মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী এজহারুল হকের ভূমিকার স্বীকৃতি চায় পরিবার

প্রকাশ: ২৫ ডিসেম্বর ২০১৯      

কামরুল হাসান জনি, ইউএই

এজহারুল হকের সেই সময়কার ছবি -সমকাল

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে আর্থিকসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা প্রদানকারী প্রবাসীর সংখ্যা নেহাৎ কম নয়। অনেক প্রবাসী আছেন যারা যুদ্ধকালীন বিদেশ থেকে অস্ত্র বা অর্থ পাঠিয়েছিলেন। তাদের অনেকে স্বীকৃতি পেলেও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে সেসময়ে অর্থ, অস্ত্র ও পোশাক পাঠানো এজহারুল হকের কপালে জোটেনি স্বীকৃতি। মুক্তিযোদ্ধকালে আমিরাতের দুবাইয়ে ছিলেন রাউজান পৌরসভার গহিরা এলাকার এজহারুল হক। দুবাই থেকে তার পাঠানো আর্থিক সহায়তার দলিল ও সরকারি ধন্যবাদপত্রগুলো দীর্ঘদিন নিজের কাছেই আগলে রেখেছেন তিনি। 

এজহারুল হকের ভাষ্য, ‘মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতি পাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর সে আশা ছেড়ে দিই। এরপর থেকে এতোদিন মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে কাজ করার যতো প্রমাণপত্র সব নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলাম।’ 

এজহারুল হক প্রবাস থেকে ফিরে দক্ষিণ চট্টগ্রামের রাউজার, হাটহাজারী, রাঙ্গুনিয়া, পতেঙ্গা, আমবাগান, পিরিঙ্গি বাজার, ঝাউতলাসহ জনতা ব্যাংকের বেশ কয়েকটি শাখায় অফিস সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি গহিরা ২ নং ওয়ার্ডের রোজা আলীর নতুন বাড়ির মৃত ইমান আলী ও রাফেয়া খাতুনের ছেলে।

বর্তমানে তার বয়স প্রায় ৮৫ বছর। স্মৃতিশক্তি ঠিকমতো কাজ করে না। তার পাঁচ সন্তানের মধ্যে দু’জন বর্তমানে রয়েছেন সংযুক্ত আরব আমিরাত। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা এই প্রবীণের পরিবারের সদস্যরা চান, তিনি যেন সরকারি স্বীকৃতি পান। এটা এজহারুল হকেরও ইচ্ছা।

মুক্তিযুদ্ধে দেশের পক্ষে এজহারুল হকের ভূমিকা রাখার বেশকিছু তথ্য ও প্রমাণ সমকালের হাতে এসেছে। একাত্তরে এজহারুল হক যে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেছেন- তার বিভিন্ন সূত্র উল্লেখ আছে সংরক্ষিত সেসব কাগজপত্রে। সেসময়ে প্রবাস থেকে দেশের পক্ষে কাজ করার জন্যে তিনি ‘ফ্রেন্ডশিপ মুভমেন্ট অব বাংলাদেশ’ নামের একটি সংগঠন করে তার সভাপতি এবং ‘মিত্র সংঘ’ নামের আরেকটি সংগঠন করে সেটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এই দুটি সংগঠনের মাধ্যমে তিনি মুক্তিবাহিনীর জন্য বেশ কয়েকবার আমিরাত থেকে ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ এবং জাহাজে করে অস্ত্র, বেল্ট ও পোশাক পাঠান। ওই সময় তার পাঠানো টাকা, অস্ত্র, পোশাক ও বেল্ট পাওয়ার জবাবে মুজিবনগর সরকারের চিঠিসহ বিভিন্ন তথ্য তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরও কোনো স্বীকৃতি জোটেনি তার।

মুক্তিযুদ্ধে প্রবাস থেকে সহায়তার জন্য পাওয়া ধন্যবাদপত্র। ছবি: সমকাল

সেসব ধন্যবাদপত্র এবং তৎকালীন বিভিন্ন ছবি দেখিয়ে এজহারুল হক বলেন, ‘১৯৬৪ সালের পূর্বে পাকিস্তানের করাচি গিয়ে একটি মসজিদের ইমামতি করি। এরপর ৭০ এ পাকিস্তান সরকার ও তাদের এদেশিয় দোসরেরা ষড়যন্ত্র শুরু করলে করাচিতে আওয়ামী লীগের হয়ে কাজ শুরু করি। লাহোরে আওয়ামী লীগ অফিসে হামলা হলে এর বিরুদ্ধে পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের হয়ে প্রতিবাদ সভা করি। ওই সভার খবর সেখানকার উর্দু ভাষার পত্রিকায়ও প্রকাশিত হয়। সেখানে ন্যাশনাল পিপলস ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে, দেশের পক্ষে এবং আওয়ামী লীগের পক্ষে কাজ করি। ১৯৭০ সালের মার্চ মাসে দেশের অবস্থা বেশি খারাপ হতে থাকলে পাকিস্তান থেকে নৌপথে সংযুক্ত আরব আমিরাতে চলে যাই। দুবাইয়ে মর্ডান ফার্মেসি নামের একটি প্রতিষ্ঠানে সেলসম্যান হিসেবে যোগ দিই। এরপর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ‘ফ্রেন্ডশিপ মুভমেন্ট অব বাংলাদেশ’ ও ‘মিত্র সংঘ’ নামের দুটি সংগঠন করে মুক্তিবাহিনীকে সহযোগিতার কাজ শুরু করি। ওই সময় জাহাজে করে ২০ কার্টন অস্ত্র, ১০ কার্টন কাপড় ও বেল্ট দেশে পাঠাই। একই সময় কয়েক দফায় আবুধাবি ন্যাশনাল ব্যাংকসহ বিভিন্ন মাধ্যম থেকে মুক্তিযুদ্ধে সহায়তার জন্য অর্থ তুলে (তখনকার কয়েক লাখ টাকা) দেশে পাঠাই।

আরব আমিরাতপ্রবাসী তার ছেলে ওসমান হক বলেন, ‘বাবা যে প্রবাসে থেকেও মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করেছিলেন- সেসব দলিল আমাদের কাছে রয়েছে। সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধার জন্যে নয় শুধু স্বাধীনতাযুদ্ধে দেশের হয়ে বাবা যে কাজ করেছেন সেই স্বীকৃতিটুকু পেলে আমরা খুশি হব।’

ওসমান হক আারও বলেন, ‘এ সংক্রান্ত কাগজপত্র প্রকাশ্যে এনে বিভিন্ন মাধ্যমে একাধিকবার বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদে পাঠানো হয়। কিন্তু কোনো জবাব আসেনি। জেলা পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা যাচাই-বাছাই শুরু হলে সেখানে আমরা আবেদন করি। জেলা পর্যায়ে সেই আবেদনকালে স্বশরীরের সাক্ষী চান তৎকালীন রাউজান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। যে কারণে মুক্তিযুদ্ধে অবদান থাকলেও বাবার স্বীকৃতি আটকে যায়। কারণ, প্রবাসে বাবার এসব কাজের একমাত্র সাক্ষী ছিলেন দুবাইয়ের ব্যবসায়ী কবির আহম্মদ সওদাগর। তিনি মারা গেছেন। আমরা এখনো অপেক্ষায় আছি যে- বাবা একদিন মুক্তিযুদ্ধে দেশের পক্ষে কাজ করার স্বীকৃতি পাবেন।’

এজাহারুল হকের কাছে থাকা কাগজপত্রের মধ্যে রয়েছে- মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতার করায় ধন্যবাদ জানিয়ে তার কাছে পাঠানো ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত ডেপুটি হাইকমিশনার এ মোমেন চৌধুরী স্বাক্ষরিত চিঠি। মুক্তিযুদ্ধে সহায়তার জন্য পাঠানো টাকার প্রাপ্তি স্বীকার ও ধন্যবাদ দিয়ে বাংলাদেশ হাইকমিশনের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রধান আনোয়ারুল করিম চৌধুরীর চিঠি। ৭২ এর ২৪ এপ্রিল সহযোগিতার জন্যে আরেকটি ধন্যবাদপত্র পাঠান আনোয়ার করিম চৌধুরী। এরপর ৭২ এর ২৩ মে ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে আরেকটি ধন্যবাদপত্র পাঠানো হয় তাকে। ৭২ এর ১৫ এপ্রিল দুবাই ন্যাশনাল ব্যাংক এজহারুল হককে বেশি রেমিট্যান্স পাঠানোর জন্য ধন্যবাদ দিয়ে একটি চিঠি দেন। এসব কাগজপত্র তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।

১৯৭৪ সালে প্রবাস থেকে ঢাকায় ফেরেন এজহারুল হক। সেসময় তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করার জন্য তার একান্ত সচিবকে চিঠি লেখেন। এরপর প্রাইভেট সেক্রেটারি অব প্রাইমিনিস্টার ফরাস উদ্দিন চিঠির উত্তরে জানান, বঙ্গবন্ধু ব্যস্ত। পরে যোগাযোগের অনুরোধ করেন তিনি। কিন্তু ৭৫ এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলে মনোবল ভেঙে যায় এজহারুল হকের। এরপর এসব কাগজপত্র নিজের কাছেই রেখে দেন তিনি। 

বঙ্গবন্ধুর দল এখ ক্ষমতায়। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশের প্রধানমন্ত্রী। তাই একাত্তরে প্রবাসে থেকে মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করার যেসব কাগজপত্র এজহারুল হকের কাছে আছে তা প্রকাশ্যে এনেছে বলে জানায় তার পরিবার। তাদের দাবি- ‘সরকারি সুযোগসুবিধা নয়- শুধু মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকার স্বীকৃতির আশায় দিন গুনছেন এই বৃদ্ধ মানুষটি। মুক্তিযুদ্ধের স্বীকৃতি পেলে মরেও শান্তি পাবেন তিনি।’