দুবাইয়ে রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় সফল চট্টগ্রামের ইয়াকুব

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০১৯      

কামরুল হাসান জনি, ইউএই

ইয়াকুব সৈনিক

ইয়াকুব সৈনিক। ১৯৯৯ সালে আমিরাতে পাড়ি জমানো এই প্রবাসী এখন বাংলাদেশ কমিউনিটির অন্যতম পরিচিত মুখ। এই পরিচিতির পেছনে রয়েছে তার ব্যবসায়িক সফলতা। রিয়েল এস্টেট ব্যবসা দিয়ে শুরু হলেও নাম-ডাক, খ্যাতি আর সফলতা পেয়েছেন রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়। আমিরাতে যে ক'জন রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী রয়েছেন তাদের অন্যতম সৈনিক।

দুবাইয়ের সমৃদ্ধ নগরী ইন্টারন্যাশনাল সিটিতে অবস্থিত ইয়াকুবের ‘সরফুদ্দিন রেস্টুরেন্ট’। এই রেস্তোরাঁর রকমারি খাবারের পরিচিতি দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে দুবাইয়ের নানাপ্রান্তে। পরে তিনি জেবল আলীতে চালু করেন রেস্টুরেন্টের নতুন শাখা। এরপর ২০০৯ সালে দ্বিতীয় শাখাটি চালু করেন দুবাইয়ের আলকুজ এলাকায়। ২০১২ সালে বাংলাদেশিদের জন্যে আরব আমিরাতের ভিসা বন্ধ না হলে ইয়াকুব সৈনিকের এগিয়ে চলার এই গল্প আরো দীর্ঘায়িত হতে পারত। যদিও তিনি এখনো স্বপ্ন লালন করছেন– এই রেস্টুরেন্টকে ব্র্যান্ডে পরিণত করবেন, যা চেইন রেস্টুরেন্ট ব্যবসা হিসেবে পরিচালিত হবে।

আর ১০ জন প্রবাসীর মত জীবিকার তাগিদে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা দিয়ে ভিসা কিনে ভাগ্য পরিবর্তনের নেশায় আমিরাতে আসেন ইয়াকুব সৈনিক। প্রথম ছয় মাস কাজ করেন দুবাইয়ের হামেরিয়া ভেজিটেবল মার্কেটের একটি প্রতিষ্ঠানে। এরপর নিজ উদ্যোগে শুরু করেন রিয়েল এস্টেট ব্যবসা। দীর্ঘ আট বছর এই ব্যবসায় মনোযোগ দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ভাগ্য পরিবর্তনে সক্ষম হন সৈনিক। সেটি ছিল মারহাবা রিয়েল এস্টেট নামক প্রতিষ্ঠান। যখন দুবাইয়ের শাসক দুবাইকে বিশ্বের সমৃদ্ধশালী নগরীতে পরিণত করতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করে চলেছেন তখনি সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ইয়াকুব সৈনিক দুবাইয়ের ইন্টারন্যাশনাল সিটিতে চায়না এরিয়ায় গড়ে তোলেন ‘সরফুদ্দিন রেস্টুরেন্ট’। তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। মূলত তার পরবাস জীবনের সাফল্য এনে দিয়েছে এই রেস্তোরাঁই। এরপর যেখানে হাত দিয়েছে সেখানেই সোনা ফলেছে। বলা যায়, রিয়েল এস্টেট ব্যবসা ও রেস্তোরাঁর ব্যবসা তাকে সাফল্যের শীর্ষে নিয়ে গেছে। দুবাইয়ের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি অস্ট্রেলিয়াতেও অভিজাত রেস্তোরাঁ চালুতে মনোনিবেশ করেছেন।

১৯৭২ সালে চট্টগ্রামের চান্দগাঁও থানার খাজা রোডের মনো কন্ট্রাক্টার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন ইয়াকুব সৈনিক। পিতা প্রয়াত মুন্সি মিয়া ও মাতা আনোয়ারা বেগমের তৃতীয় সন্তান তিনি। ছোটবেলায় মা-বাবাকে হারালেও জীবন সংগ্রামে জয়ী হতে তার প্রচেষ্টায় ঘাটতি ছিল না।

সফল এই ব্যবসায়ী দেশে বিনিয়োগ করতে বেশ আগ্রহী। সরকারের পক্ষ থেকে সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা প্রত্যাশার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের বিষয়টিতে অন্য প্রবাসীদের মত তিনিও গুরুত্ব দিচ্ছেন বেশ। তার মতে, এতে করে আগামীতে দেশে বড় ধরনের বিনিয়োগ আসবে, অব্যাহত থাকবে দেশে রেমিটেন্স প্রবাহ।

ইয়াকুব সৈনিককে নিয়ে প্রবাসীদের ধারণাও অন্যরকম। কেউ কেউ বলছেন, ইয়াকুব সৈনিক পরিশ্রম ও নিষ্ঠার মাধ্যমে যেমন নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করেছেন তেমনি সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন সমাজ পরিবর্তনের। নিজের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকদের উৎসাহ দেওয়ার ব্যাপারটিও এতে সঙ্গত কারণে চলে আসে। শ্রমিকদের ভাগ্য বদলাতে তাদের মেধা ও শ্রমের মূল্যায়ন করেন সৈনিক। প্রতিবছর তিনটি ক্যাটাগরিতে ইয়াকুব সৈনিক থেকে শ্রমিকরা পেয়ে থাকেন গোল্ড মেডেল ও নগদ অর্থ। যা শুধু উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা নয় বরং কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের মনোযোগ বাড়ানোর সঙ্গে ব্যবসায় সফলতা পাওয়ার অন্যতম কৌশল।

ব্যক্তি জীবনে তিনি মানবতাবাদী সমাজকর্মী। এই পরিচয়টাও তাকে বড় করে তুলেছে দেশ-বিদেশে। নিজের জন্মস্থানে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, এতিমখানা ও গরীব অসহায় ছেলে মেয়েদের সহযোগিতায় তিনি নিবেদিত প্রাণ। বিশেষ করে চান্দগাঁও থানার প্রত্যেক বিধবা নারী পেয়ে থাকেন ইয়াকুব সৈনিকের অনুদান। এছাড়া চান্দগাঁওয়ের সব মসজিদে অনুদান দেন তিনি। তার তত্ত্বাবধানে চট্টগ্রামের বিভিন্ন মসজিদে রয়েছে হাফেজি কোরআনের ব্যবস্থা। প্রতি রমজানে গরীব অসহায়দের জন্যে গরু জবাই দেন তিনি। রমজানের প্রথম দিন গরুর মাংস, চাল আর ছোলা বিতরণ করেন প্রতিবছর।

ভবিষ্যতে নিজের এলাকায় মসজিদ ও এতিমখানা করার পরিকল্পনা রয়েছে জানিয়ে ইয়াকুব সৈনিক বলেন, ‘মা-বাবাকে হারিয়ে আমি যখন নিঃস্ব ছিলাম তখন মানুষের অসহায় অবস্থা আমি খুব ভালোভাবে উপলদ্ধি করেছি। তাই যতদিন আমার স্বচ্ছলতা থাকে ততদিন আমি মানুষের সেবা করে যেতে চাই।’