারাপ সঙ্গ পেয়ে বসে, তাই এক প্রকার চোখে চোখে রাখেন; খুব একটা কারও সঙ্গে মিশতে দেন না। এত চেষ্টার পরও ছেলে বেশ মনমরা থাকে। পড়ালেখাতেও পিছিয়ে পড়ছে।

শিক্ষিত পরিবারের সন্তান রাহুল (ছদ্মনাম), বয়স ছয় বছর। কথা বলা, কোনো কাজ দ্রুত করার ক্ষেত্রে রাহুল অনেকটাই পিছিয়ে। মা-বাবা এটা স্বীকার করতে নারাজ যে তার কিছুটা অটিজমের সমস্যা আছে। রাহুলের হাঁড়ি-পাতিল, পুতুল এই খেলনাগুলো পছন্দ। সে এসব দিয়ে খেলতে চায়। এসব নিয়ে তার বাবা সব সময় অনেক বকা দেন এবং রাগারাগি করেন। যার ফলে রাহুল আরও বেশি ভিতু ও চুপচাপ হয়ে যাচ্ছে।

মিনুর মা-বাবা দু'জনেই চাকরিজীবী। তাঁরা অফিসে গেলে সে মূলত নানির কাছেই থাকে। একদিন স্কুলে যাওয়ার পর শিক্ষক দেখেন, তার মন খারাপ। অনেকবার প্রশ্ন করার পর বলে, তাদের বাসায় একজন জামিল আঙ্কেল আসেন। তিনি তাকে মাঝেমধ্যে অনেক ব্যথা দেন। এরপর স্কুল থেকে মিনুর মা-বাবাকে ডেকে বিষয়টি জানানো হয়।

এ ধরনের ঘটনা আমাদের আশপাশের। এ ঘটনাগুলো কখনও আমাদের চোখে পড়ে; কখনও অজানাই থেকে যায়। মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, 'শিশু বয়সে নির্যাতনের ভয়াবহতা কাউকে ৪০ বছর পর্যন্ত তাড়িয়ে বেড়াতে পারে।' আইন ও সালিশ কেন্দ্রের একটি প্রতিবেদন (মার্চ ২০২১) অনুযায়ী, কভিড-১৯ মহামারির সময় ৩০ শতাংশ শিশু অনলাইনে বিভিন্ন ধরনের হয়রানির সম্মুখীন হয়েছে। পাঁচটি জেলায় (ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, কক্সবাজার ও খুলনা) জরিপের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি। হয়রানির শিকার শিশুদের মধ্যে ৫৬ দশমিক ২৫ শতাংশ মেয়ে। ৪১ শতাংশ শিশু তাদের মা-বাবাকে বিষয়টি জানিয়েছে এবং ১২ শতাংশ তাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে কারও সঙ্গে কথা বলেনি। মাত্র ৬ শতাংশ ক্ষেত্রে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ২০২০ সালের শুরুতে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের জরিপ থেকে জানা যায়, ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ মেয়েশিশু অনলাইনে হয়রানির সম্মুখীন হয়েছিল। কিন্তু ২০২১ সালে এই সংখ্যা ছিল চার গুণের বেশি। বিশ্বব্যাপী শিশুরা মহামারির সময় অনলাইনে অতিরিক্ত সময় কাটাচ্ছে, যা তৈরি করেছে নানা ধরনের উদ্বেগ।

কভিড-১৯-এর প্রভাব শিশুদের শিক্ষা, পুষ্টি ও সার্বিক কল্যাণের ক্ষেত্রে অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২০ সালের প্রথম দিকে এই মহামারি শুরুর পর থেকে স্কুল বন্ধের কারণে বাংলাদেশের ৩ কোটি ৭০ লাখ শিশুর শিক্ষা ব্যাহত হয়েছে। ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য, বৈষম্য, সংঘাত, জলবায়ু বিপর্যয় এবং কভিড-১৯-এর মতো জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিশ্বের সবচেয়ে কম বয়সীদের মধ্যে একটি চলমান পুষ্টি সংকট তৈরি করছে। বাংলাদেশে ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী প্রতি তিনজনের মধ্যে মাত্র একটি শিশুকে নূ্যনতম সুপারিশকৃত পুষ্টি দেওয়া যাচ্ছে। ২০১৩ সালে বাংলাদেশে ১৭ লাখ শিশু শ্রমে নিয়োজিত ছিল। বিশ্বব্যাপী শিশু শ্রমিকের সংখ্যা পৌঁছেছে ১৬ কোটিতে। গত চার বছরেই ৮৪ লাখ শিশু যোগ হয়েছে। কভিড-১৯-এর প্রভাবের কারণে আরও লক্ষাধিক শিশু ঝুঁকিতে আছে।

উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের হার এখনও আশঙ্কাজনক। ৫১ শতাংশ নারী, যাঁদের বয়স বর্তমানে ২০-২৪ বছর, তাঁদের বিয়ে হয়েছিল শিশু বা বাল্যকালে। চলতি দশকের শেষে বিশ্বব্যাপী এক কোটি অতিরিক্ত বাল্যবিয়ে হতে পারে, যা এই প্রথা বন্ধে চলমান অগ্রগতির প্রতি হুমকিস্বরূপ।

মায়ের গর্ভে থাকার সময় থেকে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুর যে বিকাশ ঘটে, তা হচ্ছে প্রারম্ভিক। শৈশব থেকে কৈশোর, বয়ঃসন্ধিকাল পার করে সে হয়ে ওঠে পরিপূর্ণ মানুষ। প্রতিটি পর্যায়ে শরীরের পাশাপাশি তার মনেরও পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যবহার ও ভাষা, চিন্তা-চেতনা, অনুভূতি, জ্ঞান, বুদ্ধি, আবেগ, নৈতিকতা ও ভাবের আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে ক্রমান্বয়ে দক্ষ হয়ে ওঠাই শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশ। শিশুর বিকাশ পাঁচ রকম। গ্রস মোটর ডেভেলপমেন্ট, ফাইন মোটর ডেভেলপমেন্ট, স্পিচ ও ল্যাঙ্গুয়েজ ডেভেলপমেন্ট, কগনিটিভ ডেভেলপমেন্ট এবং সোশ্যাল অ্যান্ড ইমোশনাল ডেভেলপমেন্ট।

কাজী হোমায়রা নির্ঝর অনুপ্রাণ শিশু বিকাশ কেন্দ্রের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি বলেন, 'শিশু বিকাশের ক্ষেত্রে অন্যতম চ্যালেজ্ঞ হলো অভিভাবকরা শিশুর শিক্ষাগত সাফল্যের জন্য খুব বেশি যত্নশীল হলেও অধিকাংশই জানেন না, নিরাপত্তার অভাব শিশুর বেড়ে ওঠায় ব্যাপকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।' তিনি আরও বলেন, 'অভিভাবকরা নিজেদের সন্তানকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করেন। তাঁরা ভাবেন, এই বাচ্চার সঙ্গে জোরে কথা বলা, শাস্তি দেওয়া সবকিছুই করা যায়। একটি স্কুলের পাশাপাশি পরিবারের পরিবেশ শিশুবান্ধব না হওয়া শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা। কোথাও বেড়াতে নিয়ে যাওয়া, ভালো স্কুলে দেওয়া বা খেলনা কিনে দিলেই আসলে পরিবারের পরিবেশ শিশুবান্ধব হয় না। শিশুর কথা শোনা সবচেয়ে জরুরি। শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনাগুলো সাধারণত পরিবারের সদস্য দ্বারা বেশি হয়। কিন্তু শিশুবান্ধব পরিবেশের অভাবে শিশুরা তা কাউকে বলতে পারে না। এটি অনেক বড় চ্যালেঞ্জ শিশুর বিকাশে।'
ইউনিসেফের তথ্যমতে, বাংলাদেশে শিশুর প্রাথমিক বিকাশের চ্যালেঞ্জগুলো সহিংস আচরণ, জ্ঞানের সীমিত সুযোগ এবং মৌলিক সেবাগুলোর ঘাটতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রতি চারজন শিশুর মধ্যে তিনজন মানসিক নির্যাতন এবং প্রতি তিনজন শিশুর মধ্যে দু'জন শারীরিক শাস্তি ভোগ করেছে। এর থেকে পরিত্রাণের বিষয়টি বিশেষজ্ঞরা বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।

ঔপন্যাসিক সেলিনা হেসেন বলেন, 'শিশু সুরক্ষা শুধু আইন বা পুলিশ দিয়ে নিশ্চিত করা যাবে, তা নয়। নাগরিক সমাজ যদি এ বিষয়কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে এককভাবে ছেড়ে না দিয়ে যৌথভাবে কাজ করে, তাহলে এ বিপর্যয়ের হাত থেকে আমরা রক্ষা পেতে পারি।'

অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, 'শিশুকে কথা বলার প্রবণতা তৈরি করে দিতে হবে।' শিশুদের পর্যাপ্ত সময় দিতে অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান। তাঁর মতে, 'একাকিত্বে বেড়ে ওঠা শিশুর অপরাধ প্রবণতা বাড়তে পারে।'

কাজী হোমায়রা নির্ঝর বলেন, 'শিশুবান্ধব পরিবেশ গড়ার কোনো বিকল্প নেই। ছোটবেলা থেকেই ভালো স্পর্শ ও খারাপ স্পর্শ সম্পর্ককে অবহিত করা। ছেলে ও মেয়ের প্রতি বৈষম্য না করা। সর্বোপরি সন্তানের কথা শোনা। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শিশু সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় আইন ও নীতিমালা প্রণয়নের পাশাপাশি সেগুলোর বাস্তবায়ন এবং সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সংশ্নিষ্ট সবার জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ।'