রাজনীতি

ইসির সংলাপ ও সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতি

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ০৭ আগস্ট ২২ । ০১:৫২ | প্রিন্ট সংস্করণ

আবু সাঈদ খান

গত ৩১ জুলাই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের 'ম্যারাথন ডায়ালগ' সমাপ্ত হয়েছে। এর ফলাফলে অনেকেই হতাশ। কারও কারও কাছে এই সংলাপ অর্থহীন। ব্যক্তিগতভাবে আমি ততটা হতাশ হইনি। সম্ভবত এর কারণ, খোদ আলোচনা নিয়েই খুব বেশি আশাবাদী ছিলাম না।

মহাজন-মহাজ্ঞানীরা বলে থাকেন, হতাশার মাঝেও আশার আলো আছে। সেই আপ্তবাক্য মেনেই একটু খতিয়ে দেখতে চাই হতাশার ঝুড়িতে আশার আলো আছে কিনা।

দেশের ৩৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের ২৮টি ইসির আলোচনায় অংশ নিয়েছে। বর্জন করেছে বিএনপিসহ ৯টি দল। দুটি দল আলোচনার জন্য নতুন তারিখ চেয়েছে। সংখ্যাবিচারে নিরঙ্কুশ অংশগ্রহণ। তবে ক্ষমতার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির বর্জনে সংলাপের সফলতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। সে যাই হোক; বর্জনকারী দলগুলোর বক্তব্যও কারও অজানা নেই। ওইসব দলের নেতারাও বক্তৃতা-বিবৃতির মাধ্যমে দলের অবস্থানই তুলে ধরেছেন।

এখন সব ছাপিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, কোন সরকারের অধীনে নির্বাচন? দলীয়, না দলনিরপেক্ষ, কিংবা জাতীয় সরকার? অংশগ্রহণমূলক ও অর্থবহ নির্বাচনের প্রয়োজনে এ ব্যাপারে রাজনৈতিক সমঝোতা জরুরি। এর মানে এই নয়, সরকার প্রশ্নে রাজনৈতিক সমঝোতার আগে নির্বাচনী বিধি-বিধান প্রণয়ন বা সংস্কার করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, যে সরকারের অধীনেই নির্বাচন হোক- নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।

আশার কথা, বাংলাদেশে যুগোপযোগী নির্বাচনী বিধি-বিধান রয়েছে। তবে তা যথাযথভাবে অনুশীলন না হওয়ায় আশানুরূপ সুফল মিলছে না। যেমন বর্তমান আইনে নির্বাচন চলাকালে পুলিশ-প্রশাসন ইসির ওপর ন্যস্ত হওয়ার কথা। বাস্তবে দেখা যায়, পুলিশ-প্রশাসন সরকারের মুখাপেক্ষী থাকে। নির্বাচন কমিশন সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিলেও তা বাস্তবায়ন হয় না। স্থানীয় নির্বাচনে সংসদ সদস্যকে এলাকা ছাড়তে অনুরোধ করা হলেও তা পালিত হয় না। এ ক্ষেত্রে ইসির ক্ষমতা প্রয়োগের সব বাধা দূর করা দরকার।

আলোচনায় এসেছে- রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্বে কি আগের মতো জেলা প্রশাসকরা থাকবেন, না নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা রিটার্নিং অফিসার হবেন। কেউ কেউ বলছেন, জেলা প্রশাসকরা পুলিশ-প্রশাসন পরিচালনায় সিদ্ধহস্ত। তা ঠিক। তবে এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে অনেক রাজনীতিক, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সঙ্গে তাঁদের সখ্য থাকে। তাই তাঁদের পক্ষপাত করারও সুযোগ থাকে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্বপ্রাপ্ত হলে তা হবে ইতিবাচক।


আরেক বিতর্ক হচ্ছে ইভিএম নিয়ে। এ ব্যাপারে আগেও লিখেছি। যন্ত্রের কোনো দোষ নেই; মানুষ ঠিক থাকলে সব ঠিক। যেহেতু মানুষ সব সময় ঠিক থাকে না, তাই যন্ত্রকে ত্রুটিমুক্ত করতে হয়। আমাদের ইভিএমের বড় ত্রুটি- এতে ভিভিপিএটি (ভোটার ভেরিফাইয়েবল পেপার অডিট ট্রেইল) নেই। ফলে ভোট পুনর্গণনার সুযোগ নেই। ভারতে ইভিএমে ভিভিপিএটি আছে। তারপরও সবাই মানছে না। তাই বাংলাদেশে ইভিএম চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। তা ছাড়া বেশিরভাগ দল এটি চাইছে না। সম্ভবত বেশিরভাগ লোকও ইভিএমের পক্ষে নেই।

জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি প্রভৃতি দল উত্থাপিত একটি প্রস্তাব তেমন গুরুত্ব পায়নি। প্রস্তাবটি হচ্ছে- সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব। আমার বিবেচনায় এটি গুরুত্বপূর্ণ। সিপিবি, বাসদসহ কিছু বাম দলও সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির দাবি করছে। ১৪ দলের শরিক জাসদের ঘোষণাপত্রেও এই বিধান রয়েছে।

এই পদ্ধতিতে অংশগ্রহণকারী দল স্ব স্ব দলের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা অনুপাতে আসন পাবে। এখানে দেশটাই নির্বাচনী এলাকা। সংসদে আসন সংখ্যা ৩০০ হলে প্রদত্ত তাবৎ ভোট তিনশ ভাগ হবে। ধরুন, তিনশ ভাগের এক ভাগ দুই লাখ। যে দল সারাদেশের ভোটের দুই লাখ পেয়েছে, সেই দলের প্রাপ্ত আসন ১। যে দল চার লাখ পেয়েছে, সেই দলের আসন ২। এভাবে এক কোটি পেলে আসন ৫০, দুই কোটি পেলে আসন ১০০, চার কোটি পেলে আসন ২০০।

এখন প্রশ্ন, দল থেকে কে নির্বাচিত হবেন। সে জন্য প্রতিটি দলকে ৩০০ প্রার্থীর নাম আগেই নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে হবে। দলের ক্রমানুসারে সেই দলের বিজয়ী প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হবে। পূর্বের হিসাব অনুযায়ী দুই লাখে একজন সংসদ সদস্যের প্রাপ্যতা হলে দলের ক্রমের ১ নম্বর ব্যক্তি নির্বাচিত হবেন। চার লাখ ভোট পেলে ক্রমের ২ নম্বর ব্যক্তি নির্বাচিত হবেন। এই প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন দল থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন।

সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে দেশের স্থলে জেলা বা বিভাগও নির্বাচনী এলাকা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিভাগ বা জেলার আসন সংখ্যার মধ্যে এই পদ্ধতিতে আসন নির্ধারিত হবে।

সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি দুনিয়ায় নতুন নয়। পাশ্চাত্যের নানা দেশেই এটি অনুসৃত হচ্ছে। আমাদের প্রতিবেশী নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডে এই পদ্ধতি রয়েছে। এর সুবিধার দিক হচ্ছে- যেহেতু একটি বা দুটি উপজেলার ভোটের ওপর প্রার্থীর জয়-পরাজয় নির্ধারিত হবে না। তাই একটি বা দুটি উপজেলায় ভোট কারচুপি করে ব্যক্তিবিশেষের লাভ নেই। তখন কালো টাকা বা পেশিওয়ালারা কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগে উৎসাহী হবেন না। ফলে নির্বাচনে টাকার খেলা ও সহিংসতা কমে আসবে। মনোনয়ন বাণিজ্যও কমবে। নির্বাচন ও রাজনীতিতে সৎ ও ত্যাগী মানুষের অংশগ্রহণ বাড়বে। রাজনীতি হবে নতুন মাত্রায় উন্নীত।

অনেক দলের সারাদেশেই কিছু কিছু ভোট আছে। বিশেষ প্রভাবিত এলাকা নেই। সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে সেসব দলের ভোটের মূল্যায়ন হবে। দেখা যাবে, ছোট ছোট দল থেকেও জাতীয় সংসদ সদস্য হচ্ছেন। আজকের দ্বিদলীয় ব্যবস্থার স্থলে বহুদলীয় ব্যবস্থা কায়েম হবে, যা বাংলাদেশের সংকটাপন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য মোক্ষম দাওয়াই।

সব ব্যবস্থার কিছু নেতিবাচক দিক থাকে। সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিরও তা আছে। এতে দলে আমলাতান্ত্রিকতা মাথাচাড়া দিতে পারে। তৃণমূলের ত্যাগী নেতারা মনোনয়নবঞ্চিত হতে পারেন। সেই বিবেচনায় মিশ্র প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি চালু হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সংসদের ৩০০ প্রতিনিধির ১৫০ জন এলাকাভিত্তিক সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবেন। অবশিষ্ট ১৫০ জন দলের প্রাপ্ত ভোট অনুপাতে নির্বাচিত হবেন। অথবা পূর্বের এলাকাভিত্তিক ৩০০ আসন বহাল থাকবে এবং এর সঙ্গে আরও ৩০০ আসন যুক্ত হবে। তাঁরা সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত হবেন। মিশ্র পদ্ধতিতে প্রত্যেক ভোটার দুটি ভোট দেবেন- একটি এলাকার, অপরটি দলের জন্য।

জার্মানি, নিউজিল্যান্ড প্রভৃতি দেশে মিশ্র পদ্ধতি অনুসৃত হচ্ছে। এমনকি যুক্তরাজ্যের কোনো কোনো স্থানে (স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও লন্ডন অ্যাসেম্বলি) এএমএস (অ্যাডিশনাল মেম্বার সিস্টেম) রয়েছে, যাঁদের নির্দিষ্ট এলাকা নেই। দলের প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে সদস্য নির্বাচিত হন। আমরা যে এই পদ্ধতি একবারে অনুসরণ করছি না; তা নয়। আমাদের জাতীয় সংসদে সরাসরি নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংখ্যানুপাতে নারী সদস্য নির্বাচিত হচ্ছেন।

জাতীয় সংসদে প্রতিনিধি নির্বাচনে আমরা কি বিষয়টি ভাবতে পারি না? বিষয়টি প্রবর্তনে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। তবে সর্বাগ্রে প্রয়োজন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত; প্রধান দলগুলোর ঐকমত্য।

প্রায় তিন দশক ধরে দেশে সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা ও পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হচ্ছে। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের মুখ থেকে পক্ষে-বিপক্ষে কোনো কথা শুনিনি। তবে ঘরোয়া আলোচনায় কোনো কোনো নেতা এ পদ্ধতি সমর্থন করেন। ব্যবস্থাটিকে ইতিবাচক মনে করেন। কিন্তু প্রকাশ্যে কিছু বলেন না।

আমি জানি না, জাতীয় পার্টিসহ যেসব দল এটি চাইছে, তারা কতখানি সিরিয়াস? তাদের মধ্যে দৃঢ় প্রত্যয় থাকলে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির ওপর জাতীয় সংসদে 'বেসরকারি বিল' আনতে পারতেন বা আনার চেষ্টা করতে পারতেন। আমার মনে হয়, সে সুযোগ এখনও রয়েছে।

পরিশেষে, এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানাই।

আবু সাঈদ খান: লেখক ও সাংবাদিক

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com